বনেদি আভিজাত্যে বিলুপ্তির পথে নীলকণ্ঠ পাখিরা! দশমীর দিনে কেন ওড়ানো হয় এই বিশেষ পাখি?

Durga Puja Neelkantha Pakhi: শোভাবাজার রাজবাড়িতে প্রতিমা বিসর্জনের দিন নীলকণ্ঠ পাখির মূর্তি গড়ে তাকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়। নীলকন্ঠ পাখির ছবি এঁকে আকাশে ফানুস উড়িয়ে দেওয়া হয়।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
বনেদি আভিজাত্যে বিলুপ্তির পথে নীলকণ্ঠ পাখিরা! দশমীর দিনে কেন ওড়ানো হয় এই বিশেষ পাখি?

বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজো অবশেষে সমাপ্ত। দুর্গাপুজোয় প্রত্যেকবারই আড়াআড়ি ভাবে ভেঙে যায় উৎসব। একদল তৈরি করে বারোয়ারি দুর্গা। আর বাংলায় দুর্গাপুজো শুরুর সময় থেকেই কলকাতা-সহ একাধিক জেলার জমিদার বাড়িতে হয়ে আসছে দুর্গাপুজো। কালের বিচারে দেখলে দেখা যাবে, তাদের মধ্যে প্রত্যেকটাই প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। এই সব বনেদি বাড়ির পুজোর রেওয়াজের মধ্যে অন্যতম হল দশমীর দিন দুর্গা প্রতিমার বিসর্জনের সময় আকাশে নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে দেওয়া।

নবকুমার ভট্টাচার্য ‘দুর্গা ও দুর্গোৎসব’ গ্রন্থে ‘প্রাচীন কলকাতার দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধে উল্লেখ করছেন, “১৭.১০.১৮২৯ তারিখের ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় মন্তব্য করে যে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সর্বপ্রথম দুর্গোৎসবে বড় জাঁকজমক করেন এবং তাঁর দৃষ্টান্ত দেখে ব্রিটিশ সরকারের আমলে যারা ধনী হয়েছেন, তাঁরা দেশের অধিপতির সামনে নিজেদের সম্পদ প্রদর্শন করতে আর ভীত নন। ...কলকাতার বাবুরা দুর্গোৎসবে তা অনুকরণ করেছিলেন, বিশেষ করে শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পথ অনুসরণ করেই কলকাতা ও জেলার জমিদাররা দুর্গাপুজোর জমকে মন দিয়েছিলেন।”

কেন ওড়ানো হত নীলকণ্ঠ পাখি

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পোড়া ল্যাটা মাছের ভোগ, ইতিহাসবিজড়িত সাবর্ণদের দুর্গাপুজো

Durga Puja 2022: সাবর্ণ পরিবারের পুজোর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল মাষভক্তবলি অর্থাৎ পশু এবং অপদেবতার জন্য ১৮০ টি মাটির খুঁড়িতে মাষকলাই ঘি দিয়ে মাখিয়ে নিবেদন করা হয়।

বলা হয়ে থাকে, রাবণ বধের আগে এই নীলকণ্ঠ পাখির দর্শন পেয়েছিলেন রামচন্দ্র। আবার অন্য মতে, এই নীলকণ্ঠ পাখিই পথ দেখিয়ে লঙ্কায় নিয়ে গিয়েছিল রামচন্দ্র ও বানর সেনাদের। হিন্দু পুরাণ মতে, এই পাখি দর্শন তাই খুবই শুভ। এই নীলকণ্ঠ পাখিই জড়িয়ে গিয়েছে বাঙালির অতি প্রিয় দুর্গাপুজোর সঙ্গে। মূলত বনেদি বাড়ির পুজোয় বিসর্জনের দিন আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকন্ঠ পাখি। বনেদি বাড়িগুলোতে এখনও বিশ্বাস করা হয় নয় দিন মর্ত্যলোকে কাটিয়ে বিজয়া দশমীর দিনে যখন উমা তাঁর চার সন্তানকে নিয়ে কৈলাসে ফেরেন তখন উমার যাত্রার খবর কৈলাসে শিবের কাছে পৌঁছে দেয় এই নীলকণ্ঠ পাখি।

উমার যাত্রার সময় নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর আরও একটি অন্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। বলা হয় লঙ্কা বিজয়ের পর রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ একসঙ্গে শিবের আরাধনা করেন ব্রাক্ষণ হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হবেন বলে। সেই সময় নীলকণ্ঠ পাখির রূপ ধারণ করে রাম ও লক্ষ্মণের আরাধনায় সাড়া দিয়ে শিব মর্ত্যে এসেছিলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাগানের মাটিতে শিশুকন্যার অলীক পায়ের ছাপ! যেভাবে শুরু হল শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির পুজো

Durgapuja: রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরীর কন্যা প্রতিদিন বাড়ি সংলগ্ন বাগানে তাঁর বন্ধু পদ্মাবতীর সঙ্গে খেলত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জমিদার বাড়ির কেউ পদ্মাবতীকে দেখেননি।

বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোগুলিতে এই রীতি পালন করতে গিয়ে প্রত্যেক বছরই নির্বিচারে বন্দি করা হত কয়েকশো নীলকণ্ঠ পাখিকে। তারপর বনেদি বাড়ির প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে খাঁচা খুলে উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকণ্ঠদের। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খাঁচায় বন্দি থাকার ফলে আহত পাখিগুলো ছাড়া পেয়েও বেশি দূর উড়ে যেতে পারত না। কিছুদূর যাওয়ার পরই নীলকন্ঠ পাখিদের আক্রমণ করত কাকের দল। সেই আক্রমণে প্রত্যেক বছরই প্রাণ যেত কয়েকশো নীলকণ্ঠ পাখির।

নীলকণ্ঠ পাখির পোশাকি নাম ‘ইন্ডিয়ান রোলার’ আর বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘কোরাসিয়াস বেনঘালেনসিস’। নীলকণ্ঠ পাখি মূলত ঘাস ও ঝোপঝাড়ের বাসিন্দা। আকারে ২৬-২৭ সেমি এই পাখির দেহ, লেজ ও ডানায় রয়েছে উজ্জ্বল নীল বর্ণের উপস্থিতি। ঘাসজমির পোকামাকড় খেয়ে সাধারণ কৃষকদের উপকার করে এই পাখি। ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ এই পাখিকে ওড়িশা, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় ‘স্টেট বার্ড’-এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

কলকাতা সহ জেলার প্রায় সকল বনেদি বাড়িতেই দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের সময়ে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকণ্ঠ পাখি। কলকাতার অন্যতম প্রাচীন পুজো শোভাবাজার রাজবাড়িতে কয়েকশো বছর ধরেই প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকণ্ঠ পাখি। কিন্তু বেশ কিছু বছর ধরে নীলকণ্ঠ পাখির বিলুপ্তির আশঙ্কায় বন দপ্তর এই পাখি ধরা নিষিদ্ধ করে দেয়। তারপর থেকে শোভাবাজার রাজবাড়িতে প্রতিমা বিসর্জনের দিন নীলকণ্ঠ পাখির মূর্তি গড়ে তাকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়। নীলকন্ঠ পাখির ছবি এঁকে আকাশে ফানুস উড়িয়ে দেওয়া হয়।

নীলকণ্ঠকে বাঁচাতে সংরক্ষিত পশু পাখির তালিকার চতুর্থ তফসিলিতে এই পাখিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখনও মহালয়ার পর থেকে বিভিন্ন চোরা পথে অনেক বনেদি বাড়িতেই নিয়ে আসা হয় নীলকন্ঠ পাখি। বন দপ্তরের আধিকারিকদের মতে, কঠোরভাবে নিয়ম রক্ষা করতে গিয়ে বহু বনেদি বাড়িই আইনের তোয়াক্কা করে না। পুজো চলাকালীন বনেদি বাড়িতে হানা দিয়ে পাখি উদ্ধার করাও দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে বন দপ্তরের কাছে। শেষ বেশ কিছু বছর ধরে তাই নীলকণ্ঠ পাখি ধরা আটকাতে মহালয়ার পর থেকেই কলকাতার বড় পাখির বাজারগুলোতে তল্লাশি চালায় বন বিভাগ। ফলও মিলেছে হাতেনাতে। পুজোর আগে নীলকণ্ঠ পাখির চোরা কারবারে শেষ কয়েক বছরে অনেকটাই ভাটা পরেছে। বন দপ্তরের কঠোর অনুশাসনে তাই দশমীর দিন নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর এই প্রাচীন রীতি এখন শুধুই ইতিহাস।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।