ঠাঁই হল না বাংলায়, ইতিহাসের মরা গাঙ বেয়ে গুজরাতে পাড়ি দিল বঙ্গের হারিয়ে যাওয়া 'ছোট্‌'!

Chhot Boat of Bengal: এই নৌকোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটা ইংরেজি V-এর মতো দেখতে। চেহারার সুবিধার জন্য ‘ছোট্’ নৌকো সহজেই মোহনা ও খাঁড়ি এলাকায় জল কেটে এগিয়ে যেতে পারত।

Tithi Roy
৪ মিনিট
ঠাঁই হল না বাংলায়, ইতিহাসের মরা গাঙ বেয়ে গুজরাতে পাড়ি দিল বঙ্গের হারিয়ে যাওয়া 'ছোট্‌'!

“বারবার ফিরে এসেছি আমরা এই পৃথিবীর টানে/

কখনো গাঙুর, কখনো কোপাই, কপোতাক্ষের গানে।”

ফিরে এসেছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া নৌকো ‘ছোট্’। ফিরে এসেছে তার জন্মভূমি রূপনারায়ণের কূলে। তাকে ফিরিয়ে আনার মূল কাণ্ডারি হলেন নৃতত্ত্ববিদ স্বরূপ ভট্টাচার্য। সেই তরণীর অভিযাত্রী হয়েই ফিরে আসছে নদীমাতৃক বাংলার নৌ-ঐতিহ্য ও তার কারিগরির ইতিহাস। বাঙালির ইতিহাস বিস্মৃতির সময়ে, এইভাবে ঐতিহ্যের ফিরে আসা, তাকে ফিরিয়ে আনার লড়াই অনেক সম্ভাবনাকেই উসকে দিচ্ছে। স্বরূপ ভট্টাচার্যের কথায়, “আমাদের দেশে যে ইতিহাস রয়েছে তার অনেকটাই জীবন্ত ইতিহাস। সেই সব ইতিহাস একপ্রকার জীবাশ্ম হয়ে রয়েছে। খুঁড়ে দেখলে তা আমাদের দেশের প্রাচীন কারিগরি দক্ষতা ও কর্মকুশলতার হদিশ দিতে পারে।” নৌকোপ্রেমী স্বরূপ ভট্টাচার্যের নৌ-কারিগরি ইতিহাস খুঁড়ে দেখার শুরু সেই ১৯৯৭ সাল থেকে। তাঁর কাছ থেকেই জানা, বাংলার মেড়লি, ভেদি, বেতনাই, সুলতানি, খোড়োকিস্তি- এসব নৌকো আজ অবলুপ্ত। এদের মধ্যে বেশ কিছু হয়তো দু’দশক আগেও বাংলার খাল-বিল, নদী ও খাঁড়ি অঞ্চলে ভেসে বেড়াত। কিন্তু, গত বিশ বছরে নদীর ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন, পণ্য পরিবহনের আধুনিক মাধ্যমের সহজলভ্যতা ইত্যাদির কারণে হারাতে বসেছে দেশজ নৌকা এবং নৌকো তৈরির কৌশল। অবলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যাচ্ছে জলযান-নির্ভর জীবন ও জীবিকার ছবি। বাংলার নৌ-নির্মাণ শিল্পের গৌরবময় অতীতকে ফিরে দেখা ও দেখানোর তাগিদেই দক্ষিণ বাংলার লুপ্তপ্রায় নৌকো ‘ছোট্’-কে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন স্বরূপ ভট্টাচার্য। তিনি জানাচ্ছেন, বহির্বিশ্বের কাছে এই নৌকো এখনও অনেকটাই অজানা।

‘ছোট’ নৌকা রূপনারায়ণ, নিচ দামোদর ও গঙ্গার নিম্ন অববাহিকায় মাছ ধরার কাজে, আবার কখনও মাল বইবার কাজে ব্যবহার করা হতো। এই নৌকোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটা ইংরেজি V-এর মতো দেখতে। চেহারার সুবিধার জন্য ‘ছোট্’ নৌকো সহজেই মোহনা ও খাঁড়ি এলাকায় জল কেটে এগিয়ে যেতে পারত। একসময় গঙ্গা ও দামোদরের নিচ অববাহিকা জুড়ে মৎস্যজীবীদের মধ্যে বহুল ব্যবহার ছিল। গত শতকের ষাট-সত্তর দশক থেকে নিচ দামোদরের অববাহিকায় নদীর ওপর একের পর এক বাঁধ তৈরি হতে থাকলে নদ-নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা কমতে শুরু করে। অতিরিক্ত পলি জমে নদীর বুকে চর জেগে ওঠে। V আকৃতির তীক্ষ্ণ তলদেশ বিশিষ্ট ‘ছোট’ নৌকা চর পড়া নদীতে চলাচলের পক্ষে একেবারেই অনুপযুক্ত। ফলে, তাদের ব্যবহার কমে। যান্ত্রিক সুবিধার কারণে মোটরবোট, ট্রলার ইত্যাদিও শতাব্দী প্রাচীন নৌকোদের বিকল্প হিসেবে উঠে আসে। সব মিলিয়ে ছোটের ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়। তবে, স্বরূপ জানালেন, দিঘা, জুনপুট, খেজুরি সহ পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী অঞ্চল জুড়ে মৎস্যজীবীদের মধ্যে এখনও 'ছোট্'-র ব্যবহার বেশ কিছুটা রয়েছে। অর্থাৎ 'ছোট্' আদিভূমি হারালেও পরিযায়ী হয়ে টিকে আছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অবাক করা এই দুই চিড়িয়াখানা চিরতরে হারিয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গ থেকে

Oldest Zoo In Kolkata: হেস্টিংসের সময় ১৭১৭-১৮ পর্যন্ত ৬০৩০ সিক্কা টাকা খরচ করে বানানো হয়েছিল নতুন পক্ষিশালা এবং ১৮২২ সালে নতুন করে কিছু জন্তুর খাঁচা।

ডিহিমন্ডল ঘাটে জোরকদমে চলছে ছোট বানানোর কাজ, ছবি: স্বরূপ ভট্টাচার্যের ফেসবুক ওয়াল

পরিযায়ী ‘ছোট্’-কে আদিভূমিতে ফেরানোর পথ মোটেই সহজ ছিল না। এ বিষয়ে স্বরূপ প্রথম আলোচনা করেন সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির সমুদ্র পুরাতত্ত্ব গবেষক জিশান আলি শেখের সঙ্গে। তারপর তাঁরা ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের প্রফেসর জন পি. কুপারের মধ্যস্থতায় ব্রিটিশ সংস্থা ইএমকেপি-র (EMKP: Endangered Material Knowledge Programme) কাছে প্রস্তাব জমা দেন। ইএমকেপি এমন এক সংস্থা যারা পৃথিবীর অবলুপ্তপ্রায় যে কোনও জ্ঞান, দক্ষতা, কর্মকুশলতা সংরক্ষণের জন্য অর্থ সাহায্য দেয়। এই সংস্থা ‘ছোট’-কে নতুন করে তৈরি করা এবং তার সংরক্ষণের জন্য আর্থিক অনুদান অনুমোদন করে। শুরু হল ছোটের পুনর্জন্ম। তবে জন্মের পর এই নৌকার ঠাঁই হবে কোথায়? অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও বাংলার এই নৌকাকে বাংলাতে রাখা সম্ভব হল না যথেষ্ট সুযোগের অভাবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কত শিশু ঘুরছে ভারতের রাস্তায়? পৃথিবীর বৃহত্তম শিক্ষাব্যবস্থায় অবাক করবে যে তথ্য

Drop Out in India: একাধিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, সারা ভারতে ১ কোটি ৮০ লক্ষ শিশু প্রাথমিক শিক্ষালাভ করা তো দূরের কথা, বিভিন্ন শহরের রাস্তায় রাস্তায় অসহায় অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বাঁ দিক থেকে জন কুপার, জিশান আলি শেখ ও নৃতত্ত্ববিদ স্বরূপ ভট্টাচার্য, ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া

নৃতাত্ত্বিক সংরক্ষণের লড়াই সাময়িক স্তিমিত হলেও, বিষাদসিন্ধু পেরিয়ে আশার আলো ফুটল যখন হরিয়ানা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বসন্ত সিন্ধে প্রকল্প সম্পর্কে আগ্রহ দেখালেন। ইএমকেপি-র শর্ত অনুযায়ী, ছোট বানানো হলে সংরক্ষণের বরাত কোনও অলাভজনক সংস্থাকেই দিতে হবে। সেই কথা মতো, প্রফেসর সিন্ধের তৎপরতায় গুজরাতের লোথালে অবস্থিত সেন্ট্রাল মেরিটাইম মিউজিয়াম দায়িত্ব নিল বাংলার ‘ছোট্’ সংরক্ষণ করার।

শুরু হলো 'ছোট্' বানানোর কাজ। বেছে নেওয়া হলো তারই জন্মস্থান রূপনারায়ণের পূর্ব তীরবর্তী শ্যামপুর দু'নম্বর ব্লকের ডিহিমন্ডল ঘাট। ৭০ বছর বয়সী পঞ্চানন মণ্ডলের হাত ধরে শুরু হলো নতুন করে নৌকো তৈরির। প্রায় তিন দশক আগে তিনি শেষ ‘ছোট’ বানিয়ে ছিলেন। স্বরূপ বললেন, দায়িত্ব পেয়ে পঞ্চানন মণ্ডলের বার্ধক্যেও শিশুসুলভ চঞ্চলতা ফিরে এসেছে। নৌকা বানানোর কাজে তাঁকে সাহায্য করেছেন চার ছেলে- অমল, মণিমোহন, দিলীপ, দীপক। বড় ছেলে অমল ‘ছোট’ তৈরির কারিগরি কিছুটা জানে। বাকি ছেলেরা নৌকোর কাজ জানলেও, ছোট বানানোর দক্ষতা তাঁদের ছিল না। আজও পারম্পরিক জ্ঞান আশ্রয় করে দেশি নৌকো বানানোর চল রয়ে গেছে বঙ্গদেশে। রীতি মেনেই, পঞ্চানন মণ্ডল এবার সুযোগ পেলেন তাঁর ছেলেদের ছোট বানানোর খুঁটিনাটি শিখিয়ে দেওয়ার। অর্জুন, বাবলা জাতীয় গাছের কাঠ থেকে তৈরি হয় ছোট। নৌকো বানানোর কাজ শেষ হলে তার গায়ে গাব গাছের আঠা মাখিয়ে গাউনি করা হয়। শেষ পর্যন্ত, গত ১০ নভেম্বর নবনির্মিত ছোটকে রূপনারায়ণের জলে ভাসিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হলো। ছোট তৈরির সম্পূর্ণ কৌশল ও প্রক্রিয়া ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি, ইন্টারভিউ ইত্যাদির মাধ্যমে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে, এই কারিগরিকৌশল সংরক্ষিত হবে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের আর্কাইভে। ডিজিটাল প্লাটফর্মেও তথ্য পাওয়া যাবে। আর, পূর্বশর্ত অনুযায়ী, ছোট্‌ চলে যাবে গুজরাতের লোথাল মেরিটাইম মিউজিয়ামে। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ছোট্‌কে বাঁচানোর যে লড়াই স্বরূপ লড়ছেন তা এবার সফল।

কবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে কাজের সূত্রে স্বরূপের জড়িয়ে পড়া নৌ-নৃতত্ত্বের। তাঁকে আঁকড়ে ধরল নৌকো, তিনি নৌকোকে জড়িয়ে ধরলেন। যাতে বাকি জীবন সেই নিয়েই থাকতে পারেন। নৌকা নিয়েই যখন জীবন, বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে রাখার লড়াইময় সে জীবনে ওঠাপড়া, দোলাচল, অনিশ্চয়তা থাকবেই। স্বরূপের কথায়, “নৌকা নিয়ে পড়ে থাকা মানে আসলে জলে চলে যাওয়া। আমি জলে রয়েছি। হিসেব মতো আমার পায়ের তলায় মাটি নেই, শুধুই জল। কখনও কখনও ভাঁটাতে নেমে যাচ্ছি, আবার জোয়ারের জলে ভেসে উঠছি। এভাবেই চলছে।”

লিখেছেন
Tithi Roy
Tithi Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।