'মেঘে ঢাকা তারা'-র শেষ নিয়ে আপত্তি ছিল মৃণাল সেনের

একটা পর্যায়ে মৃণাল সেন যখন বলছেন, "নিজের দিকে ক্যামেরা ঘোরালাম", সেখানে নিজেকেই প্রায় কাটাছেঁড়া করার একটা প্রক্রিয়া শুরু হল।

Suman Mukhopadhyay
৪ মিনিট
'মেঘে ঢাকা তারা'-র শেষ নিয়ে আপত্তি ছিল মৃণাল সেনের

মৃণাল সেন সবসময়ই আমার খুব পছন্দের চলচ্চিত্রকার। সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল-মৃণাল, ওই প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে তো এই তিনজনের নামই করা হয়। এঁদের মধ্যে মৃণাল সেন কোথায় স্বতন্ত্র বলে আমার মনে হয়, সেটা একটু বলি। চলচ্চিত্রকাররা দর্শকমনকে নাড়া দেন দু'ভাবে। এক হল, বিষয়গত জায়গা থেকে। দ্বিতীয়ত, চলচ্চিত্রের ভাষার নিরিখে। চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে একজন পরিচালক কী পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন, এমন কী ভাষ্য তৈরি করছেন, যা তাঁর একান্তই নিজের, সেটাই তাঁর শৈল্পিক উৎকর্ষের অভিজ্ঞান। লক্ষ করে দেখলে দেখা যাবে, সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল- এই তিন মহান চলচ্চিত্র পরিচালকেরই নিজস্ব ঘরানা আছে। তার সঙ্গে অবশ্যই জুড়ে যায় তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, সমাজগত বীক্ষা ও দায়বদ্ধতা, সময় ও মানুষকে ধরার চেষ্টা। কিন্তু আমরা যখন আন্তর্জাতিক পরিচালকদের নিয়ে কথা বলি, আব্বাস কিয়েরোস্তামি হোক, মাইকেল হ্যানেকে হোক, বা ইউরোপীয় বা মার্কিন ঘরানার পরিচালক যাঁরা- দেখতে পাই, তাঁদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা রয়েছে। সেই ভাষার উন্মেষ চলচ্চিত্রকে সামগ্রিকভাবে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যায়। মৃণাল সেনেরও তেমন একটা নিজস্ব চলচ্চিত্রভঙ্গি ছিল, তার সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতাও ছিল। দুটো একসঙ্গে জড়িয়ে একটা নতুন ধারা ভারতীয় চলচ্চিত্রে এনেছিল বলে আমার মনে হয়।

যেখানে মৃণাল সেনকে আমার অভিনব লাগে, এই ধারাটার বিবর্তনও ঘটিয়েছিলেন তিনি। প্রথমদিকে একভাবে ছবি বানাতেন, পরের দিকে সেই আঙ্গিকটা পালটে ফেললেন। কারণ তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক পাঠগুলো বদলাতে থাকে। শিল্পী যে জীবিত, এটাই তার সর্বোত্তম প্রমাণ। সে সারাক্ষণ তার নিজের মাধ্যমটাকে নিয়ে ভাঙাগড়া চালিয়ে যাচ্ছে, তার সমাজকে দেখার চোখ পাল্টাচ্ছে, ইতিহাসের পাঠ বদলাচ্ছে, মতবাদ পাল্টাচ্ছে- এটাই তো শিল্পীর বেঁচে থাকার মার্গ। তাই একটা পর্যায়ে মৃণাল সেন যখন বলছেন, "নিজের দিকে ক্যামেরা ঘোরালাম", সেখানে নিজেকেই প্রায় কাটাছেঁড়া করার একটা প্রক্রিয়া শুরু হল। অর্থাৎ, যেসময় তিনি 'একদিন প্রতিদিন', 'খারিজ' বা 'আকালের সন্ধানে' বানাচ্ছেন, সেই সময় থেকেই এই বদলটার শুরু। ওঁর প্রথমদিকের ছবি, বলা চলে, অনেকটা ডাইড্যাক্টিক। নিজস্ব একটা ফর্ম ছিল সেই ছবির, নির্দিষ্ট রাজনীতিও ছিল। তখন অনেকগুলো ইনফ্লুয়েন্সও কাজ করেছিল ওঁর, যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের সিনেমার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। জিগা ভার্তভের কথা বলতেন। সেই ধাঁচটা পাল্টে ফেললেন পরে।

আমার সঙ্গে ওঁর একটা অদ্ভুত ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। সেটা খুবই ইন্টারেস্টিং। বাবা (অরুণ মুখোপাধ্যায়) যেহেতু ওঁর 'পরশুরাম'-এ প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, সেই সূত্রে মৃণাল সেনের আমাদের বাড়িতে আসা। শেষের দিকে মৃণালদার সঙ্গে আমার অনেক কথা হত ফোনে। আমার নাটক 'তিস্তাপারের বৃত্তান্ত' দেখেছিলেন ২০০০ সালে। তারপর কথাবার্তা বাড়তে শুরু করল। নানা বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। আমার ছবি দেখে তাই নিয়ে কথা বলেছেন, থিয়েটার নিয়েও কথা বলেছেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও কথা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ কথা হয়েছে মৃণালদার সঙ্গে। সেগুলো আমাকে খুবই ঋদ্ধ করেছে।

একটা খুবই আগ্রহব্যঞ্জক কথা হয়েছিল আমার সঙ্গে, সেটা একটু বলি। ঋত্বিক ঘটকের ছবি নিয়ে ওঁর নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ ছিল। 'মেঘে ঢাকা তারা'-র শেষ অংশটা নিয়ে কথা হয়েছিল একবার। সেই বিখ্যাত দৃশ্য, যেখানে নীতার ভূমিকায় সুপ্রিয়া চৌধুরী, শঙ্করের চরিত্রাভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, 'দাদা, আমি যে সত্যি সত্যি বাঁচতে চেয়েছিলাম', পাহাড়ের ওপর ক্যামেরা প্যান করছে- সেই অংশটা নিয়ে ওঁর একটা জোরালো যুক্তি ছিল। উনি বলেছিলেন, শঙ্কর, নীতার ভাই, যে নিজে একজন শিল্পী, সে এসে খবর দেয় নীতাকে, যে নীতার প্রাক্তন প্রেমিক ও নীতার বোনের বিয়ে হয়েছে, ওদের একটা সন্তান হয়েছে, ওরা সুখে আছে। এখন, একজন অনুভূতিপ্রবণ মানুষ, যার সূক্ষ্ম বোধ আছে, সে জানে তার বোন অসুস্থ, তাকে নানা মানসিক সমস্যার জন্য একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখা হয়েছে, সে বাড়ি থেকে দূরে আছে- তাকে কি এই খবরটা দেওয়া উচিত ছিল? সে জানে, কেন নীতা এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, সে একজন শিল্পী মনের মানুষ, সে কেন এই যন্ত্রণার কথা স্মরণ করাবে? শেষের দৃশ্যের কান্না ও চিৎকারের জন্যই কি ওই কথাটা বলালেন ঋত্বিক? এটা মৃণাল সেনের প্রশ্ন ছিল, ওঁর মনে হয়েছিল, চরিত্রের সঙ্গে যায় না এই আচরণটা। এই ক্রিটিকটা ওঁর ছিল।

ওঁর নিজের মতামতও পাল্টেছে। উনি বামপন্থী বলতেন নিজেকে খোলাখুলি। একটা সময় বললেন, 'বামপন্থীরা আমাকে আর নাড়া দেয় না', সম্ভবত বিদেশে। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় সেই উক্তিটা বেরল, খুব শোরগোলও হয়েছিল তাই নিয়ে সেসময়। ফলে ওঁর মনন, আদর্শ, পাঠ পাল্টেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছবিও পাল্টে গেছে। ওঁর পাণ্ডিত্য ছিল বহুমাত্রিক। কখন কী বই পড়ছেন, তাই নিয়েও কথা হত আমাদের। মৃণাল সেন নিয়ম করে রাত ন'টার খবর শুনতেন। খুব সচেতন ছিলেন সমাজ ও সময় নিয়ে। এইসব কারণেই ওঁর ছবিরও একটা গভীর প্রভাব আমার ওপর পড়েছে। সাম্প্রতিককালে আমার ছেলেকে আমি 'পদাতিক' দেখালাম। আমার ছেলে নিখিলেশের পনেরো-ষোলো বছর বয়স, সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের ছবিও ও দেখেছে। 'পদাতিক' ওঁর খুব ভালো লেগেছে। এই প্রজন্মের ছেলে, যে নেটফ্লিক্স দেখছে, যার কাছে বিশ্ব সিনেমা এক্সপোজড, তার কাছেও মৃণাল সেনের আবেদন রয়েছে। আমিও ফিরে ফিরে দেখি ওঁর ছবি। 'আকালের সন্ধানে' দেখলাম কয়েকদিন আগে। ওঁর ক্রাফটের ওপর একটা দক্ষতা তো ছিলই, কিন্তু সিনেমার নিজস্ব ভাষা নির্মাণেও মৃণাল সেন অনন্য।

(কথোপকথনের ভিত্তিতে অনুলিখিত)

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

জেলের ৭১৬ দিন: কী পড়তেন, কী ভাবতেন, কীভাবে লড়তেন ভগৎ সিং?

Bhagat Singh jail life: জেলখানায় ভগৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল বই। দ্বারকাদাস লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান শাস্ত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলের ভিতর বই পাচার করতেন। এই ৭১৬ দিনে তিনি প্রায় ৩০০-র বেশি বই পড়েছেন ভগৎ সিংহ।

টাকার বিনিময়ে বিজেপি-র প্রচার করেছেন সায়ক! আর আইনি জালে জড়ালেন অলিপাবের নিরীহ কর্মী

Sayak Chakraborty Olypub controversy: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের মোট খরচ ছিল ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা। সেই প্রচারের একটি অংশ ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।