শিব নয়, পায়ের নীচে থাকে অসুর, সিংহ! চমকে দেবে ৩০০ বছরের পুরনো বাংলার এই কালীর রহস্য

Balurghat Kali Puja : দোল উৎসবের সময় হয় এই বিশেষ পুজো, অবাক করবে বাংলার তিনশ বছরের পুরনো এই কালীর রহস্য

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
শিব নয়, পায়ের নীচে থাকে অসুর, সিংহ! চমকে দেবে ৩০০ বছরের পুরনো বাংলার এই কালীর রহস্য

কলকাতা নামের সঙ্গে কালী শব্দের যোগাযোগ আছে ঠিকই, তবে কালী নিয়ে এই বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশ্বাস কেবল কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জেলায় জেলায় রয়েছে এমন অজস্র রহস্য। প্রাচীনত্ব এবং ইতিহাসের জোরে যেখানে আজও রীতি মেনে আরাধনা করা হয় দেবীর। কোথাও দেবী শাকাহারী, কোথাও আবার ঘুমোতে যাওয়ার সময় লাগে ওষুধ, নানান শিব অজানা রহস্য রয়েছে বাংলার এই কালীতত্ত্ব নিয়ে। ধরা যাক, কালী পুজো,, চোখ বন্ধ করলে দেবীর যে মূর্তিটা ভেসে ওঠে সেটা ঠিক কীরকম? রুদ্র মূর্তি, চার হাত। এক হাতে মুন্ড মালা, অন্য হাতগুলিতে অস্ত্র। দেবী স্বয়ং শিবের বুকের ওপর দন্ডায়মান, এবং জিভ কাটা। তবে আজ যে কালী কথা বলা হচ্ছে তিনি এই চিরাচরিত ধারণার থেকে এক্কেবারে আলাদা।

লম্বায় প্রায় সাড়ে দশ হাত এই কালীর পায়ের নীচে শিব নয়, রয়েছে অসুর এবং সিংহ। শুনে খানিকটা অবাক লাগলেও, বাংলার এই বিশেষ কালীর রূপ এইরকমই। এখানেই শেষ নয়, দেবী এখানে অষ্টভূজা। আরও অবাক করবে যে বিষয়টি তা হল, অমাবস্যা নয়, পূর্ণিমা তিথিতে পূজিতা হন দেবী। প্রতিবছর দোল পূর্ণিমার প্রতিপদ তিথিতে এই চঞ্চলা কালীর পুজো অনুষ্ঠিত হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রীতিমতো শিকলে বেঁধে পুজো করা হতো দেবীকে, বাংলার এই কালীকে ঘিরে রয়েছে অজানা রহস্য

Mysterious Kali Of Bengal : কালীপুজো নাকি জুঁই ফুলের মতো, রাত পোহালেই তার সুবাস নষ্ট। এখানেও হতো ঠিক তাই। এক রাতের পুজোর জন্যই যত আয়োজন। তাই গভীর রাতেই মশাল জ্বালিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হতো।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট, এখানেই রয়েছে এই তিনশ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য। তবে এই পুজোয় শুধু দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার নয়, বিহার, ঝাড়খণ্ড সহ ভিনরাজ্যের ভক্তরাও উপস্থিত হন। এই পুজোকে কেন্দ্র করেই বসে মেলা। আর এই মেলায় হল প্রাচীন এই ঐতিহ্যের আসল কেন্দ্রবিন্দু। ভক্ত আর ভক্তির জোর যে ঠিক কতটা তা অবশ্য নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনশ বছরের এই অভ্যাস জানান দেয়। প্রতি বছরের মতো এই বছরেও দোল পূর্ণিমা তিথিতে পুজো এবং মেলার জমাটি আয়োজন শুরু হয়েছে।

বালুরঘাট শহরের অদূরে ডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের হোসেনপুরের কাছে চকবাখর গ্রামেই প্রতিবছর পূজিতা হন এই চঞ্চলা কালী। দোল পূর্ণিমার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদ তিথিতে গভীর রাতে শুরু হয় এই বিশেষ পুজো। এক পায়ের নীচে অসুর, অন্য পায়ের নীচে সিংহ। বলা হয়, মহামায়া ও চামুণ্ডার এক মিলিত রূপ এই চঞ্চলা কালী মাতা। তাই এরকম দুই রূপের মিলন দেখা যায় দেবীর আত্মপ্রকাশে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিশ্বাসে মিলায় চাকরি? মন্দার বাজারেও নাকি ষোলো আনা মানতেই চাকরি দেয় এই ‘সার্ভিস কালী’!

Service Kali : এই পরিস্থিতিতে চাকরির আশায় দিকে দিকে সংস্কারকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে মানুষ। আর আবারও ফিরে ফিরে আসছে এই সার্ভিস কালীর প্রসঙ্গ।

কথিত আছে, আজ থেকে তিনশ বিচরাগে এই এলাকায় প্রথম পুঁজি শুরু হয়। শুরুটা অবশ্য হয়েছিল কিছু অলৌকিক নিদর্শনের হাত ধরেই। তখন মাহিনগর এলাকার মহি রাজা এই পুজোর প্রচলন করেন। মাহিনগর থেকে সুরঙ্গ পথে চকবাখরে এসেছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর এই পুজো দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে এই এলাকার বাসিন্দা স্বপ্নাদেশ পেয়ে আবার পুজোর সূচনা করেন। এই পুজোর আর্থিক সহযোগিতা করত স্থানীয় জমিদার সুধীর চৌধুরী।

প্রথমে এখানে পাকা মন্দির ছিল না, মাটির মন্দিরেই শুরু হয় পুজো। পরে অবশ্য টিনের চাল দেওয়া পাকা মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয় এখনও চলছে সেই কাজ। সারা বছরের নিত্য পুজো করেন একজন নির্দিষ্ট পুরোহিত। এছাড়াও বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে একাধিক পূজারীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।এখানে চঞ্চলা কালী মন্দিরের পাশেই রয়েছে শ্মশান কালী ও মাশান কালীর মন্দির।

মা চঞ্চলার পুজোর পরের দিন ওই দুই মন্দিরেও তন্ত্র মতে পুজো করা হয়। এই মন্দিরের সামনেই রয়েছে প্রাচীন এক নাটমন্দির। এখানে পুজোর পরে দুদিন রাতভর মঙ্গলচন্ডীর গান শোনানো হয়। এছাড়াও এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটু বিশেষ পুকুর। এই পুকুর্যে নিয়েও রিয়েছে রহস্যময় অতীত। শোনা যায়, একসময় নাকি পুজোর কাজের জন্য থালা-বাসন ভেসে উঠত এই পুকুরে। বর্তমানে এই পুকুরের জল দিয়েই কালীর পুজো করা হয়। পুজোর পাঁচ দিন আগে ঘট বসে মন্দিরে। এখানে আজও প্রচলিত রয়েছে বলির প্রথা। পাঁঠা এবং পায়রার মাথায় চুল বলি হয় প্রতি বছর। বলির জন্য কাঠের কাতরা এই পুকুরেই বছরভর ডোবানো থাকে। পুজোর দিন বিকেলে তা তুলে এনে বলির কাজ করা হয়।

পুজো ঘিরে এই অঞ্চলে টানা তিন দিন ধরে চলে মেলা। মেলায় অন্যান্য পরিচিত পসরার সঙ্গে থাকে এক বিশেষ আকর্ষণ। একটি বড় কাঠের পাটাতনে পুঁতে রাখা পেরেক ও খর্গের উপর ভক্তরা শিব কালী সেজে নাচ করেন। বিভিন্ন লোকবাদ্য যেমন ঢাক, ঢোল, কাঁসর ব্যবহৃত হয়। লোকনৃত্যের অঙ্গ মুখা নাচ ও অস্ত্র নিয়ে খেলার রীতি রয়েছে এখানে। যা লোকসংস্কৃতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। প্রায় ২৫ জন ভক্ত একযোগে এই নাচ ও খেলা দেখান। সব মিলিয়ে এই পুজো বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্যের উদাহরণ যে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।