'ভূত'কে খুন করার অপরাধে আদালতে মামলা! ভারতের বিচিত্রতম শুনানির নেপথ্যে ছিল যে সত্য...

Murder of 'Ghost': রামবাহাদুর সবার আগে ছুটে যায়। ছুটতে ছুটতেই কোমর থেকে বার করে ফেলে কুকরি এবং হাওয়ায় ঘোরাতে থাকে সেটি।

Arunava Nag Roy
৪ মিনিট
'ভূত'কে খুন করার অপরাধে আদালতে মামলা! ভারতের বিচিত্রতম শুনানির নেপথ্যে ছিল যে সত্য...

ভারতের সংবিধানে যে মৌলিক কর্তব্যগুলির কথা উল্লেখ করা রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার কথা। ভারতের সংবিধানে লেখা রয়েছে, বৈজ্ঞানিক চিন্তন, মানবিকতা এবং কৌতূহলের প্রসার বাড়ানো প্রত্যেক ভারতীয়র কর্তব্য। তবুও ভারতে বিজ্ঞানের পথে চিন্তাভাবনা করা মানুষের অভাব রয়েছে। নেতা থেকে অভিনেতা, ব্যবসায়ী থেকে খেলোয়াড়- সব তাবড় বিখ্যাত মানুষদের অনেককেই বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার মানতে দেখা যায়। কুসংস্কারে অর্থাৎ 'কালাজাদু’, ভূত-প্রেত, টোটকা প্রভৃতিতে বিশ্বাস করেন অনেকেই। আজও সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ কালো বিড়ালের সামনে দিয়ে যাওয়া, হাঁচি দেওয়া, গায়ে টিকটিকি পড়া প্রভৃতিকে অশুভ মনে করেন। অনেকে আবার যুক্তি দেন, যারা যা মানতে চাইছে তাদের মানতে দিলে অসুবিধা কোথায়? যে যার বিশ্বাস নিয়ে বাঁচলে সমাজের তো কোনও ক্ষতি হচ্ছে না, তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা যে কোথায়, কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাস যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তারই একটি উদাহরণ এই ঘটনা।

সাল ১৯৫৮। ওড়িশার বালেশ্বরের কাছে একটি ছোট্ট গ্রাম রসগোবিন্দপুর। রসগোবিন্দপুরে একটি ছোট অকেজো এয়ারপোর্ট ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি করা হলেও বর্তমানে আর কাজে লাগে না সেটি। খালি বিমানবন্দরে যাতে কোনও অসামাজিক কাজ কর্ম না হয়, সেইজন্য দু'জন দারোগা নিয়োগ করেছিল ওড়িশা সরকার। এই সময় কলকাতার ডাকসাইটে ব্যবসায়ী জগবন্ধু চট্টোপাধ্যায় আসেন রসগোবিন্দপুরে। তাঁর সঙ্গে আসেন তাঁর চাকর রামবাহাদুর থাপা। জগবন্ধু চট্টোপাধ্যায় ওই বিমানবন্দরটি কিনতে চাইছিলেন, কিন্তু কিছুতেই সুবিধা করতে পারছিলেন না। ফলত কয়েক মাস রসগোবিন্দপুরেই থেকে যেতে হয় তাঁকে। এয়ারপোর্টের দুই ধারে বসতি ছিল সাঁওতাল এবং মাঝি সম্প্রদায়ের মানুষদের। ২০ মে ১৯৫৮, রাতে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলেন জগবন্ধু এবং রামবাহাদুর। কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন চন্দ্র মাঝি নামের এক ব্যক্তি। দোকানে চা খেতে খেতে তিনি দোকানিকে বলেন, আজ তার বাড়ি ফেরা হবে না। হবে না কারণ, তার বাড়ি যেতে পড়ে সেই বিমানবন্দরটি। রাত্রিবেলা সেখানে ভূতের উপদ্রব আছে। সুতরাং আজকের রাতটা এখানেই কোথাও কাটিয়ে, পরদিন সকালে বাড়ি ফিরতে হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গুয়াহাটির জঙ্গলে ভূতের নাচ! সরাইঘাটের যুদ্ধে যেভাবে মুঘলদের হারিয়েছিল অহমরা

Battle of Saraighat: রাম সিংহ লছিতকে একটি চিঠিতে তিনি অনুরোধ করেন গেরিলা যুদ্ধ বন্ধ করতে। জবাবে লছিত বোরফুকন লেখেন, “ভুলবেন না, সিংহরা রাত্রেই লড়াই করে”।

রসগোবিন্দপুর বিমানবন্দর

ভূতের কথা শুনেই উৎসাহী জগবন্ধু বলে বসেন, তিনি ভূত দেখতে চান। চন্দ্র মাঝি তো কিছুতেই রাজি হবেন না। অবশেষে কিছু টাকার বিনিময়ে চন্দ্র মাঝিকে রাজি করানো গেল। ঠিক হলো রাত আরেকটু বাড়লে, জগবন্ধু চট্টোপাধ্যায়, রামবাহাদুর, চন্দ্র মাঝি এবং ওই চায়ের দোকানি কৃষ্ণচন্দ্র মিলে যাবেন এয়ারপোর্টে ভূত দেখতে। চারজন যখন বিমানবন্দরের থেকে ৩০০ মিটার দূরে ছিলেন, তখন একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান জগবন্ধু। বিমানবন্দরের দিক থেকে একটি হলদে আলো দেখা যাচ্ছে, হাওয়া প্রচণ্ড বেগে বইছে। ফলত দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে আলোগুলি নাচছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই আলোর মধ্যে কয়েকটি ছায়ামূর্তি দেখা যায়। চারজনেই ছুট লাগান সেই আলোর দিকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাচ্চারা কাঁপত সেই 'ভূত' দেখে! কলকাতায় এককালে চালু ছিল এইসব আজব খেলা

Ancient Kolkata: হরেকরকমের আশ্চর্য সব 'খেলা'-য় মজে থাকত কলকাত্তাইয়া বাঙালি। সেসব খেলার অস্তিত্ব আজ প্রায় নেই বললেই চলে, এমনকী, 'খেলা' বলতে যে কী ধরনের আজব প্রদর্শনী বোঝাত, আজকের বাঙালি সেই ধারণাও করতে পারবে না।

রামবাহাদুর সবার আগে ছুটে যায়। ছুটতে ছুটতেই কোমর থেকে বার করে ফেলে কুকরি এবং হাওয়ায় ঘোরাতে থাকে সেটি। ভয়ের চোটে আশেপাশে কিছু না দেখেই এলোপাথাড়ি কুকরি চালাতে শুরু করে রামবাহাদুর। রামবাহাদুরের কুকরির ঠেলায় ঘায়েল হয়ে যান পিছনে ছুটে আসা কৃষ্ণচন্দ্রও। বাকিদের গলার আওয়াজে রামবাহাদুর থামলে দেখা যায় এয়ারপোর্টের ওই প্রান্ত থেকেও ছুটে আসছে মানুষ। কিছুক্ষণ পর সবটা পরিষ্কার হয়। যে হলদে আলো দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল সেটি আসলে ছিল মশালের আলো। রামবাহাদুর যাদের ভুত ভেবে কুকরি দিয়ে আঘাত করেছিল তারা আসলে নিকটবর্তী গ্রামের কয়েকজন মহিলা। তারা রাতের অন্ধকারে এসেছিল মহুয়ার ফুল তুলতে। রামবাহাদুরের কুকরির আঘাতে একজন মহিলা ওখানেই মারা যান এবং দু'জন মহিলা গুরুতর আহত হন। ভূত-ভূত বলে প্রচার করার ফলে, এক ভয়াবহ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়। একজন সুস্থ-সবল মহিলা বেঘোরে প্রাণ হারান।

ভারতীয় আইনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এই ঘটনাটি একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। ওই ঘটনা ঘটার পর তৎক্ষণাৎ সেখানে পুলিশ আসে। খুন এবং খুন করার প্রচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় রামবাহাদুরকে। এরপর মামলা ওঠে আদালতে। কয়েক মাস শুনানি চলে এবং বেকসুর খালাস করে দেওয়া হয় রামবাহাদুরকে। সাক্ষী এবং রামবাহাদুরের নিজের স্বীকারোক্তি সত্ত্বেও মুক্তি দেওয়া হয় তাকে। কেন? এটি বোঝার জন্য আইনের একটি নীতি সম্বন্ধে জানতে হবে। পৃথিবীর সব দেশের আইনেই একটি কথা বলা আছে, ‘Ignorerntia facti excusat, ignorantia juris non excusat’। এর অর্থ হল- তথ্য না জেনে কেউ কোনও ভুল করলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া যায়, কিন্তু আইন না জেনে কেউ অপরাধ করলে তার কোনও ক্ষমা নেই। একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। ধরুন, আপনি কোন দেশে গেছেন যেখানে ইঁদুরকে খুব পবিত্র বলে মানা হয়। কিন্তু আপনি না জেনেই একটি ইঁদুর মেরেছেন এবং আপনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আপনি যথারীতি আদালতে গিয়ে বললেন, “আমি জানতাম না ইঁদুর মারা বেআইনি”। এক্ষেত্রে আপনি আইন না জানার অপরাধ করেছেন। ফলত আপনার শাস্তি অনিবার্য। তবে আপনি যদি কোর্টে গিয়ে বলেন, “আমি জানতাম না যে ইঁদুরকে এই দেশে পবিত্র বলে মানা হয়। জানলে আমি কখনই মারতাম না,” এক্ষেত্রে আপনার শাস্তি মকুব হয়ে যেতে পারে। কারণ আপনি একটি অপরাধ করেছেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে তথ্য না থাকার কারণে। ভারতে আইপিসির ৭৯ নম্বর ধারায় এর উল্লেখ আছে।

রামবাহাদুরের ক্ষেত্রেও এই একই জিনিস প্রযোজ্য হয়। রামবাহাদুর থাপা জানত না যে ওই আলোর মধ্যে কোনও মানুষ আছে। সে তো ভূত ভেবে কুকরি চালিয়েছিল, কোনও মানুষকে মারার জন্য তো কুকরি চালায়নি। এক্ষেত্রে যে অপরাধটি হয়েছে, তা ভুল তথ্যের কারণে হয়েছে। এই মামলার শুনানি চলাকালীন ছয় বছর পুরনো অর্থাৎ ১৯৫২-র একটি ঘটনার উল্লেখ টেনে আনা হয়। চিরঞ্জি এবং তার ছেলে জঙ্গলে গিয়েছিল পাতা কুড়ানোর জন্য। চিরঞ্জি পা পিছলে পড়ে যান এবং তার মাথায় চোট লাগে। মাথায় চোট লেগে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে তিনি তার ছেলেকে হত্যা করেন। আদালতে গিয়ে জানা যায়, পাথরে চোট লাগার কারণে মতিভ্রম হয়েছিল চিরঞ্জির। সে নিজের ছেলের জায়গায় বাঘ দেখে। তাই বাঘকে মেরে দেয় সে। কিন্তু আসলে বাঘ ভেবে নিজের ছেলেকেই মেরেছিল চিরঞ্জি। আদালত রায় জানায়, সঠিক তথ্য না থাকার কারণে চিরঞ্জি অপরাধ করে ফেলেছে। তাই সে ক্ষমার যোগ্য। এই একই যুক্তি খাটে রামবাহাদুরের ক্ষেত্রেও। তাই খুন করা সত্ত্বেও বেকসুর খালাস হয়ে যায় রামবাহাদুর।

লিখেছেন
Arunava Nag Roy
Arunava Nag Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।