খবরের কাগজ বলেছিল বাঁদরের নৃত্য, গান নয়, ইতিহাস হয়ে থেকে গেল মনিদার কাজ

'আবার বছর কুড়ি পরে'-র সময় যাঁদের দিয়ে গান গাওয়ালেন মনিদা, তাঁদের স্বতন্ত্র গানের পরিসর তৈরি হল পরে। একে একে তৈরি হল চন্দ্রবিন্দু, লক্ষ্মীছাড়া। শিলাজিৎ মনিদার খুব প্রিয় ছিল। 'মহীনের ঘোড়াগুলি' এদের সকলকে সাহস জুগিয়েছে, মনিদা সাহস দিয়েছে।

Abraham Mazumder
৩ মিনিট
খবরের কাগজ বলেছিল বাঁদরের নৃত্য, গান নয়, ইতিহাস হয়ে থেকে গেল মনিদার কাজ

'মহীনের ঘোড়াগুলি'-র শুরু থেকেই আমি ছিলাম। নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ও তারপরের নানা জটিলতার কারণে গৌতম চট্টোপাধ্যায় তখন ছিলেন ভূপালে। ট্রিংকাসের সময় ওঁদের ব্যান্ডের গল্প অনেক শুনেছি, কিন্তু সেসময় আমি ছিলাম না। ওঁর ছোট ভাই বিশু আর আমি বন্ধু ছিলাম, ঘুরতে ঘুরতে আমরা ভূপালে গিয়ে পৌঁছই। ওখানে ওঁর সঙ্গে দেখা। ওঁর একটা ব্যান্ড ছিল ভূপালে, আমরা একসঙ্গে গানবাজনা করেছিলাম। সাত বছর উনি ভূপালে ছিলেন, সেটা ওঁর ভূপাল-বাসের শেষ দিক। মনে হয়েছিল, বাংলা গান নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে চাইছিলেন গৌতমদা। আমি যখন ভূপাল ছেড়ে চলে আসছি, তখন আমাকে বলেছিলেন, 'তোর সঙ্গে কলকাতায় দেখা হবে, আমরা নতুন করে অন্য কিছু করব।' তখন তো জানতাম না, ওঁর কী পরিকল্পনা, শুধু ভাল লেগেছিল, মনিদা কলকাতায় ফিরে আসছেন জেনে।

তারপর ১৯৭৪ সালে কলকাতায় ফিরলেন মনিদা, ১৯৭৫-এ শুরু হলো 'মহীনের ঘোড়াগুলি'। নামটা রেখেছিলেন রঞ্জনদা, রঞ্জন ঘোষাল, মনিদা সেটাকে স্বীকৃতি দিলেন। ১৯৭৬, '৭৭, '৭৮- তিন বছরে তিনটে ভিনাইল রেকর্ড প্রকাশিত হলো আমাদের। তখন কি-বোর্ড আসত খিদিরপুর থেকে, কলকাতায় পাওয়া যেত না। 'রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে'-তে কি-বোর্ডের ব্যবহার ছিল। এক ভদ্রলোককে আমরা চিনতাম, তিনি লেক গার্ডেন্সে থাকতেন, তাঁর কাছে কি-বোর্ড পাওয়া যেত বলেই বিখ্যাত ছিলেন তিনি, বাজানোর জন্য নয়। শুধু কি-বোর্ড ভাড়া করা যেত না, নিয়ম ছিল, যাঁর কি-বোর্ড , তাঁকেও ভাড়া করতে হবে, সে কি-বোর্ডের সঙ্গে ঘুরবে! আমাদের অপেক্ষা করিয়ে রাখতেন তিনি, আমাদের ওদিকে রেকর্ডিংয়ের তাড়া। এমন নানা মজার গল্প সেই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে।

শুনতে পারেন: সংবিগ্ন পাখিকুল

মনিদা চলে যাওয়ার এতদিন পরেও মনিদা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখনও। যে গানগুলো সেসময় করেছিলাম মনিদার সঙ্গে, পরে ছাত্রদের সঙ্গেও সেই গান নিয়ে কনসার্ট করেছি। রঞ্জনদা আয়োজন করেছিলেন মনিদাকে নিয়ে একটি বিশাল কনসার্টের, 'আবার বছর তিরিশ পরে', ২০০৮ সালে হয়েছিল। ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রা হয়েছিল, প্রায় একশোজন মিউজিশিয়ান ছিলেন, পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম আমি। কলকাতার পরিচিত শিল্পীদের নিয়ে হয়েছিল অনুষ্ঠানটা। চন্দ্রবিন্দু-র অনিন্দ্য, রূপম- এরা গেয়েছিল, যীশু সেনগুপ্ত ড্রাম বাজিয়েছিল, অঞ্জন দত্ত, অন্তরা চৌধুরী, কে না গেয়েছিলেন। দেখেছিলাম, তিরিশ বছর পরেও কী ভালবাসা মানুষের মধ্যে মহীনের গান নিয়ে! অসাধারণ হয়েছিল সেই কনসার্ট। মনিদার থেকে যা শিখেছি, সবসময় সঙ্গে থাকে। মনিদার ভাবনা শুধু গান নয়, সংগীতের অন্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছিল।

সেই সময় কাগজে লেখা হয়েছিল, আমরা হনুমান, বাঁদরের মতো নেত্য করি, গান করি না। তবে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি- এই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বুঝল আমাদের গানের মাহাত্ম্য। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে গেল আমাদের গান।

শুনতে পারেন: হায় ভালবাসি

মনিদার সঙ্গে আমি কিছু বছর যাপন করেছি। শেষ বয়স অবধি মনিদা আমার বাড়িতে এসেছেন। মনিদার ছবিগুলোতেও কাজ করেছি। আমরা একসঙ্গে বিঠোফেন শুনতাম, পাশ্চাত্য সংগীতের প্রতি অসম্ভব অনুরাগ ছিল মনিদার, যার প্রভাব রয়েছে 'হায় ভালবাসি' গানটিতে। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে আমার অনুষ্ঠান শুনতে আসতেন নিয়মিত। 'সময়' বলে একটা ছবির কথা মনে পড়ে, সেটা শেষত মুক্তি পায়নি। সেখানে আমি অভিনয়ও করেছিলাম।

'আবার বছর কুড়ি পরে'-র সময় যাঁদের দিয়ে গান গাওয়ালেন মনিদা, তাঁদের স্বতন্ত্র গানের পরিসর তৈরি হল পরে। একে একে তৈরি হল চন্দ্রবিন্দু, লক্ষ্মীছাড়া। শিলাজিৎ মনিদার খুব প্রিয় ছিল। 'মহীনের ঘোড়াগুলি' এদের সকলকে সাহস জুগিয়েছে, মনিদা সাহস দিয়েছে। এরা মনিদাকে ভালবাসে, কাজেই 'মহীনের ঘোড়াগুলি'-কেও ভালবাসে।

এখনও যখন কেউ মহীনের গানের সৌন্দর্য অনুধাবন করে, মনিদার ওপর আমাদের বিশ্বাস, আমাদের ভালবাসা জিতে যায় বারবার।

লিখেছেন
Abraham Mazumder
Abraham Mazumder
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক গঙ্গাপ্রসাদ সেনের বাড়ির দুর্গাপুজো: পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্য যেভাবে এল কুমারটুলিতে

Gangaprasad Sen Bari Durga Puja: গঙ্গাপ্রসাদ সেন ছিলেন বিখ্যাত আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতে আসতেন। তাঁর বাবা নীলাম্বর সেন অবিভক্ত বাংলার এক নামকরা কবিরাজ ছিলেন। কলকাতায় আসার পর সেন পরিবার কুমারটুলিতে বসতি গড়ে এবং সেখানেই ১৮৫৭ সালে শুরু হয় দুর্গার আরাধনা।

১৩ বছর বয়সে ফুটপাথে থাকা, কার্গিলে জওয়ানদের পাশে, ‘পরিন্দা’য় আগুনে পুড়ে যাওয়া: নানা পাটেকর আসলে কেমন মানুষ ছিলেন?

Nana Patekar unknown facts: প্রকাশ রাজের ভাষায়, নানা কেবল একজন প্রবীণ সহকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক অভিভাবক-বন্ধু, যাঁর সঙ্গে তীব্র তর্কে জড়িয়ে পড়া যেত, আবার একই টেবিলে বসে তাঁর হাতের রান্না করা খাবার ভাগ করে নেওয়া যেত। মদ বা মুম্বইয়ের তথাকথিত হাই-প্রোফাইল পার্টি কালচারের প্রতি তাঁর চিরকালই ছিল তীব্র অনীহা।

নানা পাটেকর: ফিরে দেখা অনন্য জীবন

Nana Patekar: ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বোম্বে রাজ্যের রায়গড় জেলার মুরুদ-জানজিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। পরে সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’।

মাছ-ভাত খেয়েই বোধন, দশমীতে মৎস্যমুখ! বাগবাজার হালদার বাড়ির সাড়ে চারশো বছরের পরম্পরা

Bagbazar Haldar Bari Durga Puja: পুজোর ইতিহাসের সূত্রপাত ওড়িশার বালেশ্বরের কাছে সাহেবপুর বা রহনপুরে। হালদার পরিবারের পূর্বপুরুষরা চন্দননগরের নোয়াপাড়ার জমিদার ছিলেন। তাঁদেরই এক পূর্বপুরুষ কৃষ্ণপ্রসাদ হালদার প্রমোদভ্রমণে ওড়িশার ওই এলাকায় গেলে স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে সত্যিই উদ্ধার হয় মহিষমর্দিনীর কষ্টিপাথরের মূর্তি।

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।

যে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষেধ, সেখান থেকেই যেভাবে হলো সর্বজনীন পুজোর শুরু

history of Durga Puja in Kolkata: ব্রিটিশ কলকাতায় সেই পুজোর ধরন বদলাতে শুরু করল; বদলাল গেট-টুগেদারের ধরনও। আর কলকাতার দুর্গাপুজো আদতে হয়ে উঠল কোম্পানির পুজো। মানে কোম্পানির লোকেদের তোয়াজের জন্য করা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। সেই পুজোর থেকে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।