'বাবার চিত্রনাট্য পাওয়া গেলে বোঝা যেত, ছবির সঙ্গে তার কত অমিল': কথাবার্তায় কুণাল সেন

নিজে কাজ করেন ডিজিটাল সংরক্ষণ নিয়ে। বাবা মৃণাল সেনের যাবতীয় কাজের যেটুকু নথি বেঁচে, তা তিনি সংরক্ষণ করছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে‌। সংরক্ষণ, বাবার চলচ্চিত্রভাবনা নিয়ে ইনস্ক্রিপ্ট-এর সঙ্গে কথোপকথনে কুণাল সেন

 

 

আপনি মৃণাল সেনের কাজের সংরক্ষণ করলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে সংরক্ষণ কেন সম্ভব হল না?

কুণাল সেন: আমি তো এখানে কোনও সংগঠন খুঁজে পাইনি, যারা এই ধরনের জিনিস সংরক্ষণ করতে জানে। করতে চাওয়া আর করতে জানা, দুটোর মধ্যে তো তফাৎ আছে। পুরনো কাগজপত্র তো কেবল আলমারিতে বন্ধ করে রাখলে হয় না, তার আর্কাইভিংয়ের নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। এরম একটা সংগঠনই আছে, মুম্বইতে, ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। সংরক্ষণ যেভাবে করতে হয়, তারা সেভাবেই করে। তাদের কাছে কিছু জিনিস আছে। বাকিগুলো নিয়ে আমার মনে হয়েছিল, যে সংগঠন থেকে যাবে, তাদের জিম্মায় থাকুক। আমরা যখন থাকব না, তখন কে দায়িত্ব নেবে এই কাজগুলোর? আজ থেকে বেশ কিছু বছর পরে বাবার কাজ নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছে কারও থাকবে কি না আমি জানি না। কিন্তু যদি থাকে, আমার মনে হয়, সেই কাজের পরিসরটা তৈরি করে রাখা উচিত। এক্ষেত্রে সেটা সম্ভব বলেই আমি মনে করেছি।

 

মৃণাল সেনের কী কী ধরনের কাজ সংরক্ষিত হয়েছে ওখানে?

কুণাল সেন: খুবই সামান্য। বাবা তো কাগজপত্র কিছুই রেখে যাননি। যে সমস্ত বিষয়ে মানুষের আগ্রহ, যেগুলো কাজে লাগতে পারত, যেমন, চিত্রনাট্য, বা নিজের লেখাপত্র বা চিঠিপত্র, এসব কিছুই নেই, একটাও না। যখন বাড়ি পাল্টাচ্ছিলেন, তখন সব নিজেই ফেলে দিয়েছিলেন। কাগজ বাছাবাছি করতে হবে আবার, সেকথা ভেবে নিজেই ফেলে দিয়েছেন। ফলে, কাগজপত্র বিশেষ ছিল না। আমার কাছে বেশ কিছু ফোটোগ্রাফ ছিল, পুরনো ফোটোগ্রাফিক প্রিন্ট, সেগুলো আছে। তার মধ্যে কিছুটা ছবি সংক্রান্ত, কিছুটা ব্যক্তিগত। এছাড়া আমাকে লেখা চিঠি... ওভাবে কিছু বেঁচেছে। তাছাড়া ওঁর অ্যাওয়ার্ডগুলোর মধ্যে কিছুটা আছে মুম্বইয়ের ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের কাছে, বাকিটা শিকাগোতে। সত্যি বলতে গেলে, গবেষণার জন্য যেরম জিনিস পেলে লোকে খুশি হয়, তেমন কিছুই নেই। আর কিছু আছে, বিভিন্ন সময়ে কিছু ছবির আইডিয়া হয়তো ওঁর এসেছে, যেগুলো ছবি হয়নি কোনওদিন, আমাকে সেগুলো লিখেছেন, সেগুলো আছে শিকাগোতে।

 

কী ধরনের ছবির ভাবনা ভেবেছিলেন?

কুণাল সেন: যেমন একবার একটা ছবি করার কথা ছিল, লেখকের নামটা ভুলে যাচ্ছি, ছবিটার নাম ছিল 'ভুবনেশ্বরী'। একটা বড় পরিবার, তাদের মা, মানে পারিবারিক মা, সে মারা যাওয়ায় তার স্মৃতিচারণের জন্য সকলে এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। কিন্তু করতে গিয়ে যেটা হয়, একটা মিথ ভেঙে যায়। মানে ওই পরিবারের মধ্যে ওকে ঘিরে একটা মিথিক্যাল অবস্থান ছিল, যেটা হয়তো সত্যি নয়। এরম একটা ছবির কথা ভেবেছিলেন, মিথ ভাঙা নিয়ে। আরেকবার বেশ কিছুটা পড়াশোনা করেছিলেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার নিয়ে।

 

এটা কোন সময়?

কুণাল সেন: এই সবই হচ্ছে ১৯৯০ থেকে ২০১০- এই কুড়ি বছরের মধ্যে।

 

ওঁর 'পুনশ্চ', 'অবশেষে' পাওয়া যায় না। ওঁর তথ্যচিত্র 'ক্যালকাটা ক্যালকাটা মাই এলডোরাডো'-র খোঁজ নেই। টেলিভিশনের জন্য ওঁর করা 'কভি দূর কভি পাস' আপনিই আপলোড করেছিলেন। ওঁর এই না-পাওয়া ছবিগুলো পাওয়ার কোনও সূত্র আছে?

কুণাল সেন: আমি শুনেছি, 'পুনশ্চ' নাকি পুনের ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভে আছে। বাকিগুলো যেগুলো গেছে, সেগুলো আর পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

 

শেষ প্রশ্ন, আপনি এর আগেও বলেছেন, সংরক্ষণের মন মৃণাল সেনের ছিল না, কোনও কাজ রাখতে চাইতেন না নিজের। এই মানসিকতার নেপথ্যে কী কারণ বলে আপনার মনে হয়?

কুণাল সেন: ওঁর চরিত্রে কোনওদিনই নস্টালজিয়া বা পুরনো জিনিসের প্রতি যে আকর্ষণ, সেটা ছিল না। আর দ্বিতীয়ত, ছবির ব্যাপারেও আমি দেখেছি, যখন যে ছবিটা করছেন, সদ্য সদ্য, সেটার প্রতি ওঁর একটা আকর্ষণ ছিল, ভালো লাগা ছিল। কিন্তু ছবিগুলো পুরনো হয়ে গেলেই, নিজেই খুব ক্রিটিকাল হতেন, সবসময় বলতেন, এই ছবিটা যদি আরেকবার করতে পারতাম, ভালো হত। ড্রেস রিহার্সাল হল কেবল। ফলে, হয়ে যাওয়া কাজ নিয়ে ওঁর খুব একটা আগ্রহ ছিল না। আর তিন নম্বর কারণটা হচ্ছে, গাফিলতি। বাবার সব কাগজপত্র জমতে থাকত, কোনওদিনই খুব একটা গোছানো লোক ছিলেন না। মা (গীতা সেন) যখন একটু চেঁচামেচি করত, এত কাগজ জমেছে বলে, যার মধ্যে বেশিরভাগই অকাজের কাগজ, তখন হয়তো সেগুলোকে বান্ডিল করে দড়ি বেঁধে একটা খাটের তলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হল। এভাবে সারাজীবন চলেছে। এবার যখন বাড়ি পাল্টানোর সময় এল, তখন তো একটু বাছবিচার করতে হয়। অর্গানাইজড না থাকলে সেটা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তখন বেশিরভাগ জিনিস ফেলে দেওয়া হয়েছে। খুব ইচ্ছে করে যে সেটা করেছেন, এটা আমার স্ক্রিপ্ট, আমি ফেলে দিচ্ছি- এই ভেবে, এমনও নয়। আবার বাছতে হবে ভেবেই ফেলে দেওয়া সেগুলো।

 

আমার কাছে যেটা খুব আক্ষেপের, সেটা বলি। খুব সম্প্রতি আমি একটা কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, 'গুপী গাইন বাঘা বাইন'-এর যে ডিটেলড খেরোর খাতা, তার ডিজিটাইজেশনের একটা প্রোজেক্ট হয়েছিল। সেটা করতে গিয়ে যেটা নিয়ে খুব অবাক লাগছিল যে, ওঁর ক্রিয়েটিভ প্রসেসটা কতটা ডিটেলড, ওঁর আঁকা ছবির সঙ্গে, লেখার সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। এই মিলে যাওয়ার যেমন একটা আকর্ষণ আছে, তেমন বাবার চিত্রনাট্য পাওয়া গেলে দেখা যেত, কোথায় কোথায় মেলে না। বাবার ছবি বানানোর পদ্ধতি যেহেতু খুব ডায়নামিক ছিল, তাই চিত্রনাট্যের সঙ্গে ছবির তফাৎ হয়ে যেত, সেটা দেখতে পেলে ভালো লাগত। বাজারে যে চিত্রনাট্যগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো ছবি দেখে তৈরি করা, তার সঙ্গে আসল চিত্রনাট্যের কোনও মিল নেই। আসল চিত্রনাট্যগুলো কিছুই আর নেই।

 

More Articles

;