জগন্নাথের রান্নাঘরে বয়ে যাচ্ছে দুই নদী, এখনও কেন অলৌকিক দেবতার হেঁশেল?

জগন্নাথ হলেন হিন্দু দেবতা বিষ্ণু বা তাঁর অবতার কৃষ্ণের একটি বিশেষ রূপ। তাঁকে তাঁর দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রার সঙ্গে পুজো করা হয়। পুরীতে রথযাত্রা উৎসবে রথে আরূঢ় জগন্নাথ বিগ্রহ। জগন্নাথের মূর্তি সাধারণত কাঠে তৈরি করা হয়। জগন্নাথের মধ্যে বিষ্ণুর সকল অবতারের চিহ্ন আছে। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে তাঁকে বিষ্ণুর এক একটি অবতারের মূর্তিতে পুজো করা হয়। ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার কৃষ্ণের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয় তাঁকে। আর সেই কারণে তাঁকেও অর্পণ করা হয় ছাপ্পান্ন ভোগ।

কথিত আছে, ভগবান বিষ্ণু মর্ত‍্যলোকে এসে তাঁর চারধামে যাত্রা করেন। এই চারধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম, দ্বারিকা ধাম, পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন, তারপর গুজরাতের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, উড়িষ্যার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সব শেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন। আর পুরী ধামে যেখানে তিনি ভোজন করেন সেখানে ভোগের কোনও চমক থাকবে না, তা কখনও হয়? সেখানেই তাঁকে ছাপ্পান্ন ভোগ দেওয়া হয়।

পুরাণে ৫৬ ভোগ

পুরীর মন্দিরে বাইরে থেকে আনা কোনও খাবার জগন্নাথকে দেওয়া যায় না। নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা জিনিস রান্নাঘরে রান্না করে মহাপ্রভুকে দেওয়া হয়। জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি-জাতীয় রান্না করা খাবার যাকে ‘শংখুড়ি’ বলা হয়। আর খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার, যাকে বলা হয় শুখুলি। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরে মহাপ্রলয় থেকে প্রাণীকুলকে রক্ষা করেছিলেন। এইভাবে সাতদিন কনিষ্ঠ আঙুলে পাহাড় তুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। শ্রীকৃষ্ণ প্রতিদিন আটবার খেতেন। তবে এই সাতদিন তিনি কিছুই খাননি। সাতদিন পর প্রলয় বন্ধ হলে তিনি পাহাড় নামিয়ে রাখেন। তখন গোপবাসীগণ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে সাত দিনের আটরকমের মোট ছাপ্পান্ন রকমের রান্না করে ভোগ নিবেদন করেন। সেই থেকেই ছাপ্পান্ন ভোগ চলে আসছে।

আরও পড়ুন: রাশিয়ান চার্চের সঙ্গে মিল, তান্ত্রিক মতে তৈরি হংসেশ্বরীর তুলনা ভূ-ভারতে নেই

কী এই ৫৬ পদ?

প্রতিদিন রান্না হয় ১০০-র বেশি পদ । তবে রথের দিন জগন্নাথের ভোগে থাকে বিশেষ এই ৫৬টি পদ। দেখুন সেগুলো কী কী:

১) উকখুড়া অর্থাৎ মুড়ি, ২) নাড়িয়া কোড়া অর্থাৎ নারকেল নাড়ু, ৩) খুয়া অর্থাৎ খোয়া ক্ষীর, ৪) দই, ৫) পাচিলা কাঁদালি অর্থাৎ টুকরো টুকরো কলা, ৬) কণিকা অর্থাৎ সুগন্ধি ভাত, ৭) টাটা খিচুড়ি অর্থাৎ শুকনো খিচুড়ি, ৮) মেন্ধা মুন্ডিয়া অর্থাৎ বিশেষ ধরনের কেক, ৯) বড়া কান্তি অর্থাৎ বড় কেক, ১০) মাথা পুলি অর্থাৎ পুলি পিঠে, ১১) হামসা কেলি অর্থাৎ মিষ্টি কেক, ১২) ঝিলি অর্থাৎ এক ধরনের প্যান কেক, ১৩) এন্ডুরি অর্থাৎ নারকেল দিয়ে তৈরি কেক, ১৪) আদাপচেদি অর্থাৎ আদা দিয়ে তৈরি চাটনি, ১৫) শাক ভাজা, ১৬) মরিচ লাড্ডু অর্থাৎ লঙ্কার লাড্ডু, ১৭) করলা ভাজা, ১৮) ছোট্ট পিঠে, ১৯) বারা অর্থাৎ দুধ তৈরি মিষ্টি, ২০) আরিশা অর্থাৎ ভাত দিয়ে তৈরি মিষ্টি, ২১) বুন্দিয়া অর্থাৎ বোঁদে, ২২) পাখাল অর্থাৎ পান্তা ভাত, ২৩) খিড়ি অর্থাৎ দুধভাত, ২৪) কাদামবা অর্থাৎ বিশেষ মিষ্টি, ২৫) পাত মনোহার মিষ্টি, ২৬) তাকুয়া মিষ্টি, ২৭) ভাগ পিঠে, ২৮) গোটাই অর্থাৎ নিমকি, ২৯) দলমা অর্থাৎ ভাত ও সবজি, ৩০) কাকারা মিষ্টি ৩১) লুনি খুরুমা অর্থাৎ নোনতা বিস্কুট, ৩২) আমালু অর্থাৎ মিষ্টি লুচি, ৩৩) বিড়ি পিঠে, ৩৪) চাড়াই নাডা মিষ্টি, ৩৫) খাস্তা পুরি, ৩৬) কাদালি বারা, ৩৭) মাধু রুচী অর্থাৎ মিষ্টি চাটনি, ৩৮) সানা আরিশা অর্থাৎ রাইস কেক, ৩৯) পদ্ম পিঠে, ৪০) পিঠে, ৪১) কানজি অর্থাৎ চাল দিয়ে বিশেষ মিষ্টি, ৪২) দাহি পাখাল অর্থাৎ দই ভাত, ৪৩) বড় আরিশা, ৪৪) ত্রিপুরি, ৪৫) সাকারা অর্থাৎ সুগার ক্যান্ডি, ৪৬) সুজি ক্ষীর, ৪৭) মুগা সিজা, ৪৮) মনোহরা মিষ্টি, ৪৯) মাগাজা লাড্ডু, ৫০) পানা, ৫১) অন্ন, ৫২) ঘি ভাত, ৫৩) ডাল, ৫৪) বিসার অর্থাৎ সবজি, ৫৫) মাহুর অর্থাৎ লাবরা, ৫৬) সাগা নাড়িয়া অর্থাৎ নারকেলের দুধ দিয়ে মাখা ভাত


অলৌকিক রান্নাঘর

এই রান্নাঘরে রান্নার জন্য কোনও বিদ্যুৎ বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। উন্মুক্ত কাঠের আগুনের ওপর অনেকগুলো তেলের ল্যাম্প বা বাতি ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন ১০ হাজার মানুষের রান্না হয় এখানে । কিন্তু এই মহাপ্রসাদের এমনই গুণ যে, কোনওদিন সেখানে প্রসাদ বাড়তিও হয় না, আবার নষ্টও হয় না। সে ১০ হাজার লোকই খান, আর ২ লক্ষ। গোটা রান্নাঘরে রয়েছে ৭৫২টি মাটির তৈরি উনুন। অদ্ভুত এখানকার রান্নার কৌশল। উনুনগুলিতে একটির ওপর একটি পাত্র বসানো হয়। মোট ৭টি পাত্র থাকে। নিচে থাকে আগুন। কিন্তু অলৌকিক বিষয়, সবার আগে সবথেকে ওপরের পাত্রটির রান্না শেষ হয়। প্রায় ১ হাজার সেবক রান্নাঘরের কাজে নিযুক্ত। এখানে রান্নার সমস্ত সামগ্রী শুধুমাত্র পোড়ামাটির তৈরি। কোনওদিন পুরনো পাত্রে রান্না হয় না। রোজ নতুন নতুন পাত্রে রান্না হয় এখানে।আরও একটি অলৌকিক বিষয় রয়েছে এই রান্নাঘরে। শোনা যায়, গঙ্গা আর সরস্বতী একই সঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে এই রান্নাঘরের ভেতর দিয়ে। তবে তা বাইরে থেকে দেখা যায় না। সেই নদির জল দিয়েই রান্না হয় এখানে। শুধুমাত্র ওই নদী থেকে জল তুলে আনার জন্যই একদল সেবক নিযুক্ত রয়েছেন।

জগন্নাথ দেবের মূর্তি কেন অসমাপ্ত

শোনা যায়, সত্যযুগে এক রাজা ছিলেন, যাঁর নাম ইন্দ্রদ্যুম্ন। পুরীর মন্দির তৈরির সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর ইচ্ছা ছিল যে, তিনি বিষ্ণুধামে (বর্তমান পুরী) একটি বিষ্ণু মন্দির গড়বেন। সেজন্য তিনি প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন।

ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছ থেকে ইন্দ্রদ্যুম্ন জানতে পারেন যে, ওই এলাকার বাঁকে মুখ নামের এক জায়গা থেকে তিনি মূর্তি তৈরির কাঠ পেয়ে যাবেন। একমাত্র সেই নিমকাঠেই তৈরি হবে এই বিষ্ণু মন্দিরে বিষ্ণুর মূর্তি। এছাড়াও মূর্তি নির্মাণের জন্য বিশ্বকর্মাকে স্থির করা হল।

বিশ্বকর্মা শর্ত দিলেন, তিনি মূর্তি নিখুঁত গড়ে দেবেন, তবে নিজেকে এক ঘরে বন্ধ রেখে কাজ করবেন। মূর্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই ঘর কেউ খুলতে পারবেন না। শর্তে রাজি হলেন রাজা।

কথিত আছে, বিশ্বকর্মার শর্ত রাজা না মানায় রুষ্ট হয়ে মূর্তি মাঝপথে রেখে চলে যান বিশ্বকর্মা। তবে বিষ্ণুর জগন্নাথদেব অবতারকে পরবর্তীকালে ব্রহ্মা পুজো করার পরামর্শ দেন রাজাকে। জানান, বিষ্ণু স্বয়ং খুশি এই মূর্তির আদলে। তারপর থেকে জগন্নাথদেবের সেই রূপকেই পুজো করা হয় পুরীতে।

More Articles

;