এই মন্দিরে বাস ভাত-গুড়খেকো নিরামিষাশী কুমিরের! অলৌকিকের নেপথ্যে লুকিয়ে যে সত্য

Vegetarian crocodile: নিরামিষাশী কুমির বাবিয়া একটি পুরুষ কুমির। মন্দিরের পুকুরেই তার বাস ছিল। আর প্রিয় খাবার মন্দিরের চাল ও গুড়ের নৈবেদ্য।

inscript
৩ মিনিট
এই মন্দিরে বাস ভাত-গুড়খেকো নিরামিষাশী কুমিরের! অলৌকিকের নেপথ্যে লুকিয়ে যে সত্য

রেখা এবং শত্রুঘ্ন সিনহা অভিনীত খুন ভরি মাং সিনেমার কথা মনে আছে? অত্যাচারী স্বামীকে রেখা একটি হ্রদে ঠেলে ফেলে দিয়েছিলেন যাতে স্বামীর দেহ ছিঁড়েখুঁড়ে খায় কুমিরের দল। রেখা যদি শত্রুঘ্নকে অনন্তপদ্মনাভস্বামী মন্দিরের পুকুরে ফেলতেন তাহলে কী হতো তা অবশ্য বলা মুশকিল। কারণ এই মন্দিরের হ্রদের কুমিরটি নিরামিশাষী! কুমিরের আক্রমণ যে কী ভয়ানক হতে পারে তা সামান্য খোঁজখবর রাখা মানুষই জানেন। তবে প্রকৃতি বড়ই অদ্ভুত! বাবিয়া নামের এই কুমিরটি মাংস ছুঁয়েও দেখে না। ভক্তদের বিশ্বাস খোদ ঈশ্বরের বার্তাবাহক এই কুমির, তাই শুধুমাত্র মন্দির এবং এর দর্শনার্থীদের দেওয়া নিরামিষ খাবারই খায় এই কুমির। খায় বললে ভুল হয়, খেত। সম্প্রতি ৭৫ বছর বয়সে মারা গিয়েছে ভারতের এই নিরামিষাশী কুমির।

কাসারগোডের শ্রী অনন্তপদ্মনাভ স্বামী মন্দিরের নিরামিষাশী কুমির বাবিয়া একটি পুরুষ কুমির। মন্দিরের পুকুরেই তার বাস ছিল। আর প্রিয় খাবার মন্দিরের চাল ও গুড়ের নৈবেদ্য। ভক্তরা মন্দিরে পুজোর পর দিনে দু'বার প্রসাদ দিতেন, আর তাই পেট ভরে খেত বাবিয়া। কীভাবে কুমিরের মতো হিংস্র মাংসাশী প্রাণী হয়ে উঠল এমন সাত্ত্বিক? এই মন্দিরের আশেপাশে কোনও নদী বা অন্য কোনও জলাশয় নেই। কীভাবে এই বিশাল সরীসৃপটি মন্দিরের পুকুরে এসে পৌঁছল তা নিয়েও নির্দিষ্ট কোনও তথ্য জানা নেই কারও!

দ্য হিন্দুর একটি প্রতিবেদন বলছে, লোকের বিশ্বাস যে ১৯৪৫ সালে এক ব্রিটিশ সৈন্য এই মন্দিরে একটি কুমিরকে গুলি করে। দিন কয়েকের মধ্যেই দেখা যায় মন্দিরের সেই পুকুরে ফের আবির্ভূত হয়েছে কুমিরটি। মানুষের বিশ্বাস জন্মে যায়, এই মন্দিরটিই রাজ্যের রাজধানী তিরুবনন্তপুরমের বিখ্যাত শ্রী পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের দেবতা পদ্মনাভ অর্থাৎ বিষ্ণুর আদি আসন বা মূলস্থানম। প্রায় সাত দশকের এই আবাসে কখনই হিংস্র হয়ে ওঠেনি এই কুমির, কোনও দিন কোনও ভক্তকে আক্রমণ করেছে বলেও জানা যায়নি। শুধু মানুষ নয়, মন্দিরের আশেপাশের একটি পাখিও বাবিয়ার হামলার মুখে পড়েনি। কোনওদিন অন্য কোনও প্রাণীকে হত্যা করেনি এই কুমির, এমনকী যে জলাশয়ে সে থাকত সেখানকার মাছরাও ছিল সবচেয়ে নিরাপদে! মন্দিরের সমস্ত জায়গায় প্রবেশাধিকার ছিল বাবিয়ার। হামেশাই মন্দিরের চারপাশের পুকুরে বা মন্দিরের সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখা যেত এই কুমিরকে। প্রবল গরমের মাসগুলিতে বাবিয়া মন্দির চত্ত্বরের ৬০ মিটার দূরে, গবাদি পশুর জন্য তৈরি এক কাদামাটির ডোবায় নিজেকে ডুবিয়ে বসে রইত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৯ ডিগ্রি কোণে হেলানো মন্দির! রহস্যময় এই শিবমন্দির কেন চলে যায় জলের তলে?

Ratneshwar Mahadev Mandir: পিসার হেলানো টাওয়ারটি ৪ ডিগ্রি কাত হয়ে রয়েছে, আর রত্নেশ্বর মহাদেব মন্দিরের হেলে রয়েছে ৯ ডিগ্রি!

মন্দিরের পুরোহিতদের কথা অনুযায়ী, প্রায় ৩,০০০ বছর আগে দিবাকর মুনি ভিলওয়ামঙ্গলম স্বামী নামে এক ঋষি এখানে তপস্যা এবং পুজো করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, একদিন বিষ্ণু স্বয়ং তাঁর সামনে হাজির হন। ভিলওয়ামঙ্গলমের ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে তাঁর একটি মূর্তি তৈরি করার অনুমতি দেন বিষ্ণু।

একদিন, ভিলওয়ামঙ্গলম যখন বিষ্ণুর নিয়মিত পুজো করছিলেন, তখন বিষ্ণু নাকি এক শিশুর রূপ ধারণ করে তাঁর সামনে উপস্থিত হন। ওই শিশু অচিরেই ভিলওয়ামঙ্গলমের ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে এবং তাঁকে তাঁর দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়, ভিলওয়ামঙ্গলম নিজেকে নিয়ে খুব গর্বিত হয়ে পড়েন। তাঁকে শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিষ্ণু।

একদিন, এই শিশুটি ভিলওয়ামঙ্গলমের আচার-অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা করে রাখা পবিত্র জল দিয়ে স্নান করতে যায়। প্রচণ্ড রেগে ভিলওয়ামঙ্গলম শিশুটিকে ধমক দিয়ে ধাক্কা মেরে ঠেলে ফেলে দেন। অপমানিত শিশুটি সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায়। যেতে যেতে সে বলে যায়,যদি ভিলওয়ামঙ্গলম তাকে দেখতে চান তবে তাঁকে সর্প দেবতা অনন্তের বন অনন্তকাটে যেতে হবে। এই শিশুর নিখোঁজ হওয়ার জায়গায় ভিলওয়ামঙ্গলম একটি গুহা খুঁজে পান। শিশুটিকে সেখানে পাওয়া যায় কিনা তা দেখার জন্য তিনি ভিতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতের এই মন্দিরে পূজিত হয় মোটরবাইক! 'বুলেট বাবা'-র নেপথ্যে রয়েছে গা ছমছমে যে ঘটনা

Bullet Baba Temple: মন্দিরটিতে ওম বান্নার একটি আবক্ষ মূর্তিও রয়েছে। তার পিছনেই রয়েছে সেই বুলেট মোটরসাইকেল।

সেই গুহাতেই ছিল বাবিয়ার বসবাস। মন্দিরের পুরোহিতদের মতে, বাবিয়া বেশিরভাগ সময়ই কাটাত গুহার ভিতরে এবং বিকেলে বেরিয়ে আসত। মানুষের বিশ্বাস, বাবিয়া সেই গুহাটি পাহারা দেয় যেখানে স্বয়ং বিষ্ণু অদৃশ্য হয়েছিলেন।

কুমিরের এমন অবিশ্বাস্য আচরণ নিয়ে কী বলছেন কুমির বিশেষজ্ঞরা?

কুমির বিশেষজ্ঞদের মতে, কুমির খুবই বুদ্ধিমান প্রাণী এবং তারা কঠিনতম পরিস্থিতিতেও বেঁচে থাকা লড়াকু প্রাণী। বাবিয়া ছিল মুগার কুমির এবং এদের প্রাকৃতিক বন্য খাদ্য প্রাথমিকভাবে মাছ। তবে হরিণ, বন্য শুকর ইত্যাদির মতো ছোট এবং বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীও তারা খায়৷

তবে কুমিরকে খাবার বাছতে দিলে সে সবসময়ই তার প্রাকৃতিক খাদ্যই চাইবে। মানুষের বিশ্বাস না হলেও, কুমির ওই মন্দিরের পুকুরের মাছ খেত এবং দীর্ঘকালের অভ্যাসে সে ভাত খেতেও অভ্যস্ত। কিন্তু কোনও মানুষকে আক্রমণ না করার সহবত শিক্ষা সে পেল কোথায়? বিশেষজ্ঞদের মতে, কুমিরের শেখার ক্ষমতা রয়েছে। একটি কুকুরকে শেখানর চেয়েও নাকি একটি কুমিরকে প্রশিক্ষিত করা অনেক সহজ। কুমির তখনই আক্রমণ করে যখন সে ভয় পায়। আসলে এই মুগার কুমির খুব লাজুক প্রাণী। তার প্রকৃতি আর মানুষের আস্থা মিলেমিশে তাই এক দৈব ঘটনার জন্ম দিয়েছে। মন্দিরের প্রাচীন বাসিন্দা এই কুমিরকে সম্মান জানাতে মন্দিরের মাটিতেই কবর দেওয়া হয়েছে সকলের ভালোবাসার বাবিয়াকে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।