আর অন্ধা নয় কানুন! কেন বদলে দেওয়া হলো ভারতের বিচারের মূর্তিটি?

Lady Justice Statue: যে 'লেডি জাস্টিস'-এর মূর্তি আমরা দেখে এসেছি, সে আসলে জাস্টিটিয়া। রোমান পুরাণে ন্যায়ের দেবী হচ্ছেন জাস্টিটিয়া।

inscript
৩ মিনিট
আর অন্ধা নয় কানুন! কেন বদলে দেওয়া হলো ভারতের বিচারের মূর্তিটি?

লোকে বলত অন্ধা কানুন! অ্যাংরি ইয়ং ম্যান অমিতাভ প্রতিবাদে চিৎকার করতেন, 'ইয়ে অন্ধা কানুন হ্যায়'। চোখে কালো কাপড় বাঁধা, হাতে দাঁড়িপাল্লার সেই প্রাচীন বিচারের প্রতীকটি বদলে গেল ভারতবর্ষে, খানিক নিঃশব্দেই। ভারতের প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিচারের নতুন মূর্তির উন্মোচন করেছেন। এই মহিলার চোখে কালো কাপড় নেই। শাড়ি পরিহিতা মহিলার গায়ে অজস্র গহনা। এক হাতে দাঁড়িপাল্লা এবং অন্য হাতে ভারতের সংবিধান। আগের মূর্তিটি কেনই বা সরানো হলো, কেন খুলে ফেলা হলো চোখের কালো পট্টি?

যে 'লেডি জাস্টিস'-এর মূর্তি আমরা দেখে এসেছি, সে আসলে জাস্টিটিয়া। রোমান পুরাণে ন্যায়ের দেবী হচ্ছেন জাস্টিটিয়া। 'লেডি জাস্টিস'-এর চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা, একহাতে দাঁড়িপাল্লা এবং অন্য হাতে ধরা তলোয়ার। তবে শুরু থেকেই কিন্তু ন্যায়ের দেবীর চোখটি বাঁধা ছিল না। রেনেসাঁসের সময়কালে অর্থাৎ ১৪ শতক থেকে চোখ বাঁধা মূর্তি দেখা যেতে থাকে। সম্ভবত আইনি ব্যবস্থার দুর্নীতিগ্রস্ত অবস্থাকে বোঝাতেই এই প্রতীক ব্যবহৃত হতো। বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যায় দেখেও চোখ বন্ধ করে রেখেছিল, এই অভিযোগে ব্যঙ্গ করেই জাস্টিটিয়ার চোখ বাঁধা হয়। ১৭-১৮ শতকে এই চোখ বাঁধা ন্যায়ের মূর্তিকে নিরপেক্ষতার প্রতিনিধি হিসাবে তুলে ধরা হয়। চোখ বেঁধে আছে অর্থাৎ, বিচার ব্যবস্থা সম্পদ, ক্ষমতা এবং সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই ন্যায়বিচার দেবে মানুষকে। দাঁড়িপাল্লার অর্থ ভারসাম্য। অর্থাৎ আদালতকে কোনও রায় দেওয়ার আগে যুক্তির দুই পক্ষকেই মেপে দেখতে হবে। আর তলোয়ারটি আইনের ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের প্রতীক। তলোয়ার আইন রক্ষাও করতে পারে এবং শাস্তিও দিতে পারে। এই এতখানি ইতিহাসকে রাতারাতি বদলে কেন দেওয়া হলো ভারতে?

ব্রিটিশরা যখন ভারত শাসন শুরু করে তখন তারা তাদের আইনি ব্যবস্থাই এই দেশেও চালু করে। নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আদালতের শ্রেণিবিন্যাস ব্রিটিশ ব্যবস্থারই প্রতিফলন। ব্রিটিশ শাসনের সময়ই 'লেডি জাস্টিস' ভারতে একটি বিশিষ্ট প্রতীক হয়ে ওঠে। আদালতের বাইরে রাখা হয়েছিল এই মূর্তি। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে, নতুন মূর্তিটি ঔপনিবেশিকতার চিহ্ন মোছার প্রয়াস বই কিছুই নয়। ঔপনিবেশিক প্রতীকগুলিকে বাদ দেওয়ার তাড়নাতেই পাশ্চাত্য পোশাকের বদলে শাড়ি পরানো হয়েছে মূর্তিটিকে। চোখ খোলা রাখা হলো কেন? এতে বোঝানো হচ্ছে, আইন অন্ধ নয় এবং ভারতের আইন সবাইকে সমান চোখে দেখে। দাঁড়িপাল্লাটি রয়েছে আগের মতোই। অর্থাৎ আদালত নিরপেক্ষ রায় দেবে এবং সব উভয় পক্ষের কথা সমানভাবে বিচার করবে। তলোয়ারের বদলে আনা হয়েছে ভারতের সংবিধান। দেশের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষ নরন্তর যে বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন, সেই মানুষদের উন্নতির জন্য সাংবিধানিক বিধানকে গুরুত্ব দিতেই মূর্তির হাতে ধরানো হয়েছে সংবিধান। মূর্তি তো বদল হলো। দেশের বিচারব্যবস্থা কি বদলাল? চিরকালই বিচার নিয়ে সন্দেহ থেকেছে। বিত্তশালী, প্রভাবশালীদের জন্য বিচার আর সাধারণ মানুষের জন্য বিচার যে আলাদা তা এখন শিশুও জানে। গত কয়েক বছরে বিচারব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বেশিই। ভারতে কি সকলে সমান ন্যায়বিচার পায়?

সুপ্রিম কোর্ট কিছুদিন আগেই একটি জনস্বার্থ মামলা খারিজ করেছে। ওই মামলাতে বলা হয়েছিল, দেশের সমস্ত আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা পাঁচ কোটি! জনস্বার্থ মামলাতে এই বিপুল পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তির জন্য তিন বছরের সময়সীমা চাওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, দাবিটি কাম্য হলেও, বিচারব্যবস্থার বাস্তবতা মাথায় রাখলে এটি কার্যত অসম্ভব। জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনায়েড, আদালত কি তাই প্রমাণ করল তবে?

কলেজিয়ামের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত সংশোধিত মেমোরেন্ডাম অফ প্রসিডিউর গত আট বছর ধরে চূড়ান্ত করা হয়নি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বিষয়ে সরকার ও বিচার বিভাগের এত দীর্ঘসূত্রিতা কেন তবে? উচ্চতর বিচার বিভাগে অনগ্রসর শ্রেণি, তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব ২৫% এরও কম। মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব ১৫%-এর কম। তাহলে ন্যায় সকলের কাছে সমানভাবে পৌঁছবে কীভাবে? কীভাবে সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষটির কথা যথার্থভাবে পৌঁছবে আদালতে? হাইকোর্টগুলিতে চিরকালই ৬০-৭০% শক্তি নিয়ে কাজ করা হয়। যার ফলে বর্তমানে ৬০ লক্ষেরও বেশি মামলার অমীমাংসিত অবস্থায় আছে। নিম্ন আদালতে ৪.৪ কোটি মামলা বিচারাধীন। তাহলে খোলনলচে না বদলে শুধু মূর্তি বদলে কি সুরাহা হবে? দেশের প্রান্তিকতম অঞ্চলের মানুষটি যদি বিচার না পান, যদি তাঁর কথা শোনার মতো কানই না থাকে আদালতের তাহলে কি মূর্তির হাতে ধরা সংবিধান রক্ষা সম্ভব?

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মানুষ টাকা পেয়ে গেলে ভুলে যাবে, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ সম্পর্কে বললেন বিজেপি বিধায়ক সজল

Sajal Ghosh interview: ‘ভয় ছাড়া ভক্তি আসে না’— আইন-শৃঙ্খলা, দুর্গাপূজা বিতর্ক এবং তৃণমূলের দলবদল নিয়ে নিজের মতামত জানালেন বিজেপি নেতা সজল ঘোষ।

ভারতের রাজনীতি কতটা বদলে দিয়েছেন মোদী?

25 years of Narendra Modi: ২৫ বছরে মোদী কতটা বদলে দিয়েছেন ভারতের রাজনীতি? উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রচারের ধরন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের ধারণা—কীভাবে বদলেছে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র?

ব্রাজিল থেকে আমেরিকা যে কারণে দক্ষিণপন্থীদের শাস্তি দিচ্ছে শান্তিকামী মানুষ

The Alt - right Tide Turns: বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে। হাঙ্গেরিতে ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান, সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী বিজয়, ব্রাজিলে প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও লুলার জয়, আমেরিকায় মিডটার্মে ডেমোক্র্যাটদের সংসদের দুই কক্ষ দখল, সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থী জোয়ারে ভাটার সুর। তবে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, ইতালিতে দক্ষিণপন্থা এখনও টিকে আছে। সেগুলির বিরুদ্ধেও চলছে জেনজিদের, শ্রমজীবী অভিবাসী মানুষদের বিক্ষোভ।

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।