কলকাতার তো বটেই, যিশু গোটা বাংলার, খ্রিস্ট-কৃষ্ণকে সত্যিই মিলিয়েছে বাঙালি

rudranjan
৩ মিনিট
কলকাতার তো বটেই, যিশু গোটা বাংলার, খ্রিস্ট-কৃষ্ণকে সত্যিই মিলিয়েছে বাঙালি

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী লিখেছিলেন, ‘কলকাতার যীশু’। তবে বড়দিন এলে যিশু কেবল কলকাতার থাকে না। শহরের গন্ডি ছাড়িয়ে সে হয়ে ওঠে সারা বাংলার আরাধ্য ইষ্টদেবতা। প্রাদেশিক ভাষার মধ্যে দিয়ে সংস্কৃত রামায়ণের যে তিনটি অনুবাদ হয়েছিল, তার মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কম্বনের তামিল রামায়ণ, ভক্তি আন্দোলনের স্রোতে প্রভাবিত তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ এবং বাংলায় কৃত্তিবাস ওঝা বিরচিত ‘রামায়ণ পাঁচালি’। কৃত্তিবাসের রাম হয়ে উঠেছিল বাঙালির ঘরের ছেলে। যা বাঙালির রোজের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেই পাঁচালির ছন্দেই তিনি বেঁধেছিলেন তাঁর রামকথাকে। একইভাবে, বড়দিন এলে যিশুও হয়ে ওঠে বাংলার একান্ত আপন, চিরনিজস্ব। ক্রুশবাহক মানবপুত্র কেবল পাশ্চাত্যের ধর্মপ্রচারক পরিচয়ে চিহ্নিত থাকেন না আর।

পুঁটিমারি বা চাপড়া প্রভৃতি অঞ্চলে ডিসেম্বর সকালে গেলে আজো শোনা যাবে যিশুখ্রিষ্টের পদ। তাদের সুর আমাদের ভারতের নিজস্ব রাগ রাগিণীতেই গাঁথা, কোনোটা ইমন, কোনোটা পরজ, পূর্বী, আবার কখনো বা জয়জয়ন্তীর রেখাবের ছোঁয়া। তাল জৎ বা একতাল। বড়দিন এগিয়ে এলেই নদিয়ার মানুষজন খোল করতাল হাতে পথে বেরিয়ে পড়েন। তাঁদের গলায় শোভা পায় যিশুর কীর্তন। দূর থেকে শুনে এ সমস্ত পদকে মনে হবে অবিকল কোনো বৈষ্ণব ধর্মগীতের মতো, কিন্তু কাছে গেলেই আপনি চমকে উঠতে বাধ্য। গানের ভাষার সাথে রাধা কৃষ্ণের কীর্তনকাব্যের তো বিশেষ সাদৃশ্য নেই, রয়েছে কেবল ভাবের সাদৃশ্য। ‘পূরব গগনে দেখো গো চাহিয়ে, নবতারা উদয় হল / জ্যোতির্বিদগনে নিরখি নয়নে, সেই তারার পিছে ধাইল।’ বোঝাই যাচ্ছে, যে ‘নবতারা’র কথা এখানে বলা হচ্ছে, তা আমাদের বহুল পরিচিত ‘the star of Bethlehem’।

এভাবেই চলতে থাকে। প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয় ‘নভেনা’ বা ‘নবহ প্রার্থনা’। তারপর পঁচিশে ডিসেম্বর মধ্যরাতে, ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁলে, পরম পিতার আরাধনায় গাওয়া হয় ক্যারল। সে ক্যারল ও রচিত খাঁটি বাংলায়। গানের লিপি ‘পরম করুণাময় আশীর্বাদ করো আমাদের’-এই ধরনের।

-

কোম্পানির আগমনের আগেও খ্রিষ্টচর্চার ইতিহাস এ দেশে ছিল। কোসমাস নামক এক অ্যালেকজান্দ্রিয় বণিক তাঁর ভ্রমণকথা লিখছেন ষষ্ঠ শতাব্দীতে। সেখানে তিনি দক্ষিণ ভারতের একটি গির্জা ও তার পাদ্রির উল্লেখ করছেন। এরপর বিপুল পরিমাণে আগমন ঘটে পর্তুগিজ ও আর্মেনিয়ানদের। বহির্বিশ্ব থেকে খ্রিষ্টচর্চার ধারা তারা বয়ে নিয়ে আসেন এ দেশে। বাংলা জুড়ে তৈরি করেন একাধিক উপাসনালয়।

কৃষ্ণের সাথে খ্রিষ্টকে কিছু ক্ষেত্রে এক আসনে বসিয়ে দেখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই দুই ধর্মনেতার কিছু সাংস্কৃতিক নৈকট্যও আমরা দেখতে পাই, কারণ জানা যাচ্ছে, কৃষ্ণের অত্যাচারী মামা কংসর মতোই খ্রিষ্টের ছিল রাজা হেরোদ। এ ছাড়াও ইংরেজ সাহেবরা খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে শ্রীরামপুর প্রেস থেকে যে সমস্ত বইপত্র ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করছিলেন, তাদের নাম দেওয়া হচ্ছিল, ‘খ্রিষ্টবিবরণামৃতং’ বা ‘নিস্তাররত্নাকর’। ‘খ্রিষ্টবিবরণামৃতং’ রচিত ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’র আদলে, ‘নিস্তাররত্নাকর’ রচনার ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয় ‘ভক্তিরত্নাকরে’র ছাঁচ। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রচনা করা হচ্ছিল এ সমস্ত গ্রন্থ। ধর্মপ্রচারে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা গড়ে তুলতে বৈষ্ণব গ্রন্থের আদলকেই বেছে নিয়েছিলেন ইংরেজরা। যদিও খ্রিষ্টে আর কৃষ্টে তফাৎ কিছু আছে বই কী। কৃষ্ণ তো আর জোসুয়ার মতো ক্ষমাশীল নন, সময় সময় তিনি প্রচণ্ড হয়ে ওঠেন। ইংরেজদের ধর্মপ্রচারের বিরুদ্ধে আঁটোসাঁটো প্রতিরোধের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন বাংলার ‘নবজাগরণে’র চালকরা। এমনকী খ্রিষ্ট প্রচারের প্রাবল্যকে ঠেকাতে পৌত্তলিকতাবাদীদের সাথেও যোগাযোগ স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। কিন্তু সংস্কৃতির স্রোত কে আর কবে আটকাতে পেরেছে। তা তো বহতা নদীর মতোই সমতলের জীবনকে জাপ্টে ধরে ভূখণ্ড নির্বিশেষে। বাংলার মদেশীয়রা তো এই দিনটিকে পরব হিসেবে পালন করেন। পেগানিজমের স্রোত ঢুকেছে প্রান্তিক সমাজে। এই যিশু লালিত হন একান্তই দেশীয় লোকাচারে। এখানে কোনও পশ্চিমা ছায়া নেই।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার জল হাওয়া লেগে যিশুও হয়ে উঠলেন বাঙালির কাছের মানুষ। ‘ম্লেচ্ছ’ দেশের অপরজন হয়ে থাকল না মেষপালক পৃথিবীর রাজা। খোঁজ নিয়ে দেখলে দেখা যাবে বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারগুলিও এতটাই সম্পৃক্ত বাংলার জল হাওয়া-যাপনের সঙ্গে, বাঙালি খাবার দাবার ছাড়া মুখে কিছুই তাদের মুখে রচেনা। মিলে মিশে গিয়েছে নতুন গুড়, প্লাম আর পুডিং। বিবাহ অনুষ্ঠান হয় খ্রিষ্টান পাদ্রি ডেকে, কিন্তু বাংলার সব রীতি নীতিই সেখানে বজায় থাকে। অনেকেই জানেন সম্বৎসর যিশুপুজো হয় বেলুড় মঠে। সন্ধ্যা আরতির পর সেখানে বিতরণ করা হয়েছে কেক, সন্দেশের ভোগ, গাওয়া হয়েছে যিশুর গান। এই প্রতিগ্রহণই, বাংলার মাটিতে সকল ধর্মকে এক সুরে বেঁধেছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে বিবেকানন্দ-যিশুপ্রেমিক বাঙালি মণীষার তালিকাও কিন্তু লম্বা। সেন্ট পলস গির্জায় যিশুর শেষ ভোজ এঁকেছেন যামিনী রায়। হিব্রুর ‘জোসুয়া’ থেকে বাংলার ‘করুণাময় ইশ্বর’ হয়ে ওঠা খ্রিস্টের সৌজন্যে বাংলার সাংস্কৃতিক যে সমৃদ্ধি তাকে চেটেপুটে খেতে হয় বইকি।

তথ্যঋণ-

দিশিকৃষ্ণ ও ঋষিকৃষ্ণঃ বিশ্বজিৎ রায়

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।