কেমন আছেন তেভাগার শেষ জীবিত সৈনিক?

বয়সজনিত কারণে অবিভক্ত দিনাজপুরে তেভাগার শেষ জীবিত এই সৈনিক খুব বেশি কথা বলতে পারেন না। মাঝেমধ্যে চিনতে পারেন না নিজের মানুষজনকেও।

Panchanon Podder
৩ মিনিট
কেমন আছেন তেভাগার শেষ জীবিত সৈনিক?

সে হাসি একদিন গোধুলি-মিছিলে ছুটত। না, সবার অলক্ষ্যে নয়, বরং একেবারে সামনের সারিতে। লাল ঝান্ডা কাঁধে চাপিয়ে পার করতেন দিনাজপুরের কাদার মাঠ, পাটের খেত। মাইল মাইল অভিমান জড়ো হতো গলা চিরে যাওয়া স্লোগানে, ফুটিফাটা গোড়ালিতে। তিনি সরোজনন্দিনী সরকার, তেভাগার শেষ স্বর। উত্তাল ছেচল্লিশ-সাতচ্চলিশে রুখে দিয়েছেন পুলিশি সন্ত্রাস, জোতদারি পরোয়ানা। বুঝে নিয়েছেন হকের ধান। আজ পঁচানব্বই বছর বয়সে যখন কানের সামনে 'লাল সেলাম' বলা হয়, চোখদুটো তার জ্বলজ্বল করে ওঠে। দৃঢ় হয় বয়সের ভাঁজ। চিনতে অসুবিধে হয় না সেদিনের আন্দোলনের মহিয়সীকে। আজ যখন বাংলার সংসদীয় রাজনীতিতে কাস্তে-হাতুড়ি আসন সংখ্যার নিরিখে শূন্য, তখন এই সরোজনন্দিনীদেরই ভীষণ সত্যি মনে হয়, যারা শিখিয়েছিল সংসদীয় রাজনীতির বাইরেও বামপন্থীদের একটা জায়গা আছে, যার নাম রাজপথ। যেখান থেকে শ্রমিকের, কিষাণের, মজুরের কান্না শুনতে পাওয়া যায়।

বালুরঘাট শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার। জায়গাটার নাম পতিরাম। ঝাঁ-চকচকে সড়ক। হিলি সীমান্তগামী সেই রাস্তার ধারে একখানা টিনের ছাউনিওয়ালা কমিউনিস্ট পার্টির পোড়ো অফিস। কালিঝুলি-মাখা কার্ল মার্কস, লেনিনের ছবি। ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কিছু পতাকাতেও ধুলোর আস্তরণ। ঘড় ঘড় করে ফ্যান ঘুরছে। দিগন্তজোড়া সবুজের মাঝে দাঁড়িয়ে লাল পার্টির অফিস বয়ে নিয়ে চলেছে তেভাগা আন্দোলনে ফেব্রুয়ারি মাসের কালজয়ী ইতিহাস। সেই অফিসকে পিছনে ফেলে গ্রামের ভেতর কিছুটা এগোলেই একটা মাটির বাড়ি, তাতে খড়ের ছাউনি। ঘরের ভেতর আলো পৌঁছয় নিমিত্তমাত্র। বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের সারা ভারত কৃষক সভার জেলা সম্পাদক অমিত সরকার আমাদের সেখানে পৌঁছে দিলেন। ঘরে একটা রক্তপতাকা, সঙ্গে কিছুটা অগোছালো মশারি, বইটই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একানব্বই বছর বয়সে গ্রামবাংলা নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলেন তরুণ মজুমদার

যখন কলকাতার অধিকাংশ প্ৰেক্ষাগৃহের বুক চিরে তৈরি হচ্ছে একের পর এক মাল্টিপ্লেক্স, সেই অধুনা ওটিটি, ওয়েব সিরিজের জমানায় তরুন মজুমদার ঠিক করেছিলেন, ফের ছবি তৈরি করবেন। না, শহুরে মধ্যবিত্তর ফ্ল্যাটরুমের গল্প নয়, লোকেশন হবে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বেলপাহাড়ি।

বয়সজনিত কারণে অবিভক্ত দিনাজপুরে তেভাগার শেষ জীবিত এই সৈনিক খুব বেশি কথা বলতে পারেন না। মাঝেমধ্যে চিনতে পারেন না নিজের মানুষজনকেও। যে মানুষটা একদিন আত্রেয়ী নদী বরাবর মিছিলে পেরিয়েছেন মাইল মাইল পথ, তাকে আজ ঘরের বাইরে বেরোতেও নাতির সাহায্য নিতে হয়। ছেলে কুমার সরকার বর্তমানে দক্ষিণ দিনাজপুর কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) ভারপ্রাপ্ত জেলা সম্পাদক। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলছিলেন, সময়টা সম্ভবত স্বাধীনতার ঠিক আগের বছর। তৎকালীন গ্রামে জোতদার রবীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের উসকানিতে এক শীতের রাতে পুলিশ ঘিরে ফেলে সরোজ দেবীর পৈতৃক ভিটে। কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বাবা এবং ভাইকে সেদিন পুলিশের গ্রেফতারি মেনে নিতে পারেনি কিশোরী সরোজ। বাড়ি থেকে বড় রাস্তা পর্যন্ত প্রিজন ভ্যানে তাদের তোলা পর্যন্ত সরোজ স্লোগান দিলেন ইনকিলাব জিন্দাবাদ, কৃষক আন্দোলন জিন্দাবাদ। সেই প্রথমবারের জন্য কৃষকের ঘামের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। যে ঘামে ভিজেছেন তিনি, যৌবন থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত।

১৯৪৭-এর ২০ ফেব্রুয়ারি। আধা নয়, তেভাগা চাই। জান দেব, তবু ধান দেব না, কৃষকের স্লোগানে খাঁপুর গ্রামের মাটি সেদিন কেঁপে উঠেছিল। জমিদার, মধ্যস্বত্বভোগীদের চোখে চোখ রেখে সেদিন প্রাণ দিয়েছিলেন যশোদারানি সরকার, চিয়ারসাই শেখ, গুরুচরণ বর্মন, কৌশল্যা কামারনিরা। সরকারি হিসেব অনুযায়ী সেদিন তেভাগার দাবি চেয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন বাইশ জন কৃষক।

মোট উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দাবি পূরণই শুধু নয়, বাম জমানার একেবারে শুরুতে ভূমিসংস্কারের ফলে আজ জমিদার অসিতমোহন সিংহরায়দের পাততারি গুটিয়ে চলে যেতে হয়েছে খাঁপুর-পতিরাম থেকে। জমির মালিকানা পেয়েছে স্বয়ং কৃষক। কিন্তু এই অবস্থা একদিনে আসেনি। প্রথমে ব্রিটিশ সরকার ও তার পুলিশ, স্বাধীনতার পরে ফের সামন্ত প্রভুদের সঙ্গী করে পুলিশের জুলুম। কৃষক মরেনি, প্রাণ দিয়েছে।

দিনাজপুরের তেভাগা আন্দোলনের মুল ভূখণ্ড খাঁপুরকে ধরা হলেও মুলত এর পটভূমি পতিরামই। রাজ্যজুড়ে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্বে তখন অবনী লাহিড়ী, কৃষ্ণদাস রায়, বগলা গুহর মতো কমিউনিস্ট নেতারা। আন্দোলন ক্রমেই ছড়িয়েছে দিনাজপুর, রংপুর পেরিয়ে অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে। আত্রেয়ীর মোহনা ছাড়িয়ে লালে লাল হয়ে গিয়েছে চব্বিশ পরগণার কলাগাছি নদীর জল। সেসব আন্দোলনের স্মৃতি আজ অস্পষ্ট। তেভাগার শেষ স্বর যশোদারানিও কিছু বলতে পারেন না। অগোছালোভাবে মাঝেমধ্যে উত্তর দেন। মৃদু জলে চিকচিক করে ওঠা চোখে কাস্তে-হাতুড়িটা সিলুয়েটে বাঁচে।

বর্তমানে পতিরাম পঞ্চায়েতটির দখল নিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি। রাজ্য সভাপতি সুকান্ত দাশগুপ্তর সংসদীয় এলাকায় ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা তেভাগার শহিদ পরিবার কিংবা যশোদার খবর রাখেন না আজকালকার কৃষ্ণরা। শুধু আন্দোলনের ইতিহাস লিখতে গিয়ে মনে হয়, 'আমরা কোথায় আছি'!

লিখেছেন
Panchanon Podder
Panchanon Podder
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মানুষ টাকা পেয়ে গেলে ভুলে যাবে, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ সম্পর্কে বললেন বিজেপি বিধায়ক সজল

Sajal Ghosh interview: ‘ভয় ছাড়া ভক্তি আসে না’— আইন-শৃঙ্খলা, দুর্গাপূজা বিতর্ক এবং তৃণমূলের দলবদল নিয়ে নিজের মতামত জানালেন বিজেপি নেতা সজল ঘোষ।

ভারতের রাজনীতি কতটা বদলে দিয়েছেন মোদী?

25 years of Narendra Modi: ২৫ বছরে মোদী কতটা বদলে দিয়েছেন ভারতের রাজনীতি? উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রচারের ধরন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের ধারণা—কীভাবে বদলেছে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র?

ব্রাজিল থেকে আমেরিকা যে কারণে দক্ষিণপন্থীদের শাস্তি দিচ্ছে শান্তিকামী মানুষ

The Alt - right Tide Turns: বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে। হাঙ্গেরিতে ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান, সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী বিজয়, ব্রাজিলে প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও লুলার জয়, আমেরিকায় মিডটার্মে ডেমোক্র্যাটদের সংসদের দুই কক্ষ দখল, সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থী জোয়ারে ভাটার সুর। তবে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, ইতালিতে দক্ষিণপন্থা এখনও টিকে আছে। সেগুলির বিরুদ্ধেও চলছে জেনজিদের, শ্রমজীবী অভিবাসী মানুষদের বিক্ষোভ।

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।