ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে কীভাবে বাঁচাবেন বাড়ি? জেনে নিন সেই প্রযুক্তি

২০২০ সালের শুরুর দিক। কোভিডের আতঙ্ক, লকডাউনের বজ্রআঁটুনি, এদিকে চুড়ান্ত আর্থিক অনটন; তারই মাঝে মে মাসে ধেয়ে এল আমফান, ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার বেগে। তার বিধ্বংসী রূপ এখনও ভোলা দায়। তারপর ২০২১ সালে এল সাইক্লোন ইয়াস, ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার বেগে। তার আগে, ২০১৯ সালে সাইক্লোন ফণী ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার বেগে আছড়ে পড়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর।

 

বলার অপেক্ষা রাখে না, সাইক্লোনের জন্য প্রতি বছর উপকূলবর্তী অঞ্চলে কাতারে কাতারে মানুষের ঘরবাড়ি ধুলিসাৎ হয়। স্বাভাবিকভাবেই সাইক্লোনের কোপে সবথেকে বেশি ধ্বংস হয় মাটির বাড়ি। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ সাইক্লোনের হাত থেকে নিজের ঘর বাঁচাতে শক্তপোক্ত পাকা বাড়ি গড়ে তুলবেন, এমন ধারণা করাও অলীক। তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা মাথায় রাখলে, মাটির ঘরই মানুষদের ভরসা। তাই যদি হয়, তাহলে সাইক্লোনের রোষানলে মাটির বাড়ি টিকবে কেমন করে?

 

টিকে থাকার কথাই যখন উঠল, আমরা ফিরে যাব ১,৫০০ বছরে আগে। যখন উঁচু দূর্গ থেকে শুরু করে সু-উচ্চ অট্টালিকা তৈরি করা হত কেবল মাটি, বাঁশ বা কাঠ, আর কিছু ক্ষেত্রে ইট দিয়ে। আর সেই দূর্গ আর অট্টালিকাগুলো এত বছর বাদেও ঝড়ঝঞ্ঝা কিংবা ভূমিকম্পকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সদর্পে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হ্যাঁ, বয়সের ছাপ তো কালের নিয়মে লেগেছে বটেই, তা বলে কি আর একেবারে ভেঙে পড়া মানায়!

 

আরও পড়ুন: ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের নাম কেন ‘অশনি’? নামের মধ্যেই কি লুকিয়ে বিপদের পূর্বাভাস?

 

স্থাপত্যবিদ্যার ভাষায় ওয়াটেল এন্ড ডব প্রযুক্তি-ই (Wattle and Daub Technology) টিকিয়ে রেখেছে এদের। নিউ মেক্সিকোর হাজার বছর আগে বানানো টাওস পুয়েবলো (Taos Pueblo) আজও অক্ষুণ্ণ বলা যায়, বানানো হয়েছিল এই অঞ্চলে হ্যারিকেনের প্রবণতা মাথায় রেখে। কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের আর্গ-এ বাম, উজ়বেকিস্তানের খিভা প্রাচীর, মিশরের সিওয়া-ওয়েসিস, এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে এরকম একাধিক নিদর্শন। কিংবা এত দূর না গিয়েও, যদি তামিলনাড়ুর বিভিন্ন গ্রামে চোখ রাখা যায়, দেখা যাবে, একই প্রাচীন প্রযুক্তির সাহায্যে বাড়ি বানানো হয়।

কিন্তু কী এই ওয়াটেল অ্যান্ড ডব প্রযুক্তি?

গ্রামবাংলার মাটির বাড়ি নির্মাণের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও, মূলত এর ভিত মাটি থেকে কয়েক ফুট নিচে থাকে। ফলে সাইক্লোন থেকে বাঁচতে খানিকটা অবলম্বন এখান থেকেই পেয়ে যায় বাড়িগুলো।

 

ওয়াটেল বলতে বোঝায় মূলত কাঠ দিয়ে তৈরি বাড়ির কাঠামো। কাঠগুলোকে খুব আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে (Woven) বানানো হয়। কাঠগুলোকে লম্বালম্বি ও আড়াআড়িভাবে একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে একটা পোক্ত বুনন তৈরি করা হয়। প্রচণ্ড ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে বাঁচতে এইটাই সহায়ক।

অন্যদিকে ডব হল ওয়াটেলের ওপর বসানো প্রলেপ যেটি তৈরি করা হয় বালি, মাটি, খড়, এবং তন্তুজ পদার্থ দিয়ে। ভারতে গোবর এবং গোমূত্র দিয়ে ডব বানানোর নিদর্শনও আছে। ডব কাজ করে ব্লটিং পেপারের মতো। বৃষ্টির জলকেও ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিয়ে, মাটির বাড়িটির ধসে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমায়।

এই প্রযুক্তিতে তৈরি বাড়ির দেওয়ালের পুরুত্ব (Thickness) মাত্র চার থেকে ছয় ইঞ্চি এবং সাইক্লোন বা ভূমিকম্পের হাত থেকে বাঁচতে দেওয়ালের এই পুরুত্বই যথেষ্ঠ। আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে একটার সঙ্গে আরেকটা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা কাঠ বা বাঁশই সেই অবলম্বন দেয় অনেকটা।

 

তবে এই প্রযুক্তিতে বানানো বাড়ি দীর্ঘদিন স্থায়ী রাখার জন্য মাঝে-মাঝেই মেরামতের দরকার পড়ে। এবং তাতে সাইক্লোন বা ভূমিকম্পের প্রভাবে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কমে আরও একটু। তবে নেপালে প্রবল বন্যায় এই পদ্ধতিতে বানানো বাড়িও আংশিক ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে এর আগে।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) প্রভাবে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা বাড়বে, সঙ্গে বাড়বে সাইক্লোন। খুব সম্প্রতি আবারও আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, এই বছর বাড়তে পারে সাইক্লোনের সংখ্যা, এখানেই শেষ নয়, আরও বিধ্বংসী হবে তাদের রূপ। এখনই তো 'অশনি'-র দামামা বাজছে।

 

পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাইক্লোনের প্রভাবে। সেখানে দাঁড়িয়ে ওয়াটেল ও ডব প্রযুক্তিতে বানানো বাড়ি ক্ষতির পরিমাণ কমাতে অনেকটা সক্ষম হবে বলেই মনে করা হয়।

More Articles

;