৭৭ বছর ধরে নতুন-পুরনো কলমের অসুখ সারাচ্ছে ধর্মতলার এই পেন হাসপাতাল

Pen Hospital: এই দোকানের জন্ম দেশ স্বাধীনেরও আগে। ১৯৪৫ সালে ইমতিয়াজের দাদুর হাত ধরে তৈরি হয়ে এই পেন হাসপাতাল।

Ahana Das
৩ মিনিট
৭৭ বছর ধরে নতুন-পুরনো কলমের অসুখ সারাচ্ছে ধর্মতলার এই পেন হাসপাতাল

কথায় আছে “কালি কলম মন, লেখে তিনজন”। এই তিন মূর্তির ত্রিবেণী একত্রে ফুটে ওঠে লেখায়। লেখক নিজের প্রবল কল্পনাশক্তি, আবেগ, দুঃখ, যন্ত্রণা, ভালবাসাকে বাস্তব-পরাবাস্তবের ছবি দিয়ে সাজান নিজের লেখাকে৷ এই ত্রিবেণী সঙ্গমে তিনজনের ভূমিকাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি তিনজনের মধ্যে কোনও একজনের তাল কেটে যায়, অথবা অকেজো হয়ে যায় তাহলেই গল্প শেষ! পুরোটাই ঝাপসা, পুরো খাটনি বিফলে৷ একজন লেখকের কাছে তাঁর পেন বা কলম নামক বস্তুটি বড় আবেগের। আবার ক্ষেত্রবিশেষে কলমই তাঁদের প্রধান অস্ত্র৷ আমরা সকলেই সাধারণত আমাদের পেন বা কলম খারাপ হয়ে গেলে, বার তার কালি শেষ হয়ে গেলে পেন ফেলে দিই৷ কিন্তু, আমরা হয়তো কখনও ভেবে দেখিনি, আসলে নষ্ট বা বিকল কথাটি বড়ই আপেক্ষিক৷ তাই নষ্ট পেন বা কলমেও পুনরায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সেই কাজের মধ্যেও একটা বাড়তি আনন্দ, উদ্দীপনা উপভোগ করতে পারে কলম প্রেমীরা৷ প্রাণের শহর কলকাতাতেই এমন একটি দোকান এবং কারিগর রয়েছেন যাঁর হাত ধরে বহু দুষ্প্রাপ্য কলম নিজেদের যৌবন ফিরে পেয়েছে।

এই ঠিকানায় যাওয়ার রাস্তাও বেশ সোজা। ধর্মতলা মেট্রো স্টেশনের চার নম্বর গেট, সেখান থেকে বেরিয়ে ঠিক বাঁদিকে একটি গলি। সেই গলির মধ্যে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে পেন হাসপাতাল৷ শুনতে খানিক অবাক লাগলেও বাস্তবে পেনের হাসপাতালই বটে! সেখানেই বসেন ইমতিয়াজ। মধ্যবয়স্ক এই মানুষটির অগোছালো দোকানঘরেই লুকিয়ে রয়েছে পেন বা কলমের জিয়ন কাঠি৷ জানা যায়, এই দোকানের জন্ম দেশ স্বাধীনেরও আগে। ১৯৪৫ সালে ইমতিয়াজের দাদুর হাত ধরে তৈরি হয়ে এই পেন হাসপাতাল। সেই থেকে আজ অবধি শহরের বুকে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পেনদের এই ডাক্তারখানা৷

আজ থেকে কয়েক দশক আগের কথা, সেই সময় বিদেশ থেকে আসত ওয়াটারম্যান, শেফার্ড, পিয়ার কারদা, উইলসনের মতো পেন, তাদের নামের বিভিন্নতার পাশাপশি প্রতিটি পেনের গঠনও বিভিন্ন৷ ফলে বলাইবাহুল্য পেনের প্রতি লেখকের আবেগ অনুভূতি ছিল ভিন্ন প্রকারের৷ তাই কলমপ্রেমীদের দুঃখ আরও লাঘব করাতে তৈরি হলো কলমের এই হাসপাতাল৷

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আজীবন ঝর্না কলমের চরম বিরোধী মহাত্মা গান্ধী, যে কথা মনে রাখেনি কেউ

Mahatma Gandhi: ১৯৪৭ সালেই ছাত্রদের ঝর্না কলমের দামের প্রসঙ্গে বলছেন, প্রায় পঞ্চাশ টাকা। এখনকার মূল্যে প্রায় পনেরো হাজার টাকা।

সাতাত্তর বছরের পুরনো এই দোকানের গায়ে ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে৷ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নামজাদা অধ্যাপক, লেখকের আনাগোনা এই দোকানে। সকলেই তাঁদের পেনের অসুখ সারাতে বারবার ছুটে আসেন এই পেন হাসপাতালে৷ বর্তমান সময়ে ডট পেনে লেখাই দস্তুর কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়েও ফাউনটেন পেন নিয়ে আবেগের স্রোত চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত৷

এই দোকানের তেমনই এক খদ্দের হলেন অমৃতা ঘোষ। তিনি জানান, ফাউনটেন পেন নিয়ে আবেগ ধরে রাখা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ নতুনদের কাছে৷ তাঁর সংগ্রহে অনেকগুলো দেশি-বিদেশি পেন রয়েছে৷ তবে এখন তিনি ডট পেনেই লেখেন৷ তবে এই পেনের সঙ্গে নিব পেনের কোনও তুলনা নেই, নিব পেনে লেখার আনন্দই আলাদা৷ তাই পেন খারাপ হলেই ছুটে আসতেন এই পেন হাসপাতালে। অমৃতার বাবা পেশায় একজন অধ্যাপক৷ তিনি আবার ফাউনটেন পেন ছাড়া লিখতে পারেন না৷ তাঁর বাড়িতে দেশি-বিদেশি কলমের তাবড় তাবড় সংগ্রহ রয়েছে৷ পারিবারিক সূত্রে তাঁর নিজের কাছেই রয়েছে এই অমূল্য সম্পদ৷ এই পেনগুলির প্রতি তাঁর ভালবাসা যে একেবারেই অন্য মাত্রার তা স্বীকার করেন তিনি৷

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বোতামে আলতো চাপ, এক মিনিটে যন্ত্রণাহীন আত্মহত্যা, সাহায্য করবে এই স্টাইলিশ যন্ত্র

Suicide Machine: এতে শুয়ে একটি মাত্র বোতামে চাপ দিলেই মেশিনটি নাইট্রোজেন গ্যাসে ভরে ওঠে। যার ফলে শায়িত ব্যক্তির শরীরে অক্সিজেন কমে যেতে থাকে দ্রুত।

নিজের সংগ্রহ থেকে গোটা তিনেক পেন সারাতে নিয়ে এসেছিলেন এই হাসপাতালে৷ দেড় হাজার টাকা মজুরি দিয়ে পেন সারিয়ে নিয়ে গেলেন লেখক৷ নষ্ট হয়ে যাওয়া পেন কার্যত প্রাণ ফিরে পায় ইমতিয়াজের হাতের জাদুতে। কারিগর ইমতিয়াজের কথায়, “আমি রিপন স্ট্রিটে থাকি৷ বাপ-ঠাকুরদার আমলের দোকান৷ ওয়াটারম্যান, পিয়ার কারদা, মঁ ব্ল, উইলসন আগে এই দেশে নিয়মিত আসত৷ এই দেশের ঝর্না কলম যথেষ্ট ভাল ছিল৷ এখন যেসব পেন আসে এখানে তার যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন ৷ আবার কিছু ক্ষেত্রে কালি ভরার পদ্ধতি বা টেকনিক বদল করে দিচ্ছি ৷ পেনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার কথা বলে সবাই৷ আমি চেষ্টা করি মাত্র।”

তবে এখনকার দিনে নিব পেন ব্যবহার করা বড়ই অসুবিধা, কালি সেভাবে সহজে পাওয়া যায় না তেমন৷ পেন হাসপাতালে চারটি পেনের কালি ভরতে এসেছিলেন রাতুল দাস। নিব পেন ছাড়া তিনি লিখতেই পারেন না। তিনি জানান, কালি পাওয়া শক্ত হতে পারে, তবে অসম্ভব নয়৷ তিনি নিজেই কালির জন্য সুলেখার কারখানাতে পর্যন্ত যেতে পিছ পা হননি৷

বিদেশি পেন মানেই অনেকের কাছে মহার্ঘ৷ বিষয়টি অস্বীকার করছেন না ইমতিয়াজও৷ “দশ বারো হাজার টাকা দামের পেন এখনও আসে৷ পেনের নিব থেকে কালি ভরার ব্যবস্থা প্রতিটি পেনের আলাদা৷ সবসময় যে সবকিছু সহজে মেলে তা নয়৷ আবার পুরোনো ধরনের পেনের ক্ষেত্রে টেকনোলজি বদলে দিই৷ পেনগুলো জীবন পায়, লেখকের মুখে হাসি ফোটে,” বলেন কলমের ডাক্তার ইমতিয়াজ। তাই এই শহরে কলমাস্ত্রকে আর আবেগকে বাঁচিয়ে তোলার একমাত্র ঠিকানা ধর্মতলার পেন হাসপাতাল৷

লিখেছেন
Ahana Das
Ahana Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।