কোথা থেকে বিরিয়ানি এল এই শহরে? কেন কলকাত্তাইয়া বিরিয়ানিতে আলু 'মাস্ট'

rudranjan
৩ মিনিট
কোথা থেকে বিরিয়ানি এল এই শহরে? কেন কলকাত্তাইয়া বিরিয়ানিতে আলু 'মাস্ট'

সমস্ত দিনের আয়োজনের শেষে ফুটে উঠছে মিহি লম্বাটে চাল। পারিপার্শ্বিক মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে তার হৃদয় বিদারক ঘ্রাণ। এরপর আটার ময়ানের উপর থেকে হাঁড়ির ঢাকনা সরবে। চওড়া মাপের হাতা দিয়ে হলদেটে ভাতের অতল গহ্বর থেকে চেঁছে আনা হবে মাংসের টুকরো। প্লেটে প্লেটে খাদ্যরসিকদেরর খাওয়ার টেবিলে পৌঁছে যাবে বেহেস্তের নজাকত। ঠিক যেভাবে 'বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ়' নেমে আসে রুক্ষ মাটির উপর। বিরিয়ানি পাগল বাঙালি। তার বাস্তুভিটের অলিগলি জুড়ে ছড়িয়ে আছে লাল সালুতে মোড়া অসংখ্য রত্নপেটিকা। তাদের ইবাদতখানায় চলে ক্যাওড়া জলের গন্ধ আর কেশরী অভার আলাপচারিতা। ঢাকাইয়া কাচ্চি চাও? ঘুরে এসো খিদিরপুরের 'ইন্ডিয়া রেস্টুরেন্টে' থেকে। হায়দরাবাদির জন্য 'সর্বদা হুহু করে মন'? গন্তব্য তাহলে পার্ক স্ট্রিট মোড়ের প্যারাডাইস। খাঁটি কলকাত্তাইয়া বিরিয়ানির লজিজ্ স্বাদ মিলবে রহমানিয়া, আরসালান, সিরাজে। আবার শহরতলির দিকে পাবে আজমা। এ ছাড়াও, পাড়ার মোড়ে মোড়ে লাল কাপড়ে ঢাকা হাঁড়ির জাদুকররা তো আছেনই। তাঁদের মায়ামাখা হাতের ম্যাজিকেই তো বিরিয়ানি হয়ে উঠেছে কলকাতাবাসীর নিত্য জীবনের সঙ্গী। তবে, যে ইন্দো-পারসিক খাদ্যকে ঘিরে এত উন্মাদনা,তার উৎস আসলে কোথায়, সে প্রশ্নে বিতর্কের অন্ত নেই।

বিরিয়ানির জন্মবৃত্তান্ত

নানা মুনির নানা মত। কেউ মনে করেন তৈমুর লঙের সঙ্গে ভারতবর্ষের মাটিতে আবির্ভাব ঘটেছিল বিরিয়ানির। আবার কারোর মতে, তার সৃষ্টি সেই মুমতাজ মহলের যুগে। কিন্তু, দুটো তত্ত্বই খানিক ত্রুটিপূর্ণ। বিরিয়ানির জন্মভূমি যে ইরান সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, তবে বর্তমানে তার যে চেহারাটা পাওয়া যায়, সেটা গড়ে উঠেছিল ভারতে।ফার্সি 'বিরিয়ান' থেকে উৎপত্তি হয়েছে 'বিরিয়ানি' নামের। একসময় মধ্যপ্রাচ্যের তুর্কি জনজাতির দূরপাল্লার যাত্রার খাদ্য ছিল এই 'বিরিয়ান'। রান্নার ব্যবস্থা বেশ সহজ সরল। 'ডেগ' বা হাঁড়ির ভেতর ভাত হালকা ভেজে নিয়ে তার উপর ছড়িয়ে দাও মাংসের টুকরো। তারপর ঢিমে আঁচে রান্না করে গরম গরম পরিবেশন করো। কালে কালে ভারতবর্ষের সঙ্গে মধ্য প্রাচ্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হল। হিন্দুস্থান হয়ে উঠল বিরিয়ানির পরিণয়ক্ষেত্র।

যেমন ধরা যাক, লখনউ-এর বিরিয়ানি। লখনৌর নবাবদের আসল মুলুক ছিল ইরান। তাঁদের বংশের প্রধান পুরুষ সাদত আলি খান ভাগ্যান্বেষণে এসে পৌঁছন দিল্লিতে। তারপর ফারুকশিয়ারের উত্তরসূরি মোহম্মদ শাহর স্নেহভাজন হয়ে তাঁর কাছ থেকে লাভ করেন 'আউধ' নামক একটা সুবা। সাদাত আলির নাতি আসফউদ্দৌলার সিদ্ধান্তেই আউধের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় লখনউ। কালক্রমে তার রন্ধনশালার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে বিরিয়ানি। পারস্য দেশের প্রভাবের ফলে সেই বিরিয়ানি চেহারায় লাগে ইরানি স্বাদের চেকনাই। মোরাদাবাদী বিরিয়ানি স্বাদে এবং গন্ধে সম্পূর্ণরূপে আলাদা। লখনৌর সাথে তার মিল বিশেষ নেই। তার কারন, আফগানিস্তানের রোহিল্লা পাঠানদের হাত ধরেই উত্তর প্রদেশের পশ্চিমভাগে ছড়িয়ে পড়েছিল এ বিরিয়ানির খ্যাতি। ফলত, আফগানি রঙেই রঞ্জিত হয়েছিল সে।

হায়দরাবাদি আর কলকাত্তাইয়া বিরিয়ানির ফারাক

হায়দরাবাদের বিরিয়ানিতে পাওয়া যাবে অন্ধ্রের মরিচের তীক্ষ্ণ ঝাঁজ। কলকাতা বা লখনৌর বিরিয়ানির যে স্বাদের সঙ্গে আমরা পরিচিত, তার থেকে হায়দরাবাদের অবস্থান যোজন মাইল দূরে। তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত নিজামি ভাঁড়ারের বিশেষ কলা কৌশল। আর আছে খাস কলকাত্তাইয়া বিরিয়ানি। উত্তর বা দক্ষিণ ভারতীয় বিরিয়ানিতে আলুর দেখা পাওয়া যাবে না। সেখানে শুধুই ভাত আর মাংসের রাজত্ব। মাঝে মধ্যে ভাত দিয়ে খাওয়ার মতো এক ধরনের তেল ঝালের মশলাদার ঝোল। কলকাতার বিরিয়ানিতে আলু এসে হাজির হয়েছিল খোদ ওয়াজিদ আলি শাহর দৌলতে। সেও এক বিস্ময়কর গল্প ।

যে ভাবে আলু এল কলকাতার বিরিয়ানিতে

১৮৫৬ সালে, অর্থাৎ সেপাই বিদ্রোহের আগের বছর, রূপকথার শহর লখনৌ থেকে নির্বাসিত হয়ে ওয়াজিদ আলি এসে উঠলেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তিতে প্রতি মাসে এক লক্ষ টাকা মাসোহারার ব্যবস্থা হল তাঁর। একসময় যাঁর এক এক খিলি পানে থাকত আসল মুক্তাভস্ম, তাঁর কাছে আর এক লক্ষ টাকা এমনকী। কিন্তু তখন তাঁর নবাবীর দিন গিয়েছে। ইংরেজদের কাছে গলবস্ত্র হয়ে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই। অথচ, মাসিক রাহাখরচও কম নয়। মাত্র লাখ টাকায় কি আর আউধি বিরিয়ানির সেই রাজকীয় ঠাঁট প্রত্যেকদিন বজায় রাখা চলে? কী আর করার। এমন সময় তাঁর বাবুর্চিরা একটা উপায় বের করলেন। গোটা আলু মাঝখান থেকে কেটে, তার টুকরোগুলোকে হালকা ভেজে পরিবেশন করলেন বিরিয়ানির সাথে। এতে বিরিয়ানির স্বাদও বজায় থাকল, খরচেও কুলিয়ে গেল। এভাবেই মাংসের সঙ্গে বঙ্গ বিরিয়ানির শরীরী অলংকারে পরিণত হল আলু।

এমন কত গল্প যে বিরিয়ানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার ঠিক নেই। তার যাত্রাপথ কেমন, সে বিতর্ক চলুক নিজের রাস্তায়। তবে আজকের দিনে সে যে আসলে নানান খাদ্যসংস্কৃতির মেলবন্ধনেরই এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে, সে কথা অস্বীকার করা যায় না। আতশবাজির মতোই তার জাফরানি রঙ ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধ। আর রঙকে তো কোনও সীমান্তে বেঁধে রাখা চলে না। দেশ কাল নির্বিশেষে সে এক অনন্ত মুসাফির।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।