সন্তানলাভের সঙ্গে জড়িত জামাইষষ্ঠীর আচার, পার্বণের আড়ালে রয়েছে যে কাহিনি

বধূর বাবা-মা একদিন ষষ্ঠী পুজো আয়োজন করেন। সেদিন আমন্ত্রণ করেন জামাই ও মেয়েকে। শোনা যায়, এই পুজোয় ষষ্ঠীদেবী খুশি হন।

tiasa gupta
৪ মিনিট
সন্তানলাভের সঙ্গে জড়িত জামাইষষ্ঠীর আচার, পার্বণের আড়ালে রয়েছে যে কাহিনি

গ্রীষ্মের দহন-জ্বালা রয়েছে। রয়েছে পকেটে ছ্যাঁকা খাওয়া বাজারদর। তার মধ্যেও বাঙালি যে উৎসবের জোয়ারে ডুব দেবে, তা বলাই বাহুল্য। সব প্রতিবন্ধকতাকে চ‍্যালেঞ্জ করে পয়লা বৈশাখ দিয়ে বাঙালির বার্ষিক পার্বণের শুরু। এবার জামাইষষ্ঠীর পালা। আদরের জামাইকে এই বিশেষ দিনে কোন নতুনত্বে ভরিয়ে দেওয়া যায়, তার প্রস্তুতি সেরে ফেলেছেন শাশুড়িরা। বাজারে ছ্যাঁকা খেলেও আড়ম্বর কম করার উপায় নেই। দুই বছর পরে জামাই বাবাজীবনের এই আদরের পালা। কাজেই ধুতির কোঁচায় আজ আর সেই বহর না থাকলেও সব জামাই এদিন মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে মাঞ্জা মেরে যান শ্বশুরবাড়ি। এমন ভুরিভোজের সুযোগ তো আর সারা বছর মেলে না। জামাইয়ের ভুরিভোজের আয়োজনে শ্বশুরের পকেট কতটা খসল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আজকের জামাইকে খুশি করতে কেন শ্বশুরকে দেউলিয়া হতে হবে, এই প্রশ্ন একপাশে রেখেও বলা যায়, যে আরাধনা ও বিশ্বাসে নারীসত্তা প্রশ্নের মুখে, তার যৌক্তিকতা কতটা?

পুজোর নিয়ম

সকালে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরে শাশুড়িরা জামাইয়ের জন্য পালন করেন জামাইষষ্ঠী। জলভর্তি ঘট স্থাপন করে তাতে আমপাতা ও তালপাতা রাখার নিয়ম রয়েছে। এরপর তাতে ১০৮টি দুর্বা বেঁধে রাখতে হয়। এরপর হলুদ, কাঁঠালপাতা, সুতো, বেলপাতা একসঙ্গে গিঁট বেঁধে মা ষষ্ঠীর পুজোয় অর্পণ করার নিয়ম রয়েছে। পরবর্তীতে পুজোর প্রসাদ জামাইকে দেওয়ার পর লাগিয়ে দিতে হবে হলুদের তিলক বা ফোঁটা। এরপর শুরু হবে খাওয়ার পর্ব।

জামাই-আদরের রীতিনীতি

জামাইষষ্ঠীর দিন জামাইয়ের হাতে হলুদমাখানো সুতো বেঁধে দেওয়া হয় মা ষষ্ঠীর আর্শীবাদরূপে। এরপর দীর্ঘায়ু কামনায় তেল-হলুদের ফোঁটা কপালে দিয়ে তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করা হয়। ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়। সঙ্গে একটি থালায় সাজিয়ে দেওয়া হয় পাঁচটি বিভিন্ন রকমের গোটা ফল। এ তো গেল পুজোর রীতিনীতি। জামাইষষ্ঠীর আসল চমক হল জামাইয়ের জন্য শাশুড়ির নিজের হাতে রান্না করা পঞ্চব্যাঞ্জন। বিভিন্ন ধরনের মাছ, মাংস, মিষ্টির এলাহি আয়োজন। এখন অবশ্য উপহার দেওয়া-নেওয়ারও একটা পর্ব থাকে। নিয়মকানুন, রীতিনীতি, খাওয়াদাওয়া, উপহার আদানপ্রদানের ভিড়ে এই উৎসবে মিশে থাকে সারা বছর ব্যস্ততার কারণে মেয়ে জামাইকে কাছে না-পাওয়া মায়ের আবেগও। জামাই আদর মানে শুধু পাখার বাতাসের রেওয়াজ নয়, দুপুরের দেখার মতো আহার। এই একটা দিন খাবারে বাদশাহী আয়োজন। থালার চারদিকে বাটির বাহার। তাতে ইলিশ, চিংড়ি থেকে পাঁঠার মাংস। কী নেই! সঙ্গে শেষ পাতে মিষ্টিমুখ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভোজ কয় যাহারে! জামাইষষ্ঠীর ভুরিভোজে যে যে পদ রাখতেই হবে

শ্বশুরবাড়িতে জামাই পা রাখামাত্রই শুরু হয়ে যায়, ‘জামাই আদর’।

জামাইষষ্ঠী ঘিরে সংস্কার

এক সময়ে সংস্কার ছিল যে, ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মেয়ের বিয়ের পর তাঁর বাবা বা মা মেয়ের বাড়িতে তত দিন পর্যন্ত যেতে পারবেন না, যত দিন না মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হন বা সন্তানের জন্ম দেন।

জামাইষষ্ঠী মূলত লোকায়ত প্রথা। ষষ্ঠী দেবীর পার্বণ থেকেই এই প্রথার উদ্ভব। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে প্রথম প্রহরে ষষ্ঠীদেবীর পুজোর আয়োজন করা হতো। ষষ্ঠী দেবী মাতৃত্বের প্রতীক। তাঁর বাহন বিড়াল। তাই মেয়ের মুখ দেখতে এবং মেয়ের দ্রুত সন্তানলাভের কামনায় মেয়ে-জামাই আদরের পরিকল্পনা করা হলে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা তিথিতে পালিত হয়ে আসছে জামাইষষ্ঠী উৎসব।

জামাইষষ্ঠী ও কাহিনি

জানা যায়, বহু বছর ধরে জামাইষষ্ঠী নিয়ে এক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। তা হল, এক গৃহবধূ বাপের বাড়িতে গিয়ে মাছ চুরি করে খান। তার দোষ তিনি দিয়ে দেন বাড়ির বিড়ালের ওপর। বিড়ালকে যেহেতু ষষ্ঠী দেবীর বাহন মনে করা হয়, তাই এই চুরির বোঝা বিড়ালের ওপর পড়তেই তার পাপ গিয়ে পড়ে ঘরের বধূর উপর। হারিয়ে যায় সেই বধূর সন্তান। তখন তিনি গিয়ে ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা করেন।

এদিকে, ষষ্ঠীদেবীর আরাধনার মধ্যেই বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেন বধূ। চুরির দায়ে লজ্জায় আর গৃহমুখে যেতে পারছেন না তিনি। তখন সেই বধূর বাবা-মা একদিন ষষ্ঠী পুজো আয়োজন করেন। সেদিন আমন্ত্রণ করেন জামাই ও মেয়েকে। শোনা যায়, এই পুজোয় ষষ্ঠীদেবী খুশি হন। আর ওই বধূ ও তাঁর স্বামী সুখের জীবন কাটান এরপর।

জনপ্রিয় মিথ

জামাইষষ্ঠীকে ঘিরে বহুকাল ধরে লোকগাথা প্রচলিত। কাহিনি বলছে, এক রাজা ও তাঁর স্ত্রী ১২ বছর ধরে সন্তানলাভের জন্য যজ্ঞ করেছিলেন। রানি প্রতিবারই মৃত সন্তান প্রসব করেন। মৃত সন্তানকে নিয়ে ঘাটে আসেন দম্পতি। তখন মা ষষ্ঠী তাঁর বাহনে চেপে উদয় হন। তিনি আশীর্বাদ করেন, মা ষষ্ঠীর পুজো চালু করলেই, তাঁরা জীবিত সন্তান পাবেন।

বিশ্বাস ঘিরে প্রশ্ন

মা ষষ্ঠীর দয়া মানেই শুধুই সন্তান দাও? এর সঙ্গে জড়িয়ে যে বিশ্বাস ও মিথ, তা নিয়ে এই শতকের মেয়েদের প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। আজকের মেয়েরা কেরিয়ার-সচেতন এবং আত্মনির্ভরশীল। ফলে তাঁরা যে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র নয়, তা বলাই বাহুল্য। তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, মায়েদের ষষ্ঠীদেবীর আরাধনা মেয়ের সন্তানলাভের আকাঙ্ক্ষা না জামাইয়ের ভুরিভোজ? জামাই কবজি ডুবিয়ে খান বা ভার্চুয়াল ভোজন- মোদ্দা কথা হলো, এখনও সামাজিক বিয়েতে সম্প্রদানের মতো জঘন্য প্রথা রয়ে গেছে, যেখানে মেয়েকে একটি সামগ্রীর মতো তাঁর স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়। আর এটাই বা কেমন আরাধনা! জামাইকে তুষ্ট করার মধ্য দিয়ে মেয়ের সন্তানলাভের জন্য মায়ের আকুতি! শ্বশুরবাড়িতে তা না হলে নাকি বাপের বাড়ির সম্মান থাকে না। একজন নারী কখন মা হবেন, এটা ঠিক করবে সমাজ? আজকের দিনে!

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।