'ভিনদেশি তারা' গৌতমদার জন্য গাইব ভেবে রেখেছিলাম

গৌতমদার বা মহীনের অনুষ্ঠান শুধু স্টেজেই শেষ হয়ে যেত না, তা ছড়িয়ে থাকত স্টেজের বাইরেও। এই যে উন্মাদনা, গানটাকে সঙ্গে নিয়ে সবসময় ঘুরে বেড়ানো, গৌতমদার থেকে এটা সত্যিই শেখার। 'মহীনের ঘোড়াগুলি' সবসময়ই আমাদের গানের মধ্যে মিশে থাকবে।

Anindya Chatterjee
৪ মিনিট
'ভিনদেশি তারা' গৌতমদার জন্য গাইব ভেবে রেখেছিলাম

আমি কলেজে ভর্তি হয়েছি ১৯৮৬ সালে। সেই বছরই মাধ্যমিক, সেই বছর স্কটিশচার্চ কলেজে ভর্তি হলাম। সেই সময় কলেজে ফেস্ট ছিল একটা বড় ব্যাপার, স্কটিশে হতো ক্যালিডোনিয়া। সেখানে বাইরে থেকে নানা দল আসত, নানা ধরনের গানবাজনা করত তারা। সেইরকম একটা ফেস্টেই শুনলাম, 'ভালো লাগে জ্যোৎস্নায় কাশবনে ছুটতে'। এরকম যে একটা গানের চলন হতে পারে, সেই সময় ধারণা ছিল না। 'ভালো লাগে জ্যোৎস্নায়' গাইছে একটি ছেলে, তার নাম উপল, যার সঙ্গে পরে আলাপ হবে। উপল কখনও গাইছে 'তোমাদের সন্ধ্যাগুলি', আমরা কলেজের ফয়ারে গাইতাম 'পথের প্রান্তে কোন সুদূর গাঁয়'। 'মহীনের ঘোড়াগুলি', 'নগর ফিলোমেল', রঞ্জন প্রসাদ- এদের নিয়ে একটা অন্য গানের দুনিয়া তৈরি হলো, যা আমাদের চেনা বাংলা গানের থেকে আলাদা, মনে হচ্ছে, যা আমাদের গান। আর এই মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে আমাদের আবিষ্কার শুরু।

সেই সময়টায় 'মহীনের ঘোড়াগুলি'-র রেকর্ড বা ক্যাসেট বাজারে ততটা সুলভ ছিল না। তা সত্ত্বেও বেশ কিছু গান আমরা শুনে ফেলেছিলাম। 'চৈত্রের কাফন' শুনেছি, 'ভালো লাগে জ্যোৎস্নায়' শুনেছি। তখনও 'পৃথিবীটা নাকি' তৈরি হয়নি।

এর অনেকটা পরের কথা, আমরাও তখন টুকটাক গান বানাচ্ছি, নয়ের দশক শুরু হয়ে গেছে। কবীর সুমন, নচিকেতা, অঞ্জন দত্তদের পদচারণা শুর হয়ে গেছে। আমি কলেজে পড়তে পড়তেই চাকরি পাই 'যুগান্তর' কাগজে। আমাদের সম্পাদক ছিলেন নাম করা সাংবাদিক দীপঙ্কর চক্রবর্তী, এখন আর তিনি নেই। আমাদের কালচারাল সাপ্লিমেন্টটি সম্পাদনা করতেন। দীপঙ্করদার সঙ্গে 'মহীনের ঘোড়াগুলি'-র যোগাযোগ ছিল। খুবই বাউন্ডুলে মানুষ ছিলেন দীপঙ্করদা, কখনও নবনীতাদি (দেবসেন), কখনও গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে থানা গেড়ে বসে থাকতেন। সেই সময় শুনি, দীপঙ্করদা কিছু সুর গুণগুণ করছেন। জানতে পারলাম, 'আবার বছর কুড়ি পরে' তৈরি হচ্ছে। একটা জমায়েত হতো, সন্ধের দিকে গৌতমদা আসত, ওরা সকলে মিলে মদ্যপান করতে যেত, তখন দারুণ দারুণ বার ছিল ওদিকে, 'রেখা', 'উইন্ডসর', 'গালিব', 'গালিব'-এ আবার গজল বাজত। আবার কখনও ঝামেলা করে, পুলিশের সঙ্গে মারপিট করে হয়তো ফিরে এল সবাই মিলে। এতটাই অদ্ভুত ছিল ওদের যাপন! সেই জমায়েতেই একদিন একটা লম্বামতো ছেলে এল, সুরজিৎ, সে গাইল 'আমি ডানদিকে রই না আমি বামদিকে রই', সেই প্রথম শোনা গানটা। তখনও গানটা রেকর্ড হয়নি।

শুনতে পারেন: আবার বছর কুড়ি পরে

বইমেলায় বসত গৌতমদা, তাকে ঘিরে থাকত অনেক মানুষ। এই সবের মধ্যে থাকতে থাকতে পরে আলাপ হয়ে যায় গৌতমদার সঙ্গে। গৌতমদার গানের যে আলাদা জায়গাটা সেটা সব সময় আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আর স্টেজে গান গাওয়ার যে প্রাণ, যে স্পন্দন, সেটাও গৌতমদার থেকে আমরা পেয়েছি।

'মহীনের ঘোড়াগুলি' আর 'চন্দ্রবিন্দু' একসঙ্গে অনুষ্ঠান করেছে। সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট-এর ওপেন এয়ার অডিটোরিয়াম যেদিন উদ্বোধন হয়, সেই দিনটাতে শো করেছিলাম আমরা। শুরুতে করেছিলাম আমরা। তখন আমাদের একটা অ্যালবাম বেরিয়েছে, গৌতমদা আমাদের গান শুনেছে, ভালো লেগেছে ওর। আমরাও ওর বাড়ি যেতে শিখেছি। সেই শো-টা আমাদের কাছে দুরন্ত ব্যাপার ছিল। মহীনের শো-তে হিরণ মিত্র স্টেজে ছবি এঁকেছিলেন, মনে পড়ে। গিটারে ছিল সুব্রত, গানগুলো যার লেখা, সেই জয়জিৎ লাহিড়ীও ছিল।

'আবার বছর কুড়ি পরে' ছিল সম্পাদিত অ্যালবাম। গৌতমদার গানে কখনও অনায়াসে মিশে যায় ল্যাটিন, কখনও রক। তার সঙ্গেই শিকড়টা ধরে রাখছে সেই গানগুলো। মহীনের সবচেয়ে জরুরি কাজের মধ্যে একটা হলো বাউল জ্যাজ। আমাদের খুবই অনুপ্রেরণা দিয়েছে বাউল জ্যাজ। পরে 'চন্দ্রবিন্দু'-র জন্য কীর্তন নিয়ে কিছু কাজ আমরা করেছি। সেগুলোর নেপথ্যে অবশ্যই 'মহীনের ঘোড়াগুলি'-র অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। সে 'রিক্সাওয়ালা' হোক, 'বসন্ত দিনে' হোক বা 'আমরা বাঙালি জাতি' হোক।

পারফরমার হিসেবে গৌতমদার থেকে অনেক কিছু শেখা। গৌতমদার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, গৌতমদার গোটা জীবন ছিল গান নিয়ে। মহীন আর চন্দ্রবিন্দু-র যৌথ শো-টার কথাই যদি বলি, ওই অনুষ্ঠানটা চলাকালীন পাওয়ার অফ হয়ে যায়। গৌতমদা গান থামায়নি। একসময় অনুষ্ঠানটা শেষ হয়, শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমরা আবার একটা দল মিলে একটা জায়গায় বসে গান গাওয়া শুরু করলাম। আমরা গৌতমদাকে আর্জি করলাম, 'এই গানটা গাও, ওইটা গাওয়া হয়নি', এর সঙ্গে একটা নেশার পরিসরও ছিল, এই করতে করতে ভোর হয়ে এল।

ফলে গৌতমদার বা মহীনের অনুষ্ঠান শুধু স্টেজেই শেষ হয়ে যেত না, তা ছড়িয়ে থাকত স্টেজের বাইরেও। এই যে উন্মাদনা, গানটাকে সঙ্গে নিয়ে সবসময় ঘুরে বেড়ানো, গৌতমদার থেকে এটা সত্যিই শেখার। 'মহীনের ঘোড়াগুলি' সবসময়ই আমাদের গানের মধ্যে মিশে থাকবে।

শুনতে পারেন: ভিনদেশি তারা

একটা ঘটনা বলে শেষ করি। গৌতমদা যেদিন মারা যান, সেদিন আমরা 'ত্বকের যত্ন নিন'-এর ডেমো ক্যাসেট করছিলাম। রেকর্ডিং চলছিল সল্টলেকের অনেকটা ভেতরে। ফলে আমরা শ্মশানে পৌঁছতে পারিনি। আর তখন চটজলদি দক্ষিণে যাওয়াও যেত না। সেই নিয়ে আমাদের একটা খারাপ লাগা ছিল আমাদের। এর পরবর্তী সময় দশ-বারোটা স্মরণসভায় আমরা গান গেয়েছি। আমাদেরই একজন পয়গম্বর মানুষ ছিলেন গৌতমদা, সেই কারণে গান গাইতে ছুটতাম বারবার। এমনই একটা অনুষ্ঠান চলছিল শিশির মঞ্চে। সেই সময় 'ভিনদেশি তারা' গানটা বানিয়ে ফেলেছি, গাইব কি না বুঝতে পারছি না। ঠিক করলাম, গৌতমদাকে ডেডিকেট করে এই স্মরণসভায় গানটা গাইব। কিন্তু শিশির মঞ্চের সেই অনুষ্ঠানে গানটা সেদিন গাওয়া হয়নি, কারণ যাঁর পরে আমার গাওয়ার কথা, তিনি গেয়ে চলেছিলেন। এই সময় শিশির মঞ্চে এত লোক হয়, যে বাইরের কাচের দেওয়ালটা ভেঙে পড়ে। আমি গৌতমদার জন্য যে গানটা রিহার্সাল করে গাইব বলে ভেবেছিলাম, সেদিন সেই না-গাওয়া গানটা, 'ভিনদেশি তারা' রয়ে গিয়েছিল।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?