বড় ভাষার দাদাগিরিতে আজ যে ছোট ভাষাগুলির নাভিশ্বাস

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
বড় ভাষার দাদাগিরিতে আজ যে ছোট ভাষাগুলির নাভিশ্বাস

২১ ফেব্রুয়ারি আসলেই প্রতিটি বাঙালি যেন নিজেকে আরো বেশি করে বাঙালি ভাবেন। খানিক কলার তুলেই গর্ব করে বলেন সেইসব বীর শহfদদের কথা, যারা সেদিন প্রাণের তোয়াক্কা না করেই ঝাঁপিয়ে পরেছিল বাংলা ভাষার জন্য। হয়তো বা আবেগে গা ভাসিয়ে পাড়ি দেন ১৯৫২ সালেই। তাই হয়তো আজকের দিনে বাংলা ভাষা নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে তাঁরা ভুলে যান, আজকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। শুধু বাংলা নয়, আজকে প্রতিটা জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ভাষাকে উদযাপন করার দিন। সেইকথা মাথায় রেখেই আজ বরং বাংলা ভাষা নয়, আজ বলা যাক এমন কিছু মাতৃভাষার কথা যা বাংলা তথা অন্যান্য ভাষার আগ্রাসনে নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়েছে কিম্বা দাঁড়িয়ে আছে বিলুপ্তির অন্তিম সীমানায়।

পৃথিবীতে ক্রমাগত ভাষার বিলুপ্তি নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীরা আজ রীতিমত শঙ্কিত। সেই বিলুপ্তির তালিকায় বাংলা ভাষার উল্লেখ পাওয়া যায়নি। ১৯৬১ সালে ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছিল, সেই সময়ে ভারতে মোট এগরোশোটি ভাষার প্রচলন ছিল কিন্তু পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে তারমধ্যে প্রায় ২৩০টি ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ২০১৩ সালে ভারতে প্রচলিত ভাষার সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৮৭০-এ। নন-প্রফিট ভাষা ট্রাস্ট’র প্রতিষ্ঠাতা গণেশ ডেভি জানান, সেই ৮৭০টি ভাষার মধ্যে ৪৮০টি ছিল বিভিন্ন জন গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, যা তাঁরা প্রায় সবক্ষেত্রেই ব্যবহার করতেন। সেই সময়েই তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, ভারতে এই ভাষাগুলিরও অতি দ্রুত বিলুপ্তি ঘটবে এবং তাঁর সেইদিনকার অশঙ্কা যে বর্তমানে বাস্তবায়িত হয়েছে, তা বোধ হয় বলার অবকাশ রাখে না। ২০১০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি আন্দামানের পোর্টব্লেয়ার হাসপাতালে মারা গেছিলেন ‘আকা বো’ ভাষায় কথা বলা শেষ মানুষটি। তাঁর নাম ছিল সিনিয়র বোয়া। তিনি মৃত্যুর আগে প্রায় বাহান্ন বছর নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার মত কোনো মানুষ পাননি।

আন্দামানের নয়টি জনজাতির ভাষা আজ বিলুপ্ত। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ভারতের প্রায় ৪০টি ভাষা নতুন করে অস্তিত্ব হারানোর পথে পা বাড়িয়েছে। মাত্র কয়েক হাজার মানুষই এই ভাষাগুলি ব্যবহার করেন। আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের এগারোটি ভাষা ইউনেস্কোর তালিকা অনুযায়ী আজ লুপ্তপ্রায় ভাষায় পরিণত হয়েছে। সেই এগারোটি ভাষা হল – গ্রেট আন্দামানিজ, জারুয়া, ল্যামংসে, লুরো, মুয়োট, অনগে, পু, সাননো, সেন্টিলেজ, শম্পেন এবং টাকাহানিং। এছাড়াও রয়েছে মণিপুরের সাতটি ভাষা যথা- আমল, আকা, কইরেন, লামগাং, লাংগ্রং, পুরম এবং তারাও। এই ভাষাগুলি ছাড়াও হিমাচল প্রদেশের চারটি ভাষা ( বাঘাতি, হান্দুরি, পাংভালি ও সিরমাদিও), কর্ণাটকের কোরাঙ্গা এবং কুরুবা, অন্ধ্রপ্রদেশের গাবাদা ও নাইকি, তামিলনাড়ুর কোটা ও তোদা, ঝাড়খণ্ডের বিরহর, মহারাষ্ট্রের নিহালি, মেঘালয়ের রুঘা এবং পশ্চিমবঙ্গের তোতো চর্চার অভাবে বিলুপ্তির পথে ভেলা ভাসিয়েছে।

সারা পৃথিবীতেই ইউরোপীয় ভাষাগুলির আগ্রাসনে আজ বহু ভাষাই বিলুপ্তির পথে। মেক্সিকানদের আদিভাষা কী ছিল, তা সঠিক করে বলা যায় না, মরিসাসের আফ্রিকান কিম্বা ভারতীয়দের বর্তমান ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইংরেজি অথবা ফরাসি। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরা নিজেদের পূর্বপুরুষদের ভাষায় কথা বলেন না। ভারতে মূলত হিন্দি ভাষার বহুল ব্যবহারে এবং সরকারি নানান ক্ষেত্রে এই ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে একসময়ের ‘ভাষার হটস্পট’ ভারতও নিজের ভাষা বৈচিত্রতা থেকে আজ অনেকটাই বঞ্চিত।

এবার আসা যাক, বাংলাদেশের কথায়। ১৯৫২ সালে আজকের দিনেই যে দেশের মানুষ নিজেদের মাতৃভাষার মর্যাদা স্থাপনের লক্ষ্যে পুলিশের বন্ধুকের নলের সামনে দাঁড়াতেও দুবার ভাবেনি, সেই দেশের অনেক ভাষাও আজ বিলুপ্তির পথে। নিজেদের ভাষার প্রতি অবহেলা এবং সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যপক প্রভাবে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলির ভাষা আজ হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বাংলা ছাড়াও আরো ৪০টি ভাষা থাকলেও এরমধ্যে প্রায় ১৮টি বর্তমানে বিপন্ন ভাষায় পরিণত হয়েছে। তবে এই ক্ষুদ্র ভাষাগুলি রক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচালক অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলি বলেছেন, লুপ্তপ্রায় এই ভাষাগুলির মধ্যে ছোঁওরা ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা মোটে চার। এছাড়াও কোল ভাষায় ২ হাজার ৮৪৩ জন, মালত ভাষায় ৮ হাজার জন, কন্দু ভাষায় ৬ হাজার সাতশো জন মত মানুষ কথা বলেন।

ভাষা গবেষকরা আবার এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষদের, জীবিকার কারণে বাস্তুচ্যুত হবার ঘটনাকেও ভাষা বিলুপ্তির কারণ হিসাবে দায়ী করেছেন। এই ভাষাগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হিসাবে তাঁরা মাতৃভাষায় শিক্ষাদনের বিষয়টির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অনেক্ষেত্রেই আবার দেখা যাচ্ছে এই নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারলেও, বর্ণমালার সঙ্গে তাঁদের কোন পরিচয় নেই। ২০০৮ সালে গড় এলাকায় ১২টি বিদ্যালয় প্রথিস্থা করে হয়েছিল। সেখানে গারো শিশুদের আচিক ভাষায় পাঠদান করা হত কিন্তু তিন বছর পর অর্থের অভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে ক্ষমতাসীন সরকার জাতীয় শিক্ষা নীতিমালায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার কথা ভাবলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।