ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে কীভাবে বাঁচাবেন বাড়ি? জেনে নিন সেই প্রযুক্তি

জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) প্রভাবে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা বাড়বে, সঙ্গে বাড়বে সাইক্লোন। কীভাবে বাঁচাবেন বাড়ি?

Madhurima Pattanayak
৩ মিনিট
ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে কীভাবে বাঁচাবেন বাড়ি? জেনে নিন সেই প্রযুক্তি

২০২০ সালের শুরুর দিক। কোভিডের আতঙ্ক, লকডাউনের বজ্রআঁটুনি, এদিকে চুড়ান্ত আর্থিক অনটন; তারই মাঝে মে মাসে ধেয়ে এল আমফান, ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার বেগে। তার বিধ্বংসী রূপ এখনও ভোলা দায়। তারপর ২০২১ সালে এল সাইক্লোন ইয়াস, ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার বেগে। তার আগে, ২০১৯ সালে সাইক্লোন ফণী ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার বেগে আছড়ে পড়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সাইক্লোনের জন্য প্রতি বছর উপকূলবর্তী অঞ্চলে কাতারে কাতারে মানুষের ঘরবাড়ি ধুলিসাৎ হয়। স্বাভাবিকভাবেই সাইক্লোনের কোপে সবথেকে বেশি ধ্বংস হয় মাটির বাড়ি। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ সাইক্লোনের হাত থেকে নিজের ঘর বাঁচাতে শক্তপোক্ত পাকা বাড়ি গড়ে তুলবেন, এমন ধারণা করাও অলীক। তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা মাথায় রাখলে, মাটির ঘরই মানুষদের ভরসা। তাই যদি হয়, তাহলে সাইক্লোনের রোষানলে মাটির বাড়ি টিকবে কেমন করে?

টিকে থাকার কথাই যখন উঠল, আমরা ফিরে যাব ১,৫০০ বছরে আগে। যখন উঁচু দূর্গ থেকে শুরু করে সু-উচ্চ অট্টালিকা তৈরি করা হত কেবল মাটি, বাঁশ বা কাঠ, আর কিছু ক্ষেত্রে ইট দিয়ে। আর সেই দূর্গ আর অট্টালিকাগুলো এত বছর বাদেও ঝড়ঝঞ্ঝা কিংবা ভূমিকম্পকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সদর্পে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হ্যাঁ, বয়সের ছাপ তো কালের নিয়মে লেগেছে বটেই, তা বলে কি আর একেবারে ভেঙে পড়া মানায়!

স্থাপত্যবিদ্যার ভাষায় ওয়াটেল এন্ড ডব প্রযুক্তি-ই (Wattle and Daub Technology) টিকিয়ে রেখেছে এদের। নিউ মেক্সিকোর হাজার বছর আগে বানানো টাওস পুয়েবলো (Taos Pueblo) আজও অক্ষুণ্ণ বলা যায়, বানানো হয়েছিল এই অঞ্চলে হ্যারিকেনের প্রবণতা মাথায় রেখে। কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের আর্গ-এ বাম, উজ়বেকিস্তানের খিভা প্রাচীর, মিশরের সিওয়া-ওয়েসিস, এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে এরকম একাধিক নিদর্শন। কিংবা এত দূর না গিয়েও, যদি তামিলনাড়ুর বিভিন্ন গ্রামে চোখ রাখা যায়, দেখা যাবে, একই প্রাচীন প্রযুক্তির সাহায্যে বাড়ি বানানো হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের নাম কেন 'অশনি'? নামের মধ্যেই কি লুকিয়ে বিপদের পূর্বাভাস?

এবার মার্চে ঘূর্ণিঝড় অশনি ধেয়ে আসার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। তবে মার্চ মাসের চেয়ে এপ্রিলে ঘূর্ণিঝড় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

কিন্তু কী এই ওয়াটেল অ্যান্ড ডব প্রযুক্তি?

গ্রামবাংলার মাটির বাড়ি নির্মাণের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও, মূলত এর ভিত মাটি থেকে কয়েক ফুট নিচে থাকে। ফলে সাইক্লোন থেকে বাঁচতে খানিকটা অবলম্বন এখান থেকেই পেয়ে যায় বাড়িগুলো।

ওয়াটেল বলতে বোঝায় মূলত কাঠ দিয়ে তৈরি বাড়ির কাঠামো। কাঠগুলোকে খুব আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে (Woven) বানানো হয়। কাঠগুলোকে লম্বালম্বি ও আড়াআড়িভাবে একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে একটা পোক্ত বুনন তৈরি করা হয়। প্রচণ্ড ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে বাঁচতে এইটাই সহায়ক।

অন্যদিকে ডব হল ওয়াটেলের ওপর বসানো প্রলেপ যেটি তৈরি করা হয় বালি, মাটি, খড়, এবং তন্তুজ পদার্থ দিয়ে। ভারতে গোবর এবং গোমূত্র দিয়ে ডব বানানোর নিদর্শনও আছে। ডব কাজ করে ব্লটিং পেপারের মতো। বৃষ্টির জলকেও ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিয়ে, মাটির বাড়িটির ধসে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমায়।

এই প্রযুক্তিতে তৈরি বাড়ির দেওয়ালের পুরুত্ব (Thickness) মাত্র চার থেকে ছয় ইঞ্চি এবং সাইক্লোন বা ভূমিকম্পের হাত থেকে বাঁচতে দেওয়ালের এই পুরুত্বই যথেষ্ঠ। আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে একটার সঙ্গে আরেকটা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা কাঠ বা বাঁশই সেই অবলম্বন দেয় অনেকটা।

তবে এই প্রযুক্তিতে বানানো বাড়ি দীর্ঘদিন স্থায়ী রাখার জন্য মাঝে-মাঝেই মেরামতের দরকার পড়ে। এবং তাতে সাইক্লোন বা ভূমিকম্পের প্রভাবে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কমে আরও একটু। তবে নেপালে প্রবল বন্যায় এই পদ্ধতিতে বানানো বাড়িও আংশিক ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে এর আগে।

জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) প্রভাবে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা বাড়বে, সঙ্গে বাড়বে সাইক্লোন। খুব সম্প্রতি আবারও আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, এই বছর বাড়তে পারে সাইক্লোনের সংখ্যা, এখানেই শেষ নয়, আরও বিধ্বংসী হবে তাদের রূপ। এখনই তো 'অশনি'-র দামামা বাজছে।

পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাইক্লোনের প্রভাবে। সেখানে দাঁড়িয়ে ওয়াটেল ও ডব প্রযুক্তিতে বানানো বাড়ি ক্ষতির পরিমাণ কমাতে অনেকটা সক্ষম হবে বলেই মনে করা হয়।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।