উনিশ শতকে বিশ্বের দরবার আলো করে ছিল, কালের নিয়মে কদর হারিয়েছে কৃষ্ণনগরের মূর্তি

ছোটবেলায় আমরা অনেকেই খেলনা-বাটি খেলতাম এবং পুতুলের বিয়ের আসর বসাতাম। আমার এখনও মনে আছে, কিছু নির্দিষ্ট দিনে সকালবেলার দিকে পুতুল বিক্রি করতে আসা সেইসব মানুষজনের কথা, যাদের ঝুড়িভর্তি রঙিন সব পুতুল। সেখানে কী না ছিল– বাউল, সবজিওয়ালা, মাঝি, কৃষক ইত্যাদি আরও অনেক রকমের অবয়ব। সবাই মিলে হামলে পড়তাম সেই ঝুড়ির ওপর। মনে হতো, সে এক নতুন পৃথিবী। সেইসব ছোট ছোট মেয়ে পুতুল, ছেলে পুতুল এবং বিভিন্ন ধরনের মিনিয়েচার পুতুল আমার সংগ্রহে ছিল। সেগুলো মা খুব যত্ন করে রাখত। বড় হয়ে কলেজে পড়ার সময় যে সেই মাটির পুতুল নিয়েই রিসার্চের কাজ করতে হবে, সেটা ভাবিনি। বিদ্যাসাগর কলেজে পড়াকালীন তৃতীয় বর্ষে ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর জন্য যখন টপিক নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি সেইসময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এক দাদা পরামর্শ দিল, "তুই তো কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের ইতিহাস আর শিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে পারিস।" ব্যস আর কী! চলে গেলাম কৃষ্ণনগর, দেখে এলাম তাঁদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ও সংস্কৃতির রূপ এবং শুনে এলাম মাটির পুতুলের শিল্পীদের ভবিষ্যৎ।

 

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রর (১৭১০-'৮৩) প্রিয় মাটির পুতুলের কদর আর কেউ করে না এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে। মৃৎশিল্প আজ বলতে গেলে মৃতপ্রায়। চারুকলা, সাহিত্য এবং সংগীতের গুণগ্রাহী কৃষ্ণচন্দ্রর পক্ষে মৃৎশিল্পের প্রতি মানুষের উদাসীনতা তাই মেনে নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।

 

মৃৎশিল্প বলতেই সবার প্রথমে আমাদের মনের মধ্যে আসে কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির মাটির পুতুলের কথা। আশা করা যায়, কারওরই অজানা নয় কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের বিশ্বজোড়া খ্যাতি। কিন্তু এই খ্যাতির পিছনে যাঁরা দণ্ডায়মান, তাঁদের কথা জেনে নেওয়া যাক।

 

আরও পড়ুন: শিখতেন স্বামী বিবেকানন্দও, কেমন আছে বাঙালির কুস্তির আখড়াগুলো?

 

পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার রাজপরিবারের শ্রেষ্ঠ রাজপুরুষ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নামে এই স্থান কৃষ্ণনগর (পূর্বে রেউই) নামে খ্যাত। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র চারুকলায়  বিদ্বান, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষায় শিক্ষিত, সংগীতরসিক ছিলেন। কৃষ্ণনগরের জগদ্বিখ্যাত মৃৎশিল্পের প্রচলন তাঁর উদ্যোগেই ঘটেছিল। কথিত আছে যে, তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার (আজকের বাংলাদেশ) নাটোর থেকে বহু সংখ্যক কুমোর পরিবারকে ঘূর্ণিতে স্থানান্তরিত করেন এবং রাজপ্রাসাদের জন্য হিন্দু দেবদেবীর মাটির মূর্তি তৈরি করার দায়িত্ব দেন। এই হস্তশিল্পের কারিগররা ষষ্ঠীতলা, নতুনবাজার রথতলা এবং ঘূর্ণি নামক এলাকায় বসতি স্থাপন করে। তাদের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে, রাজা তখন মাটির পুতুল তৈরিতে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁর শাসনকালে চারু ও কারুশিল্পের এত উন্নতি ঘটে যে, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকরাও তা উপেক্ষা করতে পারেনি!

 

সূক্ষ্ম সৌন্দর্য এবং সূক্ষ্মতার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মধ্যে অনেক আকর্ষণীয় তথ্য রয়েছে, শুরু থেকেই। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নয়, বিশ্বের দরবারেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই শিল্প শীঘ্রই একাধিক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকদের নেকনজরে পড়ে যায়। কৃষ্ণনগরের শিল্পীরা লন্ডন, প্যারিস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রদর্শনী, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করে। শীঘ্রই, তারা আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনীতে বেশ কয়েকটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ও পদক জিততে শুরু করে। ইতিহাসের এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায় ছিল ‘EXPOSITION UNIVERSELLE DE 1855’ যেখানে রাম পাল, কৃষ্ণনগরের মৃত্তিকা-শিল্পীদের প্রতিনিধি হিসাবে ১ জুলাই, ১৮৫৭-এ দ্বিতীয় স্থানের জন্য পদক এবং শংসাপত্র পেয়েছিলেন। ১৮৮০ সালে মেলবোর্ন আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে শিল্পী যদুনাথ পালের তৈরি মাটির মূর্তি দ্বিতীয় স্থান পায়। এই মূর্তিগুলো এখন অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া মিউজিয়ামের সংগ্রহে প্রদর্শিত। তারপর ১৯৯০ সালে, রাশিয়া সরকার কৃষ্ণনগরের শিল্পীদের কাছে একটি জাতীয় উদ্যানে প্রদর্শনের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি চেয়েছিল, তারা একটি মাটির মডেল দেওয়ার জন্য শ্রেষ্ঠ কারিগর কার্তিক চন্দ্র পালের সাহায্য চান এবং তিনি সেটি প্রদান করেন, কার্তিক পাল পরে এটিকে একটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যে রূপান্তরিত করেন।

 

ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘ডেকান হেরাল্ড’-এ রচিত একটি নিবন্ধে বলা হয় যে, “We have clay dolls, toys and even clay sculptures in different parts of India. However, there has been nothing to match the clay doll artisans of Krishnanagar in the Nadia district of West Bengal. The creations of these artists are displayed in most of the handicraft museums of the world. In India, we have a large display of these dolls in the Shankar’s Doll Museum in New Delhi. One look at the clay dolls and we are amazed at the reality with which the artist has displayed the character of the model. A horse rearing to gallop to a placid dog licking its lips after a hearty feed.” এইভাবে চলে আসছে কৃষ্ণনগরের মাটির শিল্পের ইতিহাস।

 

ফিরে আসা যাক বর্তমান সময়ে। কৃষ্ণনগরে এমন অনেক পরিবার আছে, যারা পাঁচ প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করছে এবং পরিবারের সকলেই মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের থেকে জানা যায়, মৃৎশিল্পীদের সকলেই পাল বংশধর নন। এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা অন্য জায়গা থেকে এসে ‘পাল কমিউনিটি’-র থেকে শিল্পের আঁটঘাঁট শিখে সেখানেই স্থায়ী বসবাস শুরু করেছেন। এমনই এক মানুষ হলেন কাঞ্চন বাগ, তিনি পেশায় রিকশাচালক, রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। এমনও অনেক দিন গেছে, যেদিন তাঁর পুরো পরিবারকে না খেয়ে কাটাতে হয়েছে। তাঁর বাবার পরামর্শে তিনি কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণিতে এসে পালদের থেকে কাজ শিখে এখন সংসার চালান। তাঁর কথায়, "যখন প্রথম কাজ শুরু করি তখন হস্তশিল্প সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। ফিনিশিং ভালো হত না, কিছু খুঁত থাকতই, কিন্তু তাও পুতুল বিক্রি হয়েছে এবং সেই পুতুল বানিয়েই তিনি সংসারের সকলের মুখে খাবার জোগাতে পেরেছেন।"

 

সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ে যখন তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম, পুতুল বিক্রি কেমন হয়?, তাঁদের উত্তর ছিল, সময় পাল্টেছে সেই সঙ্গে মানুষের চাহিদাও পাল্টেছে। পুতুল বানিয়ে এবং বিক্রি করে আর সংসার চলে না। সবাই এখন উৎকৃষ্ট হস্তশিল্পের চেয়ে যন্ত্রচালিত প্রতিলিপির দিকে ঝুঁকেছে। মৃৎশিল্পের কদর কমেছে। পূজা-পার্বণেই যা বড় বড় মূর্তি বিক্রি হয়। তাছাড়া মিনিয়েচার পুতুলগুলো মেলা বা জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় বিক্রি হয়। অনেকেই এমন আছেন, যাঁরা এখন বেশি রোজগারের আশায় এখান থেকে বড় শহরে চলে যাচ্ছেন, শিল্পীদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘ কাল ধরে সরকারের অসহযোগিতা এই আদি শিল্পটিকে বিপজ্জনক অবস্থায় এনে ফেলেছে।

 

তবে তাঁরা হাল ছাড়েননি, সোনালি এক দিনের স্বপ্ন তাঁরা আজও দেখেন। তাঁদের চোখে এখনও কিছু করে দেখানোর খিদে। কিছু কিছু সংস্থা এবং এনজিও সাহায্যের হাত তাঁদের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। কারিগররা ধীরে ধীরে আবার শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করছে। সরকারের সহযোগিতায় কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা কলকাতা মহানগরীর সঙ্গে তাঁদের নৈকট্যের সুযোগ নিচ্ছেন এবং একটি বড় বাজারে প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন। মাটির শিল্পের সুন্দর নমুনা পাওয়া যায় কলকাতা বিমানবন্দরের বিশ্ব বাংলা শো-রুমে। কলকাতার দক্ষিণাপণ এবং রাজারহাটের বিশ্ব বাংলা হাট, বিখ্যাত রাজ্যের হস্তশিল্প মেলা-সহ শহরে আয়োজিত বেশ কয়েকটি শিল্প ও কারুশিল্প মেলা এই কারিগরদের শিল্প প্রদর্শনের জন্য তাঁদের একটি বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম অফার করে। এবং যেহেতু এই মেলাগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্যান্য রাজ্যের দর্শনার্থীরা এবং এমনকী, বিদেশি পর্যটকদের ভিড় রয়েছে, তাই শিল্পের ফর্মটি আগের চেয়ে বেশি এক্সপোজার পাচ্ছে। বিশ্ব আরও একবার মৃতপ্রায় শিল্প ফর্মের দিকে ফিরে তাকাতে শুরু করেছে। যদিও, এখনও অনেক পথ বাকি।

 

হয়তো কোনও এক রঙিন সকালে আবার আগের মতো হাঁক পাব, “পুতুল নেবে গো, পুতুল, মাটির পুতুল”।

More Articles

;