শুধু মহিষাসুর নয়, নটরাজের পায়ে দলিত হয় এক বামন অসুর! কে এই মুয়ালাকা?

Nataraja and Apasmara: এই বামন অসুরের নাম আপসমারা। আপসমারা হলেন একজন বামন যিনি আধ্যাত্মিক অজ্ঞতা এবং অর্থহীন কথাবার্তার প্রতিনিধিত্ব করেন

Ramesh Karamakar
৩ মিনিট
শুধু মহিষাসুর নয়, নটরাজের পায়ে দলিত হয় এক বামন অসুর! কে এই মুয়ালাকা?

দুর্গাপুজো সাঙ্গ। অসুরদলনী দুর্গাকে সমস্ত অশুভ শক্তির দমন আর শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরাধনা চারদিন অতিক্রান্ত করেছে। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র মতে, যুগে যুগে ঈশ্বর নানা রূপে অবতীর্ণ হন এই ধরাধামে। তিনিই অশুভ শক্তিকে বিনষ্ট করেন এবং ভক্তদের রক্ষা করেন। দুর্গার আগমনও তেমনই কারণে। যখন মহিষাসুরের দমন পীড়নে দেবতারা প্রায় স্বর্গচ্যুত হতে বসেছিলেন, তাঁদের রক্ষার্থেই অসুরকে হত্যা করেন দুর্গা। মানুষের বিশ্বাস, বিপদে পড়লে নিশ্চয়ই ঘরের মেয়ে দুর্গা (এক্ষেত্রে পড়ুন ঈশ্বর) এসে সামনে দাঁড়াবেন এবং রক্ষা করবেন। বিষয়টা নারী শক্তি বা পুরুষশক্তির নয়। বিষয়টা শুভ শক্তি এবং অশুভ শক্তির। তাই কখনও পুরুষ বেশে নেমে আসেন (শ্রীকৃষ্ণ বা রাম) কখনো নারী বেশে (দুর্গা, কালী ইত্যাদি)! যুগে যুগেই সেই শুভশক্তির জয়। তারই দৃপ্ত উচ্চারণ শুনতে পাই গীতার শ্লোকে,

"যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।

অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥

পরিত্রাণায় হি সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥"

যদা যদা হি (যখন যখনই)- ধর্মস্য (ধর্মের)- গ্লানিঃ (গ্লানি)- ভবতি (হয়); ভারত (হে ভরতবংশী অর্জুন); অভ্যুত্থানম্ (অভ্যুত্থান ঘটে) অধর্মস্য (অধর্মের); তত্ [তখনই] (সেই/স্বীয়)- আত্মানং (আত্মাকে)- সৃজামি (সৃজন করি)। -অহং (আমি)। পরিত্রাণায় হি (পরিত্রাণের জন্যই), সাধুনাং (সাধুদের বা ধার্মিকদের) বিনাশায় চ (এবং বিনাশ নিমিত্ত); দুষ্কৃতাং (দুষ্কৃতকারীদের) ধর্মসংস্থাপনার্থায় (ধর্ম সংস্থাপনের জন্য)- সম্ভবামি (অবতীর্ণ হই~লীলা শরীর বিগ্রহ করি)॥ যুগে যুগে (যুগে যুগে)

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ঋতুমতী কন্যারা ব্রাত্য, কীভাবে নির্বাচন করা হয় কুমারী পুজোর বালিকাদের?

Mahashtami Kumari Puja: যে সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে একটি মেয়ের সম্মান নির্ধারণ করা হয় ‘কুমারীত্ব’ আর ‘পুত্রসন্তান উৎপাদনের’ মাধ্যমে, সে সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন থাকেই।

দুর্গার পায়ের নিচে মহিষাসুরকে সকলেই দেখে অভ্যস্ত, শুভশক্তির পদতলে অশুভের বিনাশ। অথচ চোখ এড়িয়ে গিয়েছে নটরাজ শিবের মূর্তি। যেমন দুর্গার পদতলে অসুর, ঠিক তেমনই এক বামন আকৃতির ভয়ানক অসুরকে দলিত হতে দেখা যায় নটরাজ শিবের পদতলে। কে এই বামন অসুর? কেনই বা নৃত্যরত মহাদেবের পদতলে এই অদ্ভুত ভঙ্গিমায় তিনি? এই অসুরের সঙ্গে এমন কিছু বিষয় জড়িত আছে যা ধর্মীয় ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে, যা এক বাস্তব বধের শিক্ষা দেয়। আজকে সেদিকেই একটু দৃষ্টিপাত করা যাক।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মৃৎশিল্পীর ভুলে দেবী হয়ে গেলেন নীল, কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর ইতিহাস আজও বিস্ময় জাগায়

Durgapuja 2022: নদিয়া জেলার বহু বনেদিবাড়ি যুগ যুগ ধরে শামিল হচ্ছে এই উৎসবে। আজ মায়ের বিদায়-লগ্নে ছুঁয়ে দেখা সেইসব ঐতিহ্যকে।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, এই বামন অসুরের নাম আপসমারা। আপসমারা হলেন একজন বামন যিনি আধ্যাত্মিক অজ্ঞতা এবং অর্থহীন কথাবার্তার প্রতিনিধিত্ব করেন অর্থাৎ তিনি মানব জীবনের বামনত্ব বা ক্ষুদ্রতারই প্রতিনিধি। তিনি মুয়ালকা বা মুয়ালাকান নামেও পরিচিত। পৃথিবীতে জ্ঞান রক্ষা করার জন্য, অপস্মরাকে (অজ্ঞানতা বা জ্ঞানের বামনত্বকে) বশীভূত করতে হবে, হত্যা নয়। কারণ হত্যা করলে আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও অজ্ঞতার মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য নষ্ট হবে। আত্মহৃদয়ে অপস্মরাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা, উত্সর্গ এবং কঠোর পরিশ্রম ছাড়াই জ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টার প্রতীক হবে এবং এটি সমস্ত আকারেই জ্ঞানের অবমূল্যায়নের দিকে পরিচালিত করবে। অর্থাৎ কঠোর সাধনা বা ধ্যান ছাড়া যে সংক্ষিপ্ত উপায়ে জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টা তা প্রকৃতপক্ষে অসম্পূর্ণ জ্ঞান।

তাই অপস্মরাকে বশীভূত করার জন্য, পরম যোগী, পরম জ্ঞানী শিব– নৃত্যের প্রভু নটরাজের রূপ ধারণ করেছিলেন এবং তাণ্ডবের মহাজাগতিক নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন। এই নৃত্যের সময় নটরাজ অপস্মারকে তাঁর ডান পা দিয়ে পিষে দমন করেন। যেহেতু অপস্মরা (অজ্ঞতা) অমরত্বের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি অসুরদের মধ্যে একটি (যেমন, অজ্ঞতা মানুষের জীবনে স্থায়ীভাবে অন্তর্হিত হয় না বিভিন্ন রূপে সে মানুষের মধ্যে বিরাজমান থাকে), তাই বিশ্বাস করা হয় যে শিব চিরকাল তাঁর নটরাজ রূপে অপস্মরাকে অনন্তকাল ধরে দমন করে থাকেন। অর্থাৎ আপসমারা বা অজ্ঞতার মৃত্যু নেই চিরকাল সে মানব হৃদয়ে উপস্থিত, অমর। কিন্তু সে অমর হলেও অপরাজেও নয়। শিবের মতো কঠোর জ্ঞান ও তপস্যার দ্বারা অপস্মরাকে (অজ্ঞতা) বশীভূত করা সম্ভব কিন্তু নির্মূল করা সম্ভব না। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যতই জ্ঞানী হন না কেন কিছু না কিছু অজ্ঞতা তাঁর ভেতরে থেকেই যায়। কিন্তু সাধনার ধারা যথাসম্ভব নিজেকে জ্ঞানী করে তোলা যায়। ঈশ্বরের পদতলে অপস্মরার (অজ্ঞতা) পিষ্ট হওয়া তারই প্রতীক।

নটরাজের ডান পা এই ভয়ঙ্কর ছোট অবমানবিক প্রাণী-রাক্ষস, মুয়ালকার উপর প্রতিস্থাপিত রয়েছে। একজন বামন, কিন্তু অজ্ঞতার মূর্ত প্রতীক, কুখ্যাত, অত্যন্ত শক্তিশালী মুয়ালাকা হল লোভী, অধিকারী সত্ত্বার প্রকাশ। তার উপর স্ট্যাম্প, তার পিঠ ভাঙা! আর ঠিক সেটাই করছেন নটরাজ। ছোট্ট দৈত্যটিকে ডান পায়ে মাড়াচ্ছেন। কিন্তু লক্ষ্যণীয়, তিনি নাচের সময় বাম পা মাটি থেকে তুলে রেখেছেন। কেন? এই উত্তোলিত পা মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে অমান্য করছে। এই নৃত্য ভঙ্গিমায় পা-টি মোক্ষের বা মুক্তির প্রতীক।

লিখেছেন
Ramesh Karamakar
Ramesh Karamakar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।