বহু সরকারের ঘুম উড়িয়ে এখন নিজেই চিরঘুমে, কে এই মাওবাদী নেতা সন্দীপ

গত কয়েক বছরে সংগঠনের সঙ্গে সন্দীপের মতভেদের খবরও উঠে আসছিল।

pampii adhikari
৪ মিনিট
বহু সরকারের ঘুম উড়িয়ে এখন নিজেই চিরঘুমে, কে এই মাওবাদী নেতা সন্দীপ

জঙ্গলমহলে নতুন করে মাওবাদী সক্রিয়তা বাড়ছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে বাংলায়। তার মধ্যেই বিহারে রহস্যমৃত্যু শীর্ষ মাওবাদী নেতা সন্দীপ যাদব ওরফে বিজয় যাদবের। বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্ধ্রপ্রদেশ- এই ছয় রাজ্যে মাওবাদী কার্যকলাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। সব মিলিয়ে ৫০০-র বেশি মামলায় নাম রয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র বিহারেই সন্দীপের বিরুদ্ধে ১০০-র বেশি মামলা দায়ের হয়। বাংলাতেও একাধিক ফৌজদারি মামলাও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশের খাতায় নাম ছিল। মাথার দাম রাখা হয়েছিল ৮৪ লক্ষ টাকা।

২৫ মে বিহারের গয়া জেলায় ৫৫ বছর বয়সি সন্দীপের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। মাওবাদী-অধ্যুষিত গয়া জেলার বাঁকে বাজার থানা এলাকার অন্তর্গত বাবুরাম ডিহি গ্রাম সংলগ্ন লুটুয়া জঙ্গল থেকে সন্দীপের মৃতদেহটি উদ্ধার হয় ওইদিন সন্ধেবেলা। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সিআরপিএফ-এর বাহিনী মৃতদেহটি উদ্ধার করে। সেটি সন্দীপেরই দেহ বলে একদিন পর নিশ্চিত হয় পুলিশ। সন্দীপের বাবা রামদেব যাদব এবং ছেলে সোনু কুমার বাবার দেহ শনাক্ত করেন। সন্দীপের দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে গয়ার অনুগ্রহ নারায়ণ মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। কড়া নিরাপত্তায় ময়নাতদন্ত চলাকালীন আগাগোড়া সেই পর্ব ভিডিও রেকর্ডিং করে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন।

পুলিশ জানিয়েছে, মৃতদেহটি মাওবাদী নেতা সন্দীপেরই কি না, তা নিয়ে প্রথমে ধন্দ ছিল। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো সন্দীপের বয়সকালের কোনও ছবি ছিল না, যা দিয়ে তাঁকে শনাক্ত করা যায়। তাই মৃতদেহ উদ্ধারের পর কয়েক ঘণ্টা তাঁকে শনাক্ত করার চেষ্টাতেই অতিবাহিত হয়ে যায়। কোনও উপায় না দেখে, পুলিশকে মাওবাদী কার্যকলাপ সংক্রান্ত গোপন খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজে লিপ্ত লোকজনকেও ডাকা হয় দেহ শনাক্ত করার জন্য। তারপর খবর দেওয়া তাঁর পরিবারকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জেলে কেরানির কাজ করবেন সিধু, লালু থেকে চিদম্বরম – কেমন ছিল জেলকুঠুরির জীবন

তবে শুধু সিধুই নয়, এর আগে দেশের বহু গণ্যমান্য রাজনৈতিক নেতাই জেলকুঠুরির ভিতর জীবন কাটিয়েছেন। ঘটেছে বহু নাটকীয় ঘটনা।

তবে কীভাবে সন্দীপের মৃত্যু হল, তা নিয়ে রহস্য রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, গুরুতর অসুস্থ ছিলেন সন্দীপ। সেই সূত্রেই কোনও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ পুলিশের। যদিও স্থানীয়দের দাবি, যাঁর নামে নকশাল এলাকায় একসময় বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খেত, সেই সন্দীপের মৃতদেহটি উদ্ধারের সময় মুখে, হাতে, পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সন্দীপের ছেলে সোনু জানিয়েছেন, বাবা সংক্রমিত হয়েছিলেন বলে আশঙ্কা তাঁর। কী ধরনের সংক্রমণ জানতে চাইলে সোনু জানান, রাসায়নিক সংক্রমণ বলেই মনে হয়েছে তাঁর।

বাবার অসুস্থতার কোনও খবরই তাঁদের কাছে ছিল না বলে জানিয়েছেন সোনু। তিনি জানিয়েছেন, শেষ বার ২০১৩-’১৪ সালে বাবার সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। তার পর আর কোনও যোগাযোগ ছিল না। একেবারে পুলিশের কাছ থেকে মৃত্যুর খবরই পান। সেই মতো তদন্তে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন।পুলিশের দাবি, ময়নাতদন্তেররিপোর্ট এই মাওবাদী নেতার মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। তবে বছর কয়েক আগে সংগঠনের একাংশের সঙ্গে সন্দীপের দূরত্ব তৈরি হয়। তাই মতান্তরের জেরে মাওবাদী সংগঠনেরই কেউ তাঁকে খুন করেছে কিনা, সেই সন্দেহও অমূলক নয় বলে মনে করছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় তিন দশক ধরে মাওবাদী কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন সন্দীপ। সময়বিশেষে পুলিশ এবং আধাসেনা বাহিনীর ওপর হামলা এবং অস্ত্রশস্ত্র লুঠে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। মাওবাদীদের বিহার-ঝাড়খণ্ড স্পেশাল এরিয়া কমিটির প্রধান ছিলেন সন্দীপ। তাঁর গ্রেফতারির জন্যই ২৫ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ঝাড়খণ্ড সরকার। নয়ের দশক থেকে মাওবাদী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন সন্দীপ। সিপিআই মাওবাদী-র সেন্ট্রাল জোনের দায়িত্বেও ছিলেন। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি রিপোর্টে সন্দীপের নাম উঠে আসে। তাতে বলা হয়, ২০১৬-র নভেম্বর মাসে, নোটবন্দির সময়, ১৫ লক্ষ টাকা বদল করিয়েছিলেন সন্দীপ। তাঁর সহযোগী প্রদ্যুম্ন শর্মা ২০১৭ সালে মেডিক্যাল কলেজে ভাইঝিকে ভর্তি করতে ২২ লক্ষ টাকার ফি জমা করেন। ঝাড়খণ্ডের নকশাল নেতা অরবিন্দ যাদব ভাইকে বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তির জন্য ১২ লক্ষ টাকা ফি জমা দেন বলেও জানা যায়।

মাওবাদীদের আর্থিক লেনদেন প্রসঙ্গে সেই সময় কেন্দ্র জানায়, খনি, পরিবহণ এবং ছোট এবং মাঝারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ঠিকেদার, যাঁরা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের মধ্যেই এই জাল বিস্তৃত। মাওবাদীদের যাবতীয় অর্থের জোগান আসে তাঁদের কাছ থেকে। এছাড়াও, বেআইনি পাথর খাদান, নকশাল পত্র-পত্রিকা বিক্রি করেও টাকা তোলা হয় বলে দাবি গোয়েন্দাদের। গয়া এবং ঔরঙ্গাবাদেই মোটামুটি সন্দীপের পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনদের বাস। ২০১৮ সালে সন্দীপের পরিবারের ৮৪ লক্ষ টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। আর কোনও মাওবাদী নেতার ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ করতে দেখা যায়নি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটকে। সন্দীপের স্ত্রী গয়া জেলায় একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। ময়নাতদন্তের পর তাঁদের হাতে সন্দীপের মৃতদেহ তুলে দেওয়া হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৯০ সালে বাঁকে বাজার হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন সন্দীপ। তারপর এসএমএমজি কলেজ শেরঘাটি থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। সেই সময়ই মাওবাদী ছাত্র সংগঠনের নেতা জেলা অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৯৪ সালে শেরঘাটির তদানীন্তন ডিএসপি-র হাতে পড়েন সন্দীপ। মারপিট, ঝামেলার একটি ঘটনায় সেই সময় রেহাই পেয়ে যান তিনি। ১৯৯৭ সালে গ্রেফতার হন। চার মাস জেল খেটে বেরোন। তার পর থেকেই মাওবাদী কার্যকলাপে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেন সন্দীপ। তবে গত কয়েক বছরে সংগঠনের সঙ্গে সন্দীপের মতভেদের খবরও উঠে আসছিল।

লিখেছেন
pampii adhikari
pampii adhikari
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?