১২৩ দিনের লাইফ সাপোর্ট, সন্তানের জন্ম দিলেন মা

প্রিয়া সামন্ত
৫ মিনিট
১২৩ দিনের লাইফ সাপোর্ট, সন্তানের জন্ম দিলেন মা

“I want you to be prepared to accept this because I will be staying there, I won’t be coming home.” তীব্র মাথার যন্ত্রণা নিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঠিক আগে গাড়িতে বসে কাঁপতে কাঁপতে এই কথাগুলি শেষবারের মতো বলতে পেরেছিলেন ফ্র্যাঙ্কেলিন ডা সিলভা যামপোলি পাডিলহা। ২১ বছর বয়সী ফ্র্যাঙ্কেলিন যখন তার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, তিনদিন ধরে নানা রকমের পরীক্ষানিরীক্ষার পর ডাক্তাররা তাকে ‘Brain dead’ বলে ঘোষণা করেন। ২০১৬-এর অক্টোবরে, ফ্র্যাঙ্কেলিন তখন ৯ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। ডাক্তাররা ভেবেছিলেন গত কয়েকদিনে ফ্রাঙ্কেলিনকে দেওয়া নানা রকমের কড়া ডোজের ওষুধের ব্যবহারে হয়তো বা অনাগত শিশুটি, পৃথিবীর আলো আর দেখতে পাবে না। কিন্তু ওই যে, “We will only understand the miracle of life fully when we allow the unexpected to happen.” সত্যদ্রষ্টা লেখক মুরাকামির এই কথাগুলিই যেন প্রতিধ্বনিত করে এর পরবর্তী ঘটনা। ডাক্তাররা ভেবেছিলেন আরও তিনটে দিন সময় অতিরিক্ত সুযোগ দেবেন শিশুটিকে। তারপর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হবে।

কিন্তু শেষবারের মতো শিশুটির পরিণতি দেখতে গিয়ে হতবাক সকলেই। একটিমাত্র নয়, একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে দুটি হার্টবিট। আর তাতে কোনো রকম অসংগতির চিহ্নমাত্র নেই। হাসপাতালের নিউরোলজিক্যাল ICU-এর প্রধান ডাক্তার ডালটন রিভাবেম-এর কথায়, - “We did an ultrasound on the embryos thinking they would be failing in the womb but to our surprise they were clinging to life.” আর তাদের এই ‘clinging to life’-এর উপর ভিত্তি করেই তৈরি হবে এক রূপকথা, যা এককথায় বিহ্বল করে রাখবে ব্রাজিল তথা সারা বিশ্বকে।

তাঁকে 'ব্রেন ডেড' ঘোষণা করার পরেও ফ্র্যাঙ্কেলিনের শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিও যেন অনাগত শিশুদের ইচ্ছাশক্তির বশেই তখনও সমানভাবেই ক্রিয়াশীল ছিল। ডাক্তাররা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন শিশুগুলি পৃথিবীর আলো না দেখা অবধি কৃত্রিমভাবে ফ্র্যাঙ্কেলিনকে প্রয়োজনীয় সমস্ত লাইফ সাপোর্টে রাখা হবে। ব্রাজিলের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন ঘটনা তখনও অবধি অদ্বিতীয়। তাই ডাক পড়ল পোর্তুগালের এক চিকিৎসকের, যিনি এর আগে এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে ব্রেন ডেড ঘোষণা করার ১০৭ দিন পর সন্তানজন্ম দেওয়ার বিরল ঘটনার ক্ষেত্রে ডাক্তার হিসাবে যুক্ত ছিলেন। এমন ঘটনা আগে ঘটলেও ফ্র্যাঙ্কেলিনের উদাহরণটি নজিরবিহীন। তাকে ব্রেন ডেড ঘোষণা করার ১২৩ দিন পর ২০১৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ফ্র্যাঙ্কেলিনের প্রেগনেন্সির সাত মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর, ক্যাম্পো লার্গো অঞ্চলের নসো সেনহোরা দো রোসিও হাসপাতালে মুরিয়েল পাডিলহার যমজ পুত্রসন্তান আসাফ ও কন্যা আনা ভিতোরিয়ার জন্ম হয়।

কিন্তু চূড়ান্ত আনন্দের এই খবরের পিছনে বাকি থেকে যায় সেনহোরা দো রোসিও হাসপাতালের ডাক্তার ও অন্যন্য চিকিৎসাকর্মীদের প্রাণঢালা পরিশ্রম, চিন্তা ও যত্নের কথা। কেমন ছিল এই চারমাসের কঠিনতম পরীক্ষার প্রহরগুলো? দিনের ২৪ ঘণ্টার প্রতিটা মুহূর্তে পরীক্ষার পর পরীক্ষা চলছিল তাঁদের। ডাক্তার রিভাবেম-এর কথায়-, “It was an extremely challenging case which required intensive multidisciplinary work… There were many complications with continuous support of medications to maintain pressure, maintain oxygenation, maintain continuous nutrition and hormonal balance.” ডাক্তারদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল, মাতৃজঠরে শিশুদের যথাযথ বৃদ্ধি ও বিকাশের অনুকূল অবস্থা বজায় রাখা। সেইসঙ্গে যাতে শিশুরা মায়ের থেকে পাওয়া আদর ও ভালোবাসার অভাববোধ না করে, সে দিকেও তাঁদের সজাগ লক্ষ ছিল।

মুরিয়েল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ও ডাক্তারদের সাহায্যকারী নার্স, পুষ্টিবিদ, মনোবিদ সহ ২০ জনের একটি দল সবসময় ঘিরে থাকত মাতৃজঠরে থাকা আসাফ ও আনাকে। মিউজিক থেরাপিস্ট এরিকা চেহান জানান, শিশুদের পছন্দের গান চালিয়ে রাখা হত আইসিইউতে, এমনকি আসাফ ও আনার জন্যই আলাদাভাবে নতুন নতুন সব সুরও তৈরি করে শোনাতেন তাঁরা। পরিবারের সদস্যদের ছবি ও নানা রকমের রঙিন খেলনাপাতি দিয়ে ফ্র্যাঙ্কলিনের শয্যাটি সাজিয়ে রাখা হত। এমনকি এরিকা এও জানান, “The ICU was filled with love, affection and encouragement for the babies and their family to succeed. We said, ‘we love you’ everyday they were here.” শুধুমাত্র তাঁরাই নন, ব্রাজিলের নানা প্রান্ত থেকে অজস্র মানুষ প্রতি মুহূর্তে তাদের জন্য প্রার্থনা করেছেন, সাধ্যমতো অর্থসাহায্যের পাশাপাশি শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় নানারকম সামগ্রী দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, আর শেষপর্যন্ত মৃত্যুর বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে জয়লাভ করে আনন্দের কান্নায় চোখ ভিজিয়েছেন।

কিন্তু সব রূপকথায় কি অন্তমিলে রাজকন্যা রাজপুত্রের জয় সুনিশ্চিত হয়? আমেরিকার এক পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ১৯৯০থেকে ১৯৯৬-এর মধ্যে ২৫২-টি ব্রেন ডেড রোগীদের মধ্যে ২.৮% অর্থাৎ ৫টি এমন ঘটনা দেখা গেছে, যেখানে রোগীরা ছিলেন ১৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যবর্তী বয়সী অন্তঃসত্ত্বা মহিলা। ১৯৮২ থেকে ২০১০-এর মধ্যে “there were 30 [reported] cases of maternal brain death (19 case reports and 1 case series).” এদের মধ্যে ১২-টি ঘটনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমে শেষপর্যন্ত সদ্যোজাত শিশুর জন্ম দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আর বাকি ঘটনা? সেসব গল্পে শুধুই চোখ ভিজে আসার কথা লেখা।

খুঁজতে খুঁজতে যেখানে গিয়ে এমন ঘটনার প্রথম নথিবদ্ধ শিকড়টি পাওয়া যায়, তা ২০০৫ সালের। চতুর্থ স্টেজের ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা ক্যান্সারে আক্রান্ত চোদ্দ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা সুজান মিচেল রোলিন টোরেস-কে ভার্জিনিয়া হসপিটাল সেন্টারে মে মাসে ব্রেন ডেড ঘোষণা করা হয়। সুজানের পরিবারের ক্যাথলিক বিশ্বাসে ভর করে মাতৃজঠরের শিশুটি অতিরিক্ত লাইফ সাপোর্টের সাহায্যে শেষমেষ আগস্টের ২ তারিখে পৃথিবীর আলো দেখেছিল। কিন্তু, নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্মের কারণে নানারকম সমস্যায় বিধ্বস্ত কন্যাসন্তান সুজান অ্যান ক্যাথেরিন টোরেসকে সেপ্টেম্বরে্র বেশি সময় অবধি বাঁচানো যায়নি। তবু চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর ভরসা রেখে ডাক্তাররা হাল ছাড়েননি। পরবর্তীতে এমন ঘটনার ক্ষেত্রে শিশুটি বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে, এমন উদাহরণও পৃথিবী দেখেছে।

ক্রীড়াক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পর্তুগালের কাতারিনা সেক্যুয়েরা ১৯ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হন। ডাক্তাররা তাঁকে ২০১৯ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ব্রেন ডেড ঘোষণা করেন। ৫৬ দিন ভেন্টিলেটরে থাকার পর ৩২ সপ্তাহ বয়সী, ১.৭ কেজি ওজনের সালভাদোরের জন্ম হয়। এটি ছিল পর্তুগালের মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের জয়ের দ্বিতীয় উদাহরণ। এর আগে প্রথম উদাহরণ হিসাবে ২০১৬ সালে লিসবনে ১৫ সপ্তাহ তার মৃত মায়ের জঠরে থাকার পর সুস্থ অবস্থায় আরেক শিশু লোরেঙ্কোর জন্ম হয়েছিল। এছাড়াও পোল্যান্ডের রোক্লতে মায়ের ব্রেন ডেড অবস্থায় ৫৫ দিন মাতৃজঠরে থাকার পর আরেকটি শিশুপুত্রের জন্মের খবর পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে ১১৭ দিন ধরে ব্রেন ডেড মায়ের গর্ভে বেড়ে উঠে ১৫ই অগস্ট পৃথিবীর মুখ দেখে চেক রিপাবলিকের আরেক কন্যা। আর এমন সব উদাহরণের মাঝে আলোর মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে আসাফ আর আনার নাম। মায়ের ব্রেন ডেড অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে থাকার পর যমজ সন্তানের জন্মের সময় দীর্ঘতম অপেক্ষা ছিল তাদেরই ক্ষেত্রে- ১২৩ দিন। যারা সারা পৃথিবীর কাছে আরেকবার প্রমাণ করে দিয়েছিল- ‘Death is not the opposite of life, but a part of it.”

তথ্যসূত্রঃ

১। https://metro.co.uk/2017/07/11/brain-dead-mother-gives-birth-to-twins-after-123-days-on-life-support-6770952/

২। https://www.bbc.com/news/world-europe-47741343

৩ https://www.wusa9.com/article/news/nation-world/mother-brain-dead-gives-birth-117-days-later/507-21def95f-3097-4fd6-94ce-8e00ab48b9d0

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।