এ পৃথিবী একবার পায় তারে

Shankhamala, Jibanananda Das: কোনো মানুষের চোখে কি কাঠজ্বলা আগুন দেখা যায়! তাহলে কি এই কবিতা জীবিত মৃতের সংলাপ!

Arka Deb
৫ মিনিট
এ পৃথিবী একবার পায় তারে

প্রথম বয়সে মন থাকে কবিতাকে কাঁটাছেড়া করার, অর্থ খোঁজার দিকে। তারপর ক্রমে মন থিতিয়ে যায়, খাদের দিকে যায়, কবিতা নিজেই তখন সেই মনের পাশে এসে বসে। জ্বরের দিনে পাশে বসে থাকে। অর্থহীনতার পারাপরে নিয়ে যায়। নতুন অর্থের জানলা খুলে দেয় হঠাৎ করেই। জীবনানন্দের শঙ্খমালা কবিতার এই লাইনটার কথাই যদি ধরি,

'এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর'

আগে যতবার পড়েছি মনে হয়েছে প্রেমিকার, কুহকিনী, অভিসারিকার কথাই তো বলা হচ্ছে, যার জন্যে ছুটে মরা, বেদনাপ্রধান ভালবাসার রুমালে মিছে ফুলতোলা। কিন্তু আজ, ইষৎ জ্বরের ঘোরে কবিতাটা যখন ফিরে পড়ছি, মনে হচ্ছে আরে মৃত্যু নয় কি এই নারী! যে ছিল দূরে কান্তারের পথে, সে আজ আমায় নিতে এসেছে, 'বলিল, তোমারে চাই'!

জীবনানন্দের কবিতায় সাধারণত যেমন দেখি, কবি একজন নারীকে খুঁজছেন, কবিতায় তাঁর অনুসন্ধান প্রবাহ ধরা থাকে। চট করে মনে করা যায়, বনলতা সেন।

তাঁকে খুঁজছে দেশকালের সীমা ভাঙা কবির ক্লান্ত হৃদয়।

"সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশােকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরাে দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন"

কিন্ত এই কবিতায় কবি স্থবির, নারীটি এসেছেন, এসে বলছেন, 'তোমারে চাই'।

"কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে

সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে,

বলিল, তোমারে চাই:

বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ

খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি- কুয়াশার পাখনায়"

বলছেন, নক্ষত্রে, কুয়াশার পাখনায় খুঁজে তবে আজ দেখা না দেখা মিশছে। মন আটকে থাকে কুয়াশার পাখনা শব্দবন্ধে। গ্রামবাংলায় শীতের সন্ধ্যে নামতে যারা দেখেছে তারা জানে, কুয়াশার পাখনা আসলে কী। দূরে একটা চাদর দেখা যায়, তা ক্রমে নিজেকে মেলে ধরতে থাকে, যেন কোনো পাখি, আসতে আসতে পাখনা মেলে দিচ্ছে। সেই সন্ধেয় খোঁজ চালিয়েছে সে, নির্জন পেঁচার মতো।

আরেকটু এগোই,

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যে কবিতায় অন্ধকার নামে সহসা

Poems written by Aritra Som: এই কাব্যগ্রন্থ, ধরে রেখেছে ব্যক্তির এবং সমষ্টির অন্ধকারের গান। বিষাদের পথে ক্রমাগত হেঁটে যাওয়া। একা একা একা। যতদূর গেলে আর ফেরা নেই।

"সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক

জোনাকির দেহ হতে-খুজেছি তোমারে সেইখানে-

ধূসর পেচার মতো ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে

ধানসিড়ি বেয়ে-বেয়ে

সোনার সিঁড়ির মতো ধানে আর ধানে

তোমারে খুঁজছি আমি নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে"

এখানে জীবনানন্দের একটা ছোট খোদকারি দেখে মন ভরে যায়। ধানে শব্দটি দু'বার পাশাপাশি ব্যবহার করে অনন্ত ধানক্ষেত এঁকে দিচ্ছেন কবি, সেই ধানক্ষেতে আঁধার নামছে। গ্রাম্য সান্ধ্য আবহ। বাংলার চিরনিজস্ব ছবি।

এই আবহেই কবির সঙ্গে তাঁর দেখা। আর এখানেই খটকা। এতক্ষণ যাকে মৃত্যু ভাবছিলাম সে কি স্রেফ মৃত্যু! গ্রামবাংলায় অন্ধকারে কে আসে! কার পদসঞ্চারে কুয়াশাবিছানো পথে মনে ভয় জাগে ঘনঘন! মনে পড়ছে 'হলুদ পোড়া', মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে প্রতিটি মৃত্যুই সন্ধে নামছে যখন, তখন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়-

"তখনো আকাশ থেকে আলোর শেষ আভাসটুকু মুছে যায়নি। দু'তিনটি তারা দেখা দিয়েছে। আরো কয়েকটি দেখা দিতে দিতে আবার হারিয়ে যাচ্ছে। এক মিনিট কি দু'মিনিটের মধ্যে রাত্রি শুরু হয়ে যাবে। জীবিতের সঙ্গে মৃতের সংযোগ স্থাপনের প্রশান্ত সময় সন্ধ্যা।"

এবার জীবনানন্দের কবিতাটির অংশবিশেষ আবার পড়া যাক-

"কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে

সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে,

বলিল, তোমারে চাই:

বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ

খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি- কুয়াশার পাখনায়-

সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক

জোনাকির দেহ হতে-খুজেছি তোমারে সেইখানে-

ধূসর পেচার মতো ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে

ধানসিড়ি বেয়ে-বেয়ে

সোনার সিঁড়ির মতো ধানে আর ধানে

তোমারে খুঁজছি আমি নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে।"

আমার আর সংশয় থাকে না। এই পরিস্থিতিতেই তো চোরের মতো ভিটে থেকে নেমে ডোবার কাছে যায় হলুদপোড়ার ধীরেন, শুভ্রার দাদা। যে আমায় সন্ধেয় খুঁজতে এসেছে সে কেমন দেখতে? কবিতায় প্রথম ইঙ্গিত,

'কড়ির মতন সাদা মুখ তার;

দ্বিতীয় ইঙ্গিত

'দুইখানা হাত তার হিম;'

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অন্যজনের রবীন্দ্রগান

Rabindra Sangeet: রবিবার অন্য দিনের মতো ভিক্ষে পাওয়া যাবে না, তিনি জানেন। কিছুটা অভ্যেসবশেই গাইছেন তিনি। কোন আকাশের কথা বলছেন? যে জন্মান্ধ সে তো আকাশই দেখেনি। তাঁর মুক্তি কোন আকাশে?

গ্রামবাংলার মেয়ে, সে হবে শ্যামলিমা মাখা, তার মুখ কেন কড়ির মতো সাদা! কেন তার হাত হিম! একবার এক বন্ধুর মৃতা মায়ের হাত ধরে দীর্ঘ পথ গিয়েছিলাম। সেই থেকে জানি, জীবিত মানুষের চেয়ে মৃতের হাত অনেক বেশি হিমেল।

শেষ ইঙ্গিত:

'চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম চিতা জলে:'

কোনো মানুষের চোখে কি কাঠজ্বলা আগুন দেখা যায়!

তাহলে কি এই কবিতা জীবিত মৃতের সংলাপ! জীবনানন্দই তো ১৯৪৬-৪৭-এ লিখবেন,

'মৃতেরা কোথাও নেই; আছে?

কোনো-কোনো অঘ্রাণের পথে পায়চারি-করা শান্ত মানুষের

হৃদয়ের পথে ছাড়া মৃতের কোথাও নেই বলে মনে হয়;'

সে-ই কি এসেছিল নারীর বেশে কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধের আঁধারে!

আমি আমার ব্যখ্যাটি সিদ্ধান্ত হিসেবে রাখছি না এখানে, কাউকে মেনেও নিতে বলছি না। শুধু বলছি কবিতা নিজেই নিজের সমস্ত গয়না খুলে ধরা দেয় অকস্মাৎ। এই কবিতাটিও আজ তেমন, আমার জ্বরের দিনে, নতুন ইশারা নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সত্যিই তো যা মৃত্যুর মতো অনিবার্য তাকে একবারই পাওয়া যায়।

আবার একথাও ঠিক, এমন মানুষ আছেন, যাকে চকিতে একবারই দেখেছি কেবল। বড়জোর তাঁর চলে যাওয়ার পথটি মনে পড়ে। আছে এমন গানও। মাত্র একবার শোনা। আজ এ লেখার শিরোনামের সূত্র ধরে তেমন তিনটি গানের কথা বলেই এই পর্ব শেষ করব। প্রথম গানটির গল্প বলেছিলেন জয় গোস্বামী। কয়েক দশক আগে লোকাল ট্রেনে শুভ্রবসন পরা এক ফকিরকে গাইতে শুনেছিলেন তিনি। গানের কথা সুর সব তাঁর কাছে রয়ে গেছে, ফিকে হয়নি এতদিন পরেও। কথাগুলি এইরকম-

'ওরে চিকন কালা

তোমার আশ্চর্য লীলা,

নামের গুণে জলের 'পরে ভাসাইলা শিলা'

একবার পেয়েছেন, কিন্তু রেখে দিয়েছেন জয়।

দ্বিতীয় গানের কথা বলি। আমি যখন শুনি তখন আমি কলেজের প্রথম বছরে পা দিয়েছি সম্ভবত। বন্ধুদের সাথে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছি। এক গেরুয়াধারী বসে গান শোনাচ্ছেন অনেকক্ষণ। চেনা গান। আমি একটু উতলা, বললাম, একটা এমন গান গান না যেটা রোজ গাইতে হয় না। তিনি একটু অপ্রস্তুত হলেন আবদারে। চলে যাওয়ার আগে আমার কাছে এসে গুণগুণ করে গাইলেন,

"ফুলেরই ভ্রমরা, গিয়াছে উড়িয়া

না জানি কোন বাগানে ধরা পড়েছে

বন্ধু বিনে কমল বাসি হয়েছে

মধুমাখা দু'টি ফুল ফুটেছে"

এই গানটিও ওই একবারই, আর কখনও শুনিনি আমি। এমনকী এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কয়েক বছর পর যখন দেখা হলো, তিনিও আর এই গানটি মনে করতে পারল না। আজ এখন এই গল্প বলতে বসে আমার মনে হচ্ছে,

'এ পৃথিবী একবার পায় তারে

পায় নাকো আর'

আরেকবার, পাথরচাপুড়ি মেলায় এলোমেলো ঘুরছি। জাঁকজমক পেরিয়ে সবচেয়ে ম্লান আখরায় গিয়ে বসলাম। যিনি আখরাধারী তাঁর নাম আজও মনে আছে। শেখ আরজুল। বর্ধমানের ভাগচাষী। মাঠ থেকে ফিরে, রিডের রংচটা, ইঁদুরে পর্দা-কাটা হারমোনিয়ামে গান গান। একটা ঢোল নিয়ে সঙ্গত করেন গ্রামের আরেক ভাগচাষী। আমার আগ্রহ দেখে তিনি আমাকে লালনের একটি পদ শোনালেন, সে পদ আর কখনও কারও মুখে শুনিনি, শুনবও না বোধহয়। পদটি এমন-

"আছে দ্বীন দুনিয়ার অচিন মানুষ একজনা

কাজের বেলায় পরশমণি, আর সময় কেউ চেনে না।

নবী আলি এই দু'জনে

কলমা দাতা আরেফিনে

বেকলমায় সে অচিন জনে

পীরের পীর হয় সে জানো না

কাজের বেলায় পরশমণি আর সময় কেউ চেনে না"

জ্বরের সন্ধে। জীবনান্দের কবিতার একটি লাইন আমাকে নিয়ে যাচ্ছে এমন পথে, যে পথে আর কখনও যাব না। নিয়ে যাচ্ছে এমন বিষণ্ন-করুণ সন্ধের কাছে, যা একবারই আসে।

লিখেছেন
Arka Deb
Arka Deb
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মন তার মরে গেছে কবেই

The Soul Of Kolkata: গাড়ি এগোতেই চোখে পড়ে পুরনো নিলামঘরটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারি যে কলকাতা শহরের নেশায় ভেসে ভেসে এতদূর এসেছি, সে শহরটার চোখে মুখে বীভৎস মেকআপ, রূপ তার জ্বলে গেছে।

নিকষ আঁধারে ওরা হাঁটছে...

Walking with Refugees in mind: আয়নায় সেই বিষাদে ভরা ভয়ার্ত মুখ আমি দেখতে পাই। দেখতে পাই অজস্র প্রত্যয়শূন্য মুহূর্ত। দেখতে পাই অ্যালিনারা নিকষ আধাঁরে হাঁটছে।

দুর্গাদর্শক সবাই, দুর্গাদ্রষ্টা আছেন কেউ?

Durga Puja 2023 : এখনও গ্রামের দিকে দেখা যায় দেবীমুখ বর্তুলাকার। কারণ যে কোনও জিনিসকে গোলচে আকার দেওয়াই কুমোরের ধর্ম।

কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!

Cricket World Cup 2023: কুড়ি বছর পর একটা ক্রিকেট ম্যাচ যদি জিতে যাওয়া যায়, গলির ছেলেরা অন্য রকম ভাববে।

হেমন্ত আমার কেউ না

Late Autumn: স্মৃতি পরিত্যাজ্য, হেমন্ত পরিত্যাক্ত সেই স্মৃতির স্মারকের মতো। 

নজরুলের কফিন রহমানের পেরেক

AR Rahman version of Nazrul Islam's song: আমরা রহমানের বাপবাপান্ত করার আগে প্রশ্ন করছি না, এই প্রকল্পে তো বহু বাঙালি কাজ করেছেন।

সরকারকে কাল ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিতে পারি না?

Charu Majumdar: অনন্ত সিংহ-রা জ্যোতি বসুকে অপহরণ করতে চাইতেন। চাইতেন বিধানসভা ওড়াতে। একটি বিস্ফোরক বোঝাই গাড়ি বানিয়েছিলেন তারা।

ঈশ্বরের প্রতিস্পর্ধী এক জনতার শিল্পী

Banksy, The Artist and Israel-Palestine War: কাল রাতে যে সেনা বাড়িজুড়ে তল্লাশি চালিয়েছে, মেয়েদের জামা খুলিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে, শিশুকেও ছাড়েনি, সকালে উঠে সবাই দেখবে, দেওয়ালে কে যেন এঁকে গিয়েছে সেই সেনার শরীর তল্লাশি করছে এক শিশু। অক্ষমের প্রত্যুত্তর।