মেটকাফ হল যেন টাইমমেশিন! পা রাখলেই বাঙালির ইতিহাসে ডুব

দেওয়ালজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বিখ্যাত বাংলা সিনেমার এবং পুরনো বিজ্ঞাপনের পোস্টার টাইমমেশিন ছাড়াই কাউকে গত পাঁচটি দশকে সফর করিয়ে আনতে পারবে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
মেটকাফ হল যেন টাইমমেশিন! পা রাখলেই বাঙালির ইতিহাসে ডুব

প্রাচীন গ্রিক মন্দিরের অনুকরণ এবং ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতির মিশ্রণে ইংরেজদের তৈরি এক বিশাল স্থাপত্যের প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে রয়েছে বাংলার রূপের ছটা। কলকাতা হাই কোর্ট এবং ব্যাঙ্কশাল কোর্ট থেকে হাঁটা পথে গঙ্গার ধারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা মেটকাফ হল এবং সেখানে প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে চলতে থাকা 'আমি কলকাতা' প্রদর্শনীকে সম্ভবত এইভাবে বর্ণনা করা যায়।

খ্রিস্টপূর্ব একশো থেকে পঞ্চাশ অব্দের মধ্যে তৈরি প্রাচীন এথেন্সের মন্দিরের স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৪০ সালে মেটকাফ হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং পরবর্তী প্রায় চার বছর ধরে মেটকাফ হল তৈরি করা হয়। ১৮৩৫-'৩৬ সাল অবধি ভারতের গভর্নর ছিলেন জেনারেল লর্ড মেটকাফ। তাঁর নাম অনুসারেই নামাঙ্কিত হয়েছিল মেটকাফ হল। যদিও মেটকাফ হলের নকশা এবং পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন কলকাতার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট সি. কে. রবিনসন।

লর্ড কার্জন থেকে দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাম মেটকাফ হলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও আমরা তার ব্যাপারে প্রায় জানি না বললেই চলে। মেটকাফ হল লাইব্রেরিরূপে আত্মপ্রকাশ করলেওষ আজ সেই লাইব্রেরির বেশি কিছু অবশিষ্ট নেই। যদিও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের অনেককিছু বদলে ফেলে আজ সে বাংলা এবং বাঙালির গল্প শোনাতে চায়।

মেটকাফ হলের একতলা মাটি থেকে প্রায় দশ ফুট উঁচু। প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠে একতলায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়বে আলপনার মতো বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির এক অনন্য উদাহরণ। দুর্গাপুজোর প্রতিমা থেকে ঢাক, হাতে টানা রিক্সা থেকে হাওড়া ব্রিজ, ছৌ নাচ থেকে ময়দানে ফুটবল, গড়গড়া হাতে বসে থাকা বাবু থেকে ঘোড়ায় টানা গাড়ি- সবকিছুই জায়গা করে নিয়েছে সেই সত্তর ফুট দীর্ঘ আলপনায়। একতলায় দুটো ঘরে কলকাতার পুরনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গার ছবি এবং মেটকাফ হলের সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত রূপের ছবি ছাড়াও রয়েছে একটা ছায়াছবির প্রদর্শনী। 'ছায়াছবি' এখানে আক্ষরিক অর্থেই বলা যায়, কারণ বিভিন্ন ধরনের ছায়া দিয়ে ছবি তৈরি করে তার মাধ্যমে বাংলার নিজস্বতাকে তুলে ধরা হয়েছে।

'আমি কলকাতা' প্রদর্শনীর ঝলক

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ঘর থেকে দু'পা গেলেই বিশ্বের বৃহত্তম ফিল্ম সিটি, হয়ে উঠতে পারে আপনার উইকএন্ড ডেস্টিনেশন

প্রায় ১১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২৭০০ একর জমিতে নির্মিত এই বিনোদনের এলাকা বিশ্বের বৃহত্তম ফিল্ম সিটি বলে গণ্য হয়।

কাঠের প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে গিয়ে দেওয়ালজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বিখ্যাত বাংলা সিনেমার এবং পুরনো বিজ্ঞাপনের পোস্টার টাইমমেশিন ছাড়াই কাউকে গত পাঁচটি দশকে সফর করিয়ে আনতে পারবে। 'আগন্তুক' থেকে 'পরশপাথর', 'আদর্শ হিন্দু হোটেল' থেকে 'ঝিন্দের বন্দী', 'অযান্ত্রিক' থেকে 'সুবর্ণরেখা' অথবা পুরনো ক্যালেন্ডার থেকে সেলাই মেশিন, গ্রামোফোনের বিজ্ঞাপন সিঁড়ির প্রত্যেক ধাপে বিগত সময়ের গল্প বলে।

দোতলায় পৌঁছে প্রথম ঘরে কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন পুরনো হাতে আঁকা ছবি দেখে এগিয়ে গেলেই ছবিতে ছবিতে ধরা দেবে বাংলার নবজাগৃতি। একতলায় পুরনো বাংলা এবং বাঙালি থেকে দোতলার শেষ প্রান্তে নতুন বাংলা এবং বাঙালির সঙ্গে পরিচয় করতে গেলে মাঝে এই নবজাগরণের ঘর পার করতেই হবে। কবিগুরু থেকে বিদ্রোহী কবি, রাজা রামমোহন রায় থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বেগম রোকেয়া থেকে স্বামী বিবেকানন্দর কিছু বিখ্যাত উক্তি পড়লে বোঝা যায় যে ঘরে বাইরে প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েও কিছু বিখ্যাত মানুষ কীভাবে বাংলা তথা সমগ্র দেশকে এগিয়ে চলার পথ দেখিয়েছিলেন।

বাংলা ছবির পোস্টারের প্রদর্শনী

দোতলায় তৃতীয় ঘরের ছবিগুলো আমাদের চুপি চুপি বলে যে, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য আমাদের দেশের পরিচয় এবং বাংলা তার ব্যতিক্রম নয়। দুর্গাপুজোর পুষ্পাঞ্জলিতে ব্যস্ত মহিলা থেকে নাখোদা মসজিদে অপেক্ষারত একটি ছেলে, চিনা নববর্ষ পালন অথবা ক্রিস্টানদের গুড ফ্রাইডে উদযাপন থেকে ইহুদিদের উৎসব, সবকিছুই এই ঘরে ছবির মাধ্যমে জায়গা পেয়েছে। বাঙালির মাছের বাজার থেকে কফিহাউজের সেই আড্ডা, রাস্তার ধারে ফুচকা খাওয়া থেকে মিষ্টির দোকানে ভিড়- সবকিছুই পটচিত্রের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছে দোতলার চতুর্থ ঘর।

বাঙালি মানেই গান গাইতে পারে অথবা গল্প লিখতে পারে, নাচতে পারে অথবা ভালো অভিনয় করতে পারে- বাঙালির সম্পর্কে এই রকমের ধারণা বহু বছর ধরেই রয়েছে এবং তার কারণ এই সকল ক্ষেত্রেই কিছু বিখ্যাত বাঙালির অবদান। গান, নাচ, থিয়েটার, সাহিত্য এই সব ক্ষেত্রেই বাঙালির কিছু অবদান ছবি আর লেখার মাধ্যমে মানুষকে বলতে চায় দোতলার শেষ ঘর। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে সুকুমার রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে প্যারীচাঁদ মিত্র, সত্যজিৎ রায়, পূর্ণদাস বাউল থেকে বিনোদিনী দাসীর নাম এই ঘর জানাতে চায়।

মেটকাফ হল

ঘর থেকে সিঁড়ির কাছে ফিরতে গেলে একটা লম্বা বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসতে হবে। এখানে রয়েছে এক অদ্ভুত সুন্দর সংগীতের ব্যবস্থা। আমাদের চারপাশের নানারকম আওয়াজকে সুন্দরভাবে জড়ো করে এই সংগীত তৈরি করা হয়েছে।

মেটকাফ হল সোমবার বাদে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে সকাল ন'টা থেকে পাঁচটা অবধি একা বসে গল্প বলার জন্য অপেক্ষা করে, বাংলা ও বাঙালির গল্প।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।