সাংবাদিকই হেনস্থার শিকার হলে বিচার চেয়ে প্রশ্ন তুলবে কে?

Molestation of Journalist: অপরাধ করে কত সহজেই ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চান প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা!

inscript
৩ মিনিট
সাংবাদিকই হেনস্থার শিকার হলে বিচার চেয়ে প্রশ্ন তুলবে কে?

এ দেশেতে অন্ধ আইন,

সমাজের মুখ বন্ধ।

হলে মেয়ে তুই নির্যাতিতা-

থাকবি না চুপ,

তুলবি হাতে অস্ত্র!

‘অসুর বিনাশিনী’ কবিতাটি লিখেছিলাম ২০২০ সালের অক্টোবরে। একটার পর একটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলেছে সেই সময়। কবিতাটি লেখার কয়েক মাসের মধ্যেই ২০২১-এর জানুয়ারি মাসে বম্বে হাইকোর্টের যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত একটি রায়ে তোলপাড় হয়েছিল সমাজমাধ্যম। পকসো আইনে যৌন নির্যাতন হিসেবে গণ্য হতে গেলে 'যৌন উদ্দেশ্যে ত্বকের সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শ' হওয়া প্রয়োজন বলে এক রায়ে জানিয়েছিল বম্বে হাইকোর্ট। এক নাবালিকাকে যৌন নির্যাতনের মামলায় বিচারপতি পুষ্পা গনেড়িওয়ালা জানিয়েছিলেন, কেবল নাবালিকার বুক স্পর্শ করার অভিযোগ উঠলেই তাঁকে পকসো আইনে যৌন নির্যাতন হিসেবে ধরা যাবে না। জামা সরিয়ে 'স্কিন টু স্কিন কন্ট্যাক্ট'-এর অভিযোগ উঠলে তবেই যৌন নির্যাতনের মামলা করা যাবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিচার করবে কে? পশ্চিমবঙ্গের ২৫জন বিধায়কই যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত: রিপোর্ট

Crime Against Woman: যেখানে মহিলারা রাস্তায় নেমেছেন নিরাপত্তার দাবিতে সেই পশ্চিমবঙ্গেই মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিধায়কদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে!

আমার এই কবিতা প্রতিবাদের আবেগমিশ্রিত শব্দের সমাহার মাত্র। তাই কবিতায় অস্ত্র তুলে নেওয়ার কথা বলা গেলেও ভারতবর্ষের আইন কি তা সমর্থন করবে? তাহলে কারও সঙ্গে অন্যায় হলে সে কী করবে? ঘরে মুখ লুকিয়ে বসে থাকবে? সমাজ কী বলবে— এই ভেবে লজ্জায়, ভয়ে চুপ থাকবে নির্যাতনের শিকার হওয়া ছেলে-মেয়েরা? সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা এমনই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আরজি করের ঘটনার পর হতাশ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অনেকেরই ধারণা তৈরি হয়েছে, প্রতিবাদ করে কিছু হয় না। সভ্য সমাজে সুবিচার চাওয়াই যেন অন্যায়! কিন্তু নির্যাতিত বা নির্যাতিতারা যাতে সাহস করে বিচার চাইতে পারেন, তার জন্য আইন-আদালতের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সমাজের কি কোনও দায় নেই?

সম্প্রতি একজন মহিলা সাংবাদিক হিসেবে আমার এক খারাপ অভিজ্ঞতা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলাম। এক রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাঁর অভব্য ও অশালীন আচরণের শিকার হয়েছিলাম আমি। বিষয়টি নিয়ে সরব হওয়ায় পাল্টা আমার দিকেই ধেয়ে আসে আক্রমণ। অথচ সাংবাদিকরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন অনেক ঘটনা সামনে নিয়ে আসেন যা কল্পনাতীত। রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে, প্রাণসংশয় হতে পারে জেনেও, সব উপেক্ষা করেই তাঁরা প্রশ্ন করে চলেন। অথচ একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি যখন আমারই সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, তখন উল্টে আমাকেই হেনস্থার শিকার হতে হয়!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তরুণী সাংবাদিককে হেনস্থা! অভিযুক্ত সিপিএম নেতা তন্ময় ভট্টাচার্য যা বলছেন...

Tanmoy Bhattacharya CPIM: প্রাক্তন বাম বিধায়ক বলছেন, সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, এর আগেও তন্ময় তাঁর সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছেন। তাহলে এতদিন তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতনকে বলেননি কেন?

তার উপর যদি অভিযোগ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে হয়, তার সুবিধে নিতে ছাড়েন না অভিযুক্ত। "মানুষের সেবা করার জন্য রাজনীতি করি" দাবি করা ব্যাক্তিরা সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক সুবিধে নিয়ে নেন। অপরাধ করে কত সহজেই ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চান। প্রভাবশালী তো অনেক বড় ব্যাপার, কোনও ভবঘুরের বিরুদ্ধেও শ্লীলতাহানি বা যৌন নির্যাতনের মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে গেলে অনেক সাহস জোগাতে হয়, বিশেষ করে মহিলাদের। আমার সঙ্গে ঘটা এই ঘটনায় সমাজের একটা অংশ দাঁত-নখ বের করে আমাকে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করে প্রমাণ করে দিয়েছে ‘দ্বিচারিতা’ শব্দের অর্থ। আরজি করের প্রতিবাদে যাঁরা রাস্তায় নেমেছিলেন তাঁদেরই অনেকেই আমাকে 'ভিক্টিম ব্লেমিং' করেছেন। সত্য না জেনেই, আদালতে বিচার হওয়ার আগেই নিজের মতো করে বিচার করেছেন।

যদিও আইনি লড়াই এখনও জারি; তবে, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল তদন্ত করে সেই নেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছে। আসলে এই লড়াই সেই সব সাংবাদিকদেরই, যাঁরা প্রতিনিয়ত নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েও মুখ খুলে উঠতে পারেন না। সাংবাদিকরাও যে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হন তা যেন ভাবাই যায় না! সত্যটা মানতে হবে। ‘ইয়ার্কি’ করছি বলে আপত্তিজনকভাবে স্পর্শ করা যায় না, সেটা বুঝতে হবে। আসলে অপরাধীদের কোনও দল হয় না। সব জায়গায় সবরকম মানুষের উপস্থিতি থাকে। কিন্তু তাঁরা চিহ্নিত হলে পক্ষপাত না করে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করাই জরুরি।

অনেকের মতেই, “ঘটনাটা ঘটেছে মানছি, ঘটতেই পারে কিন্তু প্রতিবাদ করার কী দরকার ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার আর না নিতে গেলেই হতো”। কিন্তু কেউ বুঝছেন না বা বুঝতে চাইছেন না যে, প্রতিবাদ না করলে এমন অশালীন আচরণ আরও অনেকের সঙ্গেই চালিয়ে যেতেন ওই ব্যক্তি। তাছাড়া “কী আর করবি! মেনে নে, মানিয়ে নে” গোত্রের শোনাচ্ছে না বিষয়টা? এইভাবে ঘটনাগুলোকে 'স্বাভাবিক' করে দেখার কারণে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ না খোলার কারণেই সমাজে অন্যায় বাড়ছে বলে মনে হয় না কি? সরকার আর পুলিশ প্রশাসনকে দোষ দিয়েই কি আমাদের সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেও প্রশ্ন করতে হবে তো, অন্যায় রুখতে আমার ভূমিকা কী? আমি অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছি না তো? স্বার্থ সংঘাত হলেই নির্যাতিত বা নির্যাতিতাকে নানাভাবে আক্রমণ করে আরও যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি না তো? অনেক সময় নিজেকে প্রশ্ন করাও জরুরি। ইতিমধ্যেই একটি অন্যায়ের বিচারের জন্য লড়ছি আমি, তার উপরে যেভাবে নিত্য মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে আমাকে এর বিচার করবে কে?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।