নোবেলের দাবিদার, তাই হঠাৎ বাঙালির বাজি তারাশঙ্কর! কী ভাবছেন লেখকরা

Tarashankar Bandyopadhyay: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল মনোনয়ন প্রকাশ‍্যে আসার পর কী বললেন বাংলার সাহিত‍্যিকরা?

Ramen Das
৪ মিনিট
নোবেলের দাবিদার, তাই হঠাৎ বাঙালির বাজি তারাশঙ্কর! কী ভাবছেন লেখকরা

'লিখতে বসে মনে হচ্ছে, এমন কঠিন কাজে হাত না দেওয়াই ভালো ছিল।'- 'আমার সাহিত্য জীবন'-এ আক্ষেপ করেছিলেন সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা', 'পঞ্চগ্রাম', 'কালিন্দী', 'গণদেবতা', 'রাধা'- নানা অভিমুখে বিচরণ ছিল যাঁর কঠিন কথার, দৃঢ় কলমের জোরে এগিয়ে যাওয়া বারবার ছিল যাঁর, লেখার জন্য বহু ত্যাগ ছিল যাঁর জীবনে, সেই তারাশঙ্কর জীবনের শেষ পর্বেই রেখে গিয়েছিলেন অমোঘ এক স্মৃতি। রবীন্দ্র-প্রবাহের স্রোতে বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।

যে পুরস্কার নিয়ে বাংলা, বাঙালির আদিখ্যেতা একটু বেশি বলে কেউ কেউ দাবি করলেও পাশ্চাত্যের সেই বিখ্যাত পুরস্কার, নোবেল-বিজয়ী হতে পারতেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

কেন? সম্প্রতি, ১৯৭১ সালের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে নোবেল কমিটি। যে তালিকাটি ওই বছরের সাহিত্যে পুরস্কারের মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেবার চিলি-র পাবলো নেরুদা সাহিত্যে নোবেল পান, ঠিক সেই তালিকাতেই নাম দেখা যাচ্ছে বাংলার তারাশঙ্করেরও। ৯০ জন সেরা সাহিত্যিকের ওই মনোনয়ন তালিকায় পাবলো নেরুদা, নাবোকভ, এডওয়ার্ড অ্যালবি, টেনেসি উইলিয়ামস, মেরি আন্ডারের সঙ্গে ৯ নম্বরে নাম রয়েছে 'গণদেবতা'-র স্রষ্টার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কালে কালে জৌলুস হারিয়েছে পুজোসংখ‍্যা? কী মত লেখকদের

Durgapuja 2022: পুজোসংখ‍্যার মান পড়ছে? কী বলছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, প্রচেত গুপ্ত, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, অপরাজিতা দাশগুপ্ত, সাদিক হোসেনরা?

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই বাংলার সাহিত্য-মহলের একাংশ থেকে নেটিজেন- হইহই শুরু হয়েছে সব ক্ষেত্রেই। কেউ কেউ বলছেন, বরাবর মায়ের থেকে মাসির দরদে বিশ্বাসী বা সমকালে লেখককে পাত্তা না দেওয়া বাঙালিরাই গুগল সার্চের ওপরের সারিতে রাখছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে! যেন প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে, নোবেল তালিকায় নাম থাকার ফলেই তারাশঙ্করের স্থান উঁচু হয়েছে ফের।

কিন্তু কেন? এই প্রসঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম, সমসাময়িক সময়ের খ্যাতনামা লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি বললেন, "তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ্য। তিনি অবশ্যই নোবেল-বিজয়ী হতে পারতেন। শুধু তিনি কেন, ঠিকঠাক দেখলে এ দেশের কমপক্ষে ২০ জন সাহিত্যিক নোবেল পুরস্কার পেতে পারতেন।" তাঁর দাবি, "আমরা নোবেল নিয়ে মাতামাতি করি বেশি। অর্থাৎ ইউরোপের বাইরে আমরাই সর্বাধিক একটু বেশি ভাবি নোবেল নিয়ে। কিন্তু এই বিশ্বে বহু পুরস্কার রয়েছে। যা বহু অর্থেরও। তুলনায় ভারতের মতো দেশে সাহিত্যিকদের জন্য বহু আর্থিক মূল্যের পুরস্কার তেমন একটা নেই!'' এদেশে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের অভাব নিয়ে তাঁর মন্তব্য, "অনুবাদে সমস্যা। বাংলার সাহিত্য-অনুবাদ হয় কম। তুলনায় উড়িয়া, মালয়ালম- বহু ভাষার সাহিত্য নিয়মিত অনুবাদ করা হয়। এর ফলে একটা বড় অংশের পাঠকের কাছে বিভিন্ন লেখা, সৃষ্টি পৌঁছতে পারে। তারাশঙ্করের সাহিত্য বা সমসাময়িক সময়ের বাকিরা। যদি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকদের লেখার বিদেশি ভাষার অনুবাদ হত, তাহলে হয়তো এই প্রবণতা বেড়ে যেতে পারত।'' তাঁর মতে, ''আমি বিদেশি সাহিত্য পড়ি কম। কিন্তু যেটুকু দেখেছি, তাতে আমাদের বাংলার সাহিত্য, ছোটগল্প, উপন্যাস বিদেশিদের তুলনায় গুণগত মানে কোনওভাবেই কম নয়। সমকালে সমকালের গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সকলেই পিছিয়ে। তাই এই অবস্থা হয়ত।" স্বপ্নময় চক্রবর্তী আরও বলেন, "শুধু তারাশঙ্কর নন, আমি তো শুনেছি ২০০৬ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টে যেবার বইমেলায় ভারত থিম হলো, মহাশ্বেতা দেবী উদ্বোধনে গেলেন, আমিও ছিলাম- সেই অনুষ্ঠানে তো তাঁকে পরিচয় করানো হল নোবেল পুরস্কারে মনোনীত সাহিত্যিক হিসেবে।''

অর্থাৎ, শুধুই তারাশঙ্কর নন, বাংলার, বাঙালির সাহিত্যের উচ্চমানে মহাশ্বেতা দেবীও মনোনয়ন পেয়েছিলেন নোবেল পুরস্কারের। নোবেল মানেই বিরাট, তা না পেলে বড় সাহিত্যিক হওয়া যাবে না, একথা মানতে নারাজ বাংলার সাহিত্য জগৎ। তাঁদের অনেকেরই দাবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার ইংরেজি অনুবাদ না হলে, তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতি না থাকলে ওইটুকুও জুটত না, কারণ ইউরোপের বাইরে যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া যায়, একথা ভাবাও যেত না তখন। যদিও পরবর্তীকালে ভারতে এসেছে একাধিক নোবেল পুরস্কার। ভারতীয় হিসেবে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত অথবা ভারতের সঙ্গে জড়িয়েও নোবেল পেয়েছেন অনেকে।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সাহিত্যিক অমর মিত্র ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন, "তিনি অনন্য। অভিনব। যোগ্য হিসেবে এই পুরস্কার পেতেই পারতেন। তাঁর মতো দৃঢ়চেতা লেখক এই দেশে কেন, বিশ্বেও কম আছেন। তাই এই সম্মান তাঁর জন্য অবশ্যই যোগ্য ছিল।'' তাঁর কথায়, "জীবনে কত ত্যাগ করেছেন তারাশঙ্কর! একবার বম্বে গিয়ে সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার সুযোগ আসলেও তিনিই না বলেছিলেন। তাঁর বদলে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়েছিলেন লিখতে। মাত্র ৪০-৫০ টাকা মাসিক আয়। মেসবাড়ি, থাকা-খাওয়ার খরচ। একাধিক লড়াই করতে হয়েছে রোজ। তবুও তিনি লিখেছেন। রোজ তৈরি করেছেন এক একটি দৃষ্টান্ত।'' তারাশঙ্করের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল অমর মিত্রর। তিনি বলেন, "১৯৭১ সাল। তাঁর প্রয়াণের কয়েক মাস আগেই একটি অনুষ্ঠানে তিনি আসেন। বক্তব্য রাখেন। তখন আমরা অনেক ছোট। একাধিকবার একই এলাকায় থাকার সুবাদে দেখেছি মানুষটিকে।''

প্রসঙ্গত, যে বছরে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দাবিদার হিসেবে তাঁর নাম মনোনীত হয়েছিল, সেই বছরেই মৃত্যু হয় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

তারাশঙ্কর আজ নয়, অনন্যতায় চিরন্তন। বরাবর মৌলিক লেখনীতে তিনি অভিনব। মহাশ্বেতা দেবীর আগে সমসাময়িক কথায়, সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর কথকতার ক্ষেত্রে তিনিও বিশিষ্ট। প্রকৃতি, পরিবার, সম্পর্ক, টানাপোড়েন রাজনৈতিক আবহের মানিক, বিভূতিভূষণ ছাড়িয়ে তারাশঙ্কর ছিলেন আঁতের কথার বাহক। যিনি জল, জঙ্গল, নদী, প্রেম আর লড়াইকে মুখ্য করে চালিয়েছেন নিজ সৃষ্টির নৌকো। যে নৌকো চলেছে কখনও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথার ঘাট পেরিয়ে, কখনও মনস্তত্ত্বের নদীর ওপর দিয়ে সম্পর্ক-ঘাটের উদ্দেশ্যে। তাই, সামগ্রিকভাবে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল-যোগ আলোচনা-বিতর্ক আর বিশেষত্বর প্রকাশ ঘটালেও আসলে তিনি অনন্য। বাংলার শুধু নয়, দেশের কথাসাহিত্যের আঙিনায় গণদেবতা যেন তিনিই, বলছেন অনেকেই।

লিখেছেন
Ramen Das
Ramen Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।