খবরের কাগজ বলেছিল বাঁদরের নৃত্য, গান নয়, ইতিহাস হয়ে থেকে গেল মনিদার কাজ

'মহীনের ঘোড়াগুলি'-র শুরু থেকেই আমি ছিলাম। নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ও তারপরের নানা জটিলতার কারণে গৌতম চট্টোপাধ্যায় তখন ছিলেন ভূপালে। ট্রিংকাসের সময় ওঁদের ব্যান্ডের গল্প অনেক শুনেছি, কিন্তু সেসময় আমি ছিলাম না। ওঁর ছোট ভাই বিশু আর আমি বন্ধু ছিলাম, ঘুরতে ঘুরতে আমরা ভূপালে গিয়ে পৌঁছই। ওখানে ওঁর সঙ্গে দেখা। ওঁর একটা ব্যান্ড ছিল ভূপালে, আমরা একসঙ্গে গানবাজনা করেছিলাম। সাত বছর উনি ভূপালে ছিলেন, সেটা ওঁর ভূপাল-বাসের শেষ দিক। মনে হয়েছিল, বাংলা গান নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে চাইছিলেন গৌতমদা। আমি যখন ভূপাল ছেড়ে চলে আসছি, তখন আমাকে বলেছিলেন, 'তোর সঙ্গে কলকাতায় দেখা হবে, আমরা নতুন করে অন্য কিছু করব।' তখন তো জানতাম না, ওঁর কী পরিকল্পনা, শুধু ভাল লেগেছিল, মনিদা কলকাতায় ফিরে আসছেন জেনে।

তারপর ১৯৭৪ সালে কলকাতায় ফিরলেন মনিদা, ১৯৭৫-এ শুরু হলো 'মহীনের ঘোড়াগুলি'। নামটা রেখেছিলেন রঞ্জনদা, রঞ্জন ঘোষাল, মনিদা সেটাকে স্বীকৃতি দিলেন। ১৯৭৬, '৭৭, '৭৮- তিন বছরে তিনটে ভিনাইল রেকর্ড প্রকাশিত হলো আমাদের। তখন কি-বোর্ড আসত খিদিরপুর থেকে, কলকাতায় পাওয়া যেত না। 'রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে'-তে কি-বোর্ডের ব্যবহার ছিল। এক ভদ্রলোককে আমরা চিনতাম, তিনি লেক গার্ডেন্সে থাকতেন, তাঁর কাছে কি-বোর্ড পাওয়া যেত বলেই বিখ্যাত ছিলেন তিনি, বাজানোর জন্য নয়। শুধু কি-বোর্ড ভাড়া করা যেত না, নিয়ম ছিল, যাঁর কি-বোর্ড , তাঁকেও ভাড়া করতে হবে, সে কি-বোর্ডের সঙ্গে ঘুরবে! আমাদের অপেক্ষা করিয়ে রাখতেন তিনি, আমাদের ওদিকে রেকর্ডিংয়ের তাড়া। এমন নানা মজার গল্প সেই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে।

শুনতে পারেন: সংবিগ্ন পাখিকুল

মনিদা চলে যাওয়ার এতদিন পরেও মনিদা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখনও। যে গানগুলো সেসময় করেছিলাম মনিদার সঙ্গে, পরে ছাত্রদের সঙ্গেও সেই গান নিয়ে কনসার্ট করেছি। রঞ্জনদা আয়োজন করেছিলেন মনিদাকে নিয়ে একটি বিশাল কনসার্টের, 'আবার বছর তিরিশ পরে', ২০০৮ সালে হয়েছিল। ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রা হয়েছিল, প্রায় একশোজন মিউজিশিয়ান ছিলেন, পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম আমি। কলকাতার পরিচিত শিল্পীদের নিয়ে হয়েছিল অনুষ্ঠানটা। চন্দ্রবিন্দু-র অনিন্দ্য, রূপম- এরা গেয়েছিল, যীশু সেনগুপ্ত ড্রাম বাজিয়েছিল, অঞ্জন দত্ত, অন্তরা চৌধুরী, কে না গেয়েছিলেন। দেখেছিলাম, তিরিশ বছর পরেও কী ভালবাসা মানুষের মধ্যে মহীনের গান নিয়ে! অসাধারণ হয়েছিল সেই কনসার্ট। মনিদার থেকে যা শিখেছি, সবসময় সঙ্গে থাকে। মনিদার ভাবনা শুধু গান নয়, সংগীতের অন্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছিল।

সেই সময় কাগজে লেখা হয়েছিল, আমরা হনুমান, বাঁদরের মতো নেত্য করি, গান করি না। তবে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি- এই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বুঝল আমাদের গানের মাহাত্ম্য। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে গেল আমাদের গান।

শুনতে পারেন: হায় ভালবাসি 

মনিদার সঙ্গে আমি কিছু বছর যাপন করেছি। শেষ বয়স অবধি মনিদা আমার বাড়িতে এসেছেন। মনিদার ছবিগুলোতেও কাজ করেছি। আমরা একসঙ্গে বিঠোফেন শুনতাম, পাশ্চাত্য সংগীতের প্রতি অসম্ভব অনুরাগ ছিল মনিদার, যার প্রভাব রয়েছে 'হায় ভালবাসি' গানটিতে। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে আমার অনুষ্ঠান শুনতে আসতেন নিয়মিত। 'সময়' বলে একটা ছবির কথা মনে পড়ে, সেটা শেষত মুক্তি পায়নি। সেখানে আমি অভিনয়ও করেছিলাম।

'আবার বছর কুড়ি পরে'-র সময় যাঁদের দিয়ে গান গাওয়ালেন মনিদা, তাঁদের স্বতন্ত্র গানের পরিসর তৈরি হল পরে। একে একে তৈরি হল চন্দ্রবিন্দু, লক্ষ্মীছাড়া। শিলাজিৎ মনিদার খুব প্রিয় ছিল। 'মহীনের ঘোড়াগুলি' এদের সকলকে সাহস জুগিয়েছে, মনিদা সাহস দিয়েছে। এরা মনিদাকে ভালবাসে, কাজেই 'মহীনের ঘোড়াগুলি'-কেও ভালবাসে।

এখনও যখন কেউ মহীনের গানের সৌন্দর্য অনুধাবন করে, মনিদার ওপর আমাদের বিশ্বাস, আমাদের ভালবাসা জিতে যায় বারবার।

More Articles

;