সলিল-সমাধি রুখতে সমুদ্রের ওপর শহর, মালদ্বীপের এই উদ্ভাবন যে পথ দেখাচ্ছে

হঠাৎ মালদ্বীপ এই প্রকল্পে হাত দিল কেন? কারণ ১,১৯০টি দ্বীপ নিয়ে তৈরি এই রাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একেবারে বিপদসীমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পুরো দেশটাই একেবারে সমুদ্রের জলের তলায় চলে যাবে।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
সলিল-সমাধি রুখতে সমুদ্রের ওপর শহর, মালদ্বীপের এই উদ্ভাবন যে পথ দেখাচ্ছে

'Necessity is the mother of innovation', কথাটা বলেছিলেন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো। মানবজাতির যা যা যুগান্তকারী আবিষ্কার, উদ্ভাবন, সবই চলতি ভাষায় বলা যায়, ঠেকায় পড়ে। নিজের দায়ে। প্রয়োজনে। আগুন জ্বালিয়ে ফেলা দুর্ঘটনা ছিল বটে, কিন্তু সেও ছিল নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টার ফল। লক্ষাধিক বছর কেটে গেছে সেই দিনের। আজ পৃথিবী দেখছে মানবজাতির চূড়ান্ত উন্নতি। প্রযুক্তির বলে বলীয়ান হয়ে মানুষ জয় করেছে এই গ্রহকে। না, ভুল হলো। সমস্ত প্রাণীদের ছাপিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে এই গ্রহের ওপর। কিন্তু জয়? না।

উত্তর খুবই সোজা। শিল্পবিপ্লব এবং তার ফলস্বরূপ জীবাস্ম জ্বালানি দহন করে শক্তি উৎপাদন, এবং এই গ্রহের বাতাসকে দূষিত করা, উত্তপ্ত করা। এবার পালা প্রকৃতির প্রতিশোধ নেওয়ার। সেই প্রতিশোধস্পৃহা থেকে নিজেকে রক্ষা করাই এখন মানবজাতির 'Necessity'।

বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং তার ফলে হওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে। যত দিন যাচ্ছে, ততই দ্বীপরাষ্ট্রগুলি সলিল-সমাধিস্থ হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই বাড়তে থাকা জলস্তর মোকাবিলায় এক নতুন, খুবই অভিনব এবং গুরুত্বপূর্ণ এক প্রযুক্তির আবিষ্কার করে ফেলেছে মানুষ। সমুদ্রের রোষ থেকে বাঁচতে একেবারে সমুদ্রের ওপরেই শহর নির্মাণ করা শুরু করে দিয়েছে তারা।

অবাক হলেন? হওয়ারই কথা। এরকমই একটি ভাসমান শহর নির্মিত হতে চলেছে মালদ্বীপের রাজধানী মালে থেকে নৌকো-পথে ঠিক দশ মিনিটের দূরত্বে। যেখানে বাস করবেন কুড়ি হাজার মানুষ। ৫০০০টি ভাসমান পাটাতনের ওপর তৈরি হবে সেই শহর। যেখানে থাকবে বাড়ি, বিদ্যালয়, রেস্তোরাঁ, দোকান বাজার। এই ৫০০০টি পাটাতন যুক্ত থাকবে খালের মাধ্যমে। মালদ্বীপ সরকার এবং ডাচ ডকল্যান্ড নামক এক সংস্থার এই যৌথ প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালে সম্পূর্ণ হওয়ার কথা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পরিবেশ রক্ষার মার্কশিটে ডাহা ফেল, কেন এই অবস্থা ভারতের?

আমাদের দেশ পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এই বছর ডাহা ফেল করেছে, দেশবাসীর মুখ লজ্জায় নিমজ্জিত করে সবার নিচে স্থান পেয়েছে।

কিন্তু হঠাৎ মালদ্বীপ এই প্রকল্পে হাত দিল কেন? কারণ ১,১৯০টি দ্বীপ নিয়ে তৈরি এই রাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একেবারে বিপদসীমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পুরো দেশটাই একেবারে সমুদ্রের জলের তলায় চলে যাবে। কিন্তু যদি এরম কোনও শহর তৈরি করা সম্ভব হয়, যা সমুদ্রের জলস্তরেই ভাসবে, তাহলে তার জলের তলায় চলে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই থাকে না, কারণ জলস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে সেই শহরেরও উচ্চতা বাড়বে। সহজ ভাষায় শহরের উচ্চতা বৃদ্ধির হার সমুদ্রের জলের স্তর বৃদ্ধির হারের সমানুপতিক।

ভাসমান শহরের এই ভাবনা শুরু হয়ে গেছে অনেক আগে থেকেই। নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রধান দপ্তরে উদ্বোধন করা হয়েছে বিশ্বের প্রথম ভাসমান শহর। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে ২০২৫ সালের মধ্যে 'ওশিয়ানিক্স' নামক এক সংস্থা ভাসমান শহর গড়ে তুলতে চলেছে। তার ঠিক পরেই রয়েছে মালদ্বীপের এই শহর।

তবে এই ভাসমান শহর নিয়ে যে আন্দোলন, তার কেন্দ্রে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। সেই দেশের এক সংস্থা এই শহরের নকশা তৈরি করেছে, আর এক সংস্থা নির্মাণ কাজ করবে। নেদারল্যান্ডসও সমুদ্রস্তর থেকে খুব সামান্য উচ্চতায় রয়েছে। যে কারণে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে, এতগুলি সংস্থার জন্ম দিয়েছে তারা, যারা সমুদ্রের ওপর শহর বানানোর জন্য গবেষণা করছে বা নির্মাণ করছে।

এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, যে ঠিক কীভাবে এই ধরনের শহরগুলিকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব? সুনামি, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে কী হবে?

নির্মাতারা জানাচ্ছেন, এমনভাবেই নকশা বানানো হচ্ছে, যাতে সবরকম বিপর্যয়েই এই ধরনের শহর সুরক্ষিত থাকবে। তারা সব ধরনের প্রয়োজন, যেমন বিদ্যুৎ, খাদ্য, পানীয় জল সব দিক দিয়েই আত্মনির্ভর হবে। একই সঙ্গে এটাও নির্মাতারা জানাচ্ছেন, যে, কোনওরকম সামুদ্রিক প্রাণী বা প্রবাল প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। হ্যাঁ, এটা ঠিকই, যে শুরুতে এই শহরগুলিতে থাকা যথেষ্ট ব্যয়বহুল হবে। কিন্তু আগামী দিনে এই শহরগুলি হয়ে উঠবে সাধারণের। বাড়তে থাকা জলস্তরের বিরুদ্ধে সবথেকে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠবে ভাসমান শহরগুলি।

এই কঠিন সময়ে এই ধরনের উদ্ভাবন যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। শুধু প্রয়োজন, যত দ্রুত সম্ভব, এই পরিষেবাকে সাধারণের আয়ত্তে এনে ফেলা। অনেক মানুষ সেক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু হওয়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবেন।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কোথায় আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় মুরাসু, কতটা ক্ষয়ক্ষতি, বাংলায় কী প্রভাব?

Cyclone Murasu: ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব কাটতে না কাটতেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড় মুরাসু। মঙ্গলবার ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়। নেল্লোর, প্রকাশম ও বাপটলা জেলায় গাছ উপড়ে পড়েছে, নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। তামিলনাড়ু ও ওড়িশাতেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা জারি হয়েছে। বাংলায় কতটা প্রভাব ফেলবে মুরাসু?

ভুটানে হড়পা বানের জেরে উত্তরবঙ্গে আতঙ্ক, কী পরিস্তিতি এখন?

Bhutan Flash Flood: ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রের পরিকাঠামো। বন্যার আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। শুক্রবার সকালে সংকোশ নদীর জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। পরিস্থিতি এখন কেমন?

মাত্র ১০০ বই থেকে ১০ হাজার! অসমের চা-বাগানের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অনিন্দিতা

Assam Library Initiative: মাত্র ১০০টি বই নিয়ে ২০২০ সালে অসমের চা-বাগান এলাকার শিশুদের জন্য লাইব্রেরি শুরু করেছিলেন অনিন্দিতা গগৈ। আজ তিনটি লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবারের ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ। কীভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছেন অনিন্দিতা?

Cyclone Arnab: কোথায় আছড়ে পড়ল অর্ণব, কতটা ক্ষয়ক্ষতি? বাংলায় কতটা প্রভাব?

Cyclone Arnab: অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও জল জমার জেরে বিপর্যস্ত একাধিক এলাকা। ৮৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। বাংলার কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, আর কতটা প্রভাব পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়ের?

অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই সংস্থাগুলি যেভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু সংকটের কারণ

The AI Carbon Bill: অ্যানথ্রোপিকের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ-জলের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫-এ ডেটা সেন্টারগুলিতে ঘণ্টা প্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহার, ৪৪৮ টেরাওয়াটে পৌঁছবে।

লুলার জয়ের পরেও কেন স্বস্তিতে নেই 'পৃথিবীর ফুসফুস' আমাজন?

lula's amazon policy: প্রথম পর্বে পিছিয়ে থাকার পর, কুড়ি দিনে এক কোটিরও বেশি ভোট বাড়িয়ে লুলা দা সিলভা চতুর্থবার ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। লুলার আমলে, আমাজনের জঙ্গল উজাড় হওয়া ৭১% কমেছে, তবু আইনসভায় ডানপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি হওয়ায়, আমাজনের সংকটজনক সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেলই।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণব : কোথায় রয়েছে, বাংলায় কতটা দুর্যোগের আশঙ্কা?

Cyclone Arnab: বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে অর্ণব। বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে এই ঝড়। সরাসরি বাংলায় আঘাত না হানলেও মঙ্গলবার থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টি হতে পারে। কোন কোন জেলায় দুর্যোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি?

রেকর্ড ভাঙা সমুদ্রের উষ্ণতা: কতটা বিপদের মুখে পৃথিবী?

super el nino 2026: অক্টোবরে নিনো ৩.৪ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্য, ২০১৫-১৬-র রেকর্ড ভেঙে ৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়াতে চলেছে। ডব্লিউএমও বলছে, এই এল নিনো ২০২৭ পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। ভারতে বর্ষায় ১৩% ঘাটতি, ৩৯.৮% কৃষিজমিতে খরা, ফসল উৎপাদন ৪% কমার আশঙ্কা রয়েছে।