কোকে কোকেন ফেরাব, বলছেন এলন মাস্ক || সত্যিই কি ঠান্ডা পানীয়ে মিশত ভয়ানক মাদক?

Madhurima Pattanayak
৩ মিনিট
কোকে কোকেন ফেরাব, বলছেন এলন মাস্ক ||  সত্যিই কি ঠান্ডা পানীয়ে মিশত ভয়ানক মাদক?

"এরপরে আমি কোকাকোলা (সংস্থা) কিনব, এবং আবার কোকাকোলায় কোকেন মেশানোর চল ফিরিয়ে আনব।" ট্যুইটার কিনে এমনই বক্তব্য ট্যুইট করলেন এলন মাস্ক (Elon Musk)।

সত্যি-ই কি কোকাকোলায় (Coca-cola) কোকেন (cocaine) থাকে? এই সত্য জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৮৮৫ সালে, যখন আমেরিকার জর্জিয়ার ফার্মাসিস্ট জন পেমবার্টন (John Pemberton) নিজের বাড়ির পিছনে বসে কোকাকোলা বানাচ্ছেন।

১৮৮৮ সালে পেমবার্টনের মৃত্যু হয়। মারা যাওয়ার আগে তিনি কতিপয় লোককে কোকাকোলার মূল রেসিপি জানিয়ে গিয়েছিলেন, যা তার আগে প্রকাশ পায়নি। কী ছিল পেমবার্টনের বানানো মূল কোকাকোলার রেসিপি? হ্যাঁ, কোকেন সত্যি-ই মিশিয়েছিলেন পেমবার্টন।

কোকেন তৈরি হয় কোকা পাতা (Coca leaf) থেকে, এরিথ্রোজা়ইলাম কোকা (Erythroxylum coca) সেই গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম (Scientific name)। যার জন্যই 'কোকা' শব্দটির উপস্থিতি কোকাকোলাতে । অন্যদিকে 'কোলা' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কোলা বাদাম (Cola nut) থেকে পাওয়া ক্যাফেইন (Caffeine) কোকাকোলায় ব্যবহার করা হয়েছিল বলে।

কোকাকোলার ঔষধিগুণ না কি অপব্যবহার ?

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ড্রাগ অ্যাবিউজ-এর (National Institute of Drug Abuse) তরফ থেকে জানানো হচ্ছে, বর্তমানে একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে বিভিন্ন ড্রাগের উপযোগিতা সম্পর্কে জানা যাচ্ছে, পাশাপাশি তাদের অপব্যবহারের (Drug Abuse) প্রভাব সম্পর্কেও জানা যাচ্ছে।

পেমবার্টন কোকাকোলাকে 'বুদ্ধিজীবীদের টনিক' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কারণ এতে উপস্থিত কোকেন ও ক্যাফেইন, দুই-ই মানুষের মস্তিষ্ককে সাময়িকভাবে উত্তেজিত করে।

তিনি এমনও দাবি করেন, কোকাকোলা পেট খারাপ থেকে শুরু করে মাথা ব্যথা, এমনকী, ক্লান্তিরও উপশম করে। পেমবার্টনের তৈরি এই 'মিশ্রণ' একাধিক শারীরিক অসুখের নিরাময় করেছিল সেই সময়ে, এমনই জানা যায় ন্যাশানাল ইন্সটিটিউট অফ ড্রাগ অ্যাবিউজ-এর তরফ থেকে।

উনিশ শতকে মূল ওষুধগুলিকে ড্রাগ স্ক্রিনিং টেস্ট পাশ করতে হত না। তাদের উপযোগিতা এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করে দেখতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও হত না। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যে কোনও ড্রাগ এবং রাসায়নিক পদার্থকে ওষুধ হিসেবে প্রয়োগ করার আগে যে সতর্কতা এবং নিয়মকানুন মানা হয়, সেসবের কোনও প্রশ্নই ছিল না উনিশ শতকে দাঁড়িয়ে। যে কেউই নিজের বাড়ি বা গবেষণাগারে তৈরি মিশ্রণকে ঔষধিগুণসম্পন্ন বলে দাবি করতেন।

কোকেনকে শরীরে স্থানীয়ভাবে ব্যথা উপশমের জন্যে ব্যবহার করা হলেও, এর প্রবল ক্ষতিকর প্রভাব হার্ট এবং চোখে গিয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় শরীরে রক্ত সরবরাহও।

সত্যি কতটা ঔষধিগুণ আছে কোকাকোলার?

কোকেনের পাশাপাশি ওপিয়ামও উপস্থিত এই পানীয়ে। ওপিয়ামেও শরীরে প্রবল ব্যথা উপশমে কাজে আসে ঠিকই, কিন্তু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিম্ন রক্তচাপ (Low blood pressure), ঝিমুনি ভাব (Dizziness), বমি বমি ভাব (Nausea) কিংবা সংজ্ঞা হারানোর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অপব্যবহারে কোকেন ও ওপিয়াম, এই দুইকেই মাদক তকমা দেওয়া যায়। কোকেনের প্রভাবে প্রাথমিকভাবে ডোপামাইন নামের নিউরো-হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ডোপামাইনকে বলে হ্যাপি হরমোন। তাই হঠাৎ করেই শরীরে শক্তি বেড়ে যায়। কোকেন সেবনের পরে অত্যধিক আনন্দবোধ হতে শুরু করে। কারও কারও ক্ষেত্রে আবার রাগ বাড়ে। পাশাপাশি স্পর্শ, আওয়াজ বা আলোতে অত্যন্ত বেশি স্পর্শকাতরতা বেড়ে যায়।

ধীরে ধীরে এর কোকেনের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন কোকেন সেবনে মস্তিষ্ক বিকৃতি, হার্টের অসুখ, খিঁচুনি, মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা বা রাগের মতো সমস্যা দেখা যায়। এমনকী, নাক থেকে রক্তপাতের ঘটনাও দেখা যায় দীর্ঘদিন কোকেন সেবনের ফলে।

শুধু কোকেন ও ওপিয়াম নয়, পারদ এবং সিসার মতো ক্ষতিকর পদার্থও থাকত। এই দুই ধাতুই নানা রকমের নার্ভজনিত অসুখের জন্যে দায়ী।

১৮৯১ সাল নাগাদ মার্কিন জনসংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কোকাকোলায় কোকেন ও ওপিয়ামের (Opium) ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই, কোকাকোলার নির্মাতাদের সেই পানীয়ের রেসিপি সম্পর্কে আবার নতুন করে ভাবতে হয়।

তবে কি কোকেন সরানো হল কোক থেকে শেষমেশ?

ধীরে ধীরে কোকাকোলায় কোকেনের ব্যবহার কমে আসে। শেষমেশ, ১৯২৯ সালে কোকেনের মিশ্রণ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়।

বর্তমানে কোকাকোলায় ব্যবহার করা হয় হাই-ফ্রুকটোজ় কর্ন সিরাপ (High Fructose Corn Syrup) বা সুক্রোজ় (Sucrose), যা মূলত কোকাকোলার মিষ্টি স্বাদের জন্য দায়ী। কালচে বাদামি রঙের জন্য ব্যবহার করা হয় ক্যারামেল (Caramel) রঙ। পাশাপাশি থাকে ক্যাফেইন, ফসফরিক অ্যাসিড (Phosphoric Acid)।

আর থাকে Merchandise 7X (মার্চেন্ডাইজ় সেভেনএক্স)। এই Merchandise 7X-এ কী কী মেশানো হয়, তা স্পষ্ট করে কোনওদিনই জানানো হয়নি সংস্থাটির তরফ থেকে। তবে ধারণা করা হয়, এতে কমলালেবু, পাতি লেবু, লাইম, ল্যাভেন্ডারের মতো মিশ্রণ থাকে। তবে মূল রেসিপিতে পেমবার্টন সামান্য অ্যালকোহলও মিশিয়েছিলেন।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

করোনা সেরে গেলেও পিছু ছাড়ছে না ক্লান্তি! লং কোভিড নিয়ে নতুন গবেষণায় কী জানা গেল?

Long COVID: করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকের শরীরে থেকে যাচ্ছে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা। লং কোভিড নিয়ে নতুন মার্কিন গবেষণায় দেখা গেল, তিন বছরে প্রায় অর্ধেক রোগীর উপসর্গ কমেছে এবং এক-চতুর্থাংশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু কোন ধরনের উপসর্গ থাকলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? কী বলছে গবেষণা?

কলকাতা বন্দরে উদ্ধার সাড়ে ১৩ কোটি টাকার ই-সিগারেট, শরীরের কী কী ক্ষতি করে এই ইলেকট্রনিক সিগারেট?

E-Cigarette Side Effects: কলকাতা বন্দরে প্রায় ৫৫ হাজার ই-সিগারেট উদ্ধার করেছে রাজস্ব গোয়েন্দা দফতর (DRI)। উদ্ধার হওয়া পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৩.৫ কোটি টাকা। ভারতে নিষিদ্ধ এই ইলেকট্রনিক সিগারেট শরীরের কী কী ক্ষতি করতে পারে?

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় DT-109 কতটা কার্যকর হতে পারে?

Fatty liver: ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় DT-109 কতটা কার্যকর? অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে এই পরীক্ষাধীন ওষুধ লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে? প্রাণীর শরীরে আশাব্যঞ্জক ফল মিললেও মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা কি প্রমাণিত হয়েছে? ভবিষ্যতে কি গুরুতর ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় নতুন দিশা দেখাতে পারবে DT-109?

ইউক্রেনকে বিসর্জন দিয়ে পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প?

Trump Putin relationship: ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠতা বর্তমান বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণকে নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে?

বাংলার স্বাস্থ‍্যরক্ষায় সরকারি স্বাস্থ্যব‍্যবস্থা সংহত হওয়া জরুরি: অভিজিৎ চৌধুরী

Abhijit Chowdhury Interview: তিনি বাঙালির ‘লিভারের ডাক্তারবাবু’ বলেই সমধিক পরিচিত। দীর্ঘদিন সরকারি ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। অবসরের পরেও জড়িয়ে রয়েছেন চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে। সোনারপুরে গড়ে তুলেছেন ‘লিভার ফাউন্ডেশন’। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে তাঁর পরবর্তী স্টেশন ‘স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়’।

হঠাৎ হৃদযন্ত্র বন্ধ হলে কী করবেন? নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর জেনে নিন CPR-এর জরুরি নিয়ম

How to perform CPR: ধরুন, হঠাৎ কেউ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। ডাকলেও সাড়া দিচ্ছেন না, স্বাভাবিকভাবে শ্বাসও নিচ্ছেন না। এমন অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই। তাহলে, কী করবেন তখন?

থালায় খাবার, নাকি বিষ? খাদ্যব্যবস্থার ভিতরে যেভাবে ঢুকছে কীটনাশক ও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ

Poison on the Plate: বায়ার-মনসান্টো ও সিনজেনটার মতো 'বিগ সিক্স' কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে বিশ্বের বীজ বাজার। ২০২৩ সালে ভারতে ১০,৭৮৬ জন খাদ্য উৎপাদক কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২৮ শতাংশ খাদ্য নমুনায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত গ্লাইফোসেটকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্ষতিকারক ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবুও এর ব্যবহার থামেনি। অন্যদিকে, প্রচারের অন্তরালে সিকিম আমাদের দেশের প্রথম শতভাগ জৈব কৃষির রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সারা বিশ্বজুড়ে কৃষিবিদ বন্দনা শিবার ‘পয়জন-ফ্রি ফুড অ্যান্ড ফার্মিং ২০৩০’ অভিযানের ডাক আমাদের খাবারের থালাকে বিষমুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।