জাহাজে লুকোনো রত্ন পেয়ে ভাগ্য ফিরেছিল গৌরী সেনের! বাংলা প্রবাদগুলিতে লুকিয়ে যে ইতিহাস

সত্যি কি আমাদের বলা সব প্রবাদ বা কবিতার নেপথ্যে একটা করে গল্প আছে?

Raktim Dey
৩ মিনিট
জাহাজে লুকোনো রত্ন পেয়ে ভাগ্য ফিরেছিল গৌরী সেনের! বাংলা প্রবাদগুলিতে লুকিয়ে যে ইতিহাস

খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে।

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে। খাজনা দেবো কিসে?

ছোটবেলায় এই পদ্য বা গান শোনেনি, এইরকম বাঙালি সম্ভবত নেই। ছোটবেলায় শুনে আনন্দ পাওয়া এই পদ্য আসলে যে রক্তাক্ত অধ্যায়ের কথা বলে, তা আমরা হয় জানি না অথবা ভুলে গিয়েছি। এই পদ্যের বর্গীদের ইতিহাস আমাদের অজানা। উত্তর কলকাতায় একটা রাস্তার নাম মারহাট্টা ডিচ লেন, সেই রাস্তার নামের সঙ্গে এই পদ্যের মিল রয়েছে। কারা সেই মারহাট্টা, যাদের ভয়ে ইংরেজরা কলকাতার চারপাশে পরিখার মতো গর্ত খুঁড়ে কলকাতায় তাদের আক্রমণ আটকাতে চেয়েছিল? সত্যি কি আমাদের বলা সব প্রবাদ বা কবিতার নেপথ্যে একটা করে গল্প আছে?

একটু বইয়ের পাতা আর কম্পিউটারের ইঁদুরের ঘেঁটি ধরে নাড়াচাড়া করলে জানা যায় যে, পদ্যের বর্গী আর রাস্তার নামের মারহাট্টা দু'টি আলাদা নাম হলেও আসলে তাদের উৎস এক- মারাঠা। যদিও তাদের সেই সময়ের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায় বর্ধমানের কাটোয়া, দাঁইহাট এবং কালনায়। প্রায় ছ'বার বর্গী আক্রমণ এবং অবাধ লুঠপাটের ফলে এই এলাকাগুলো সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই এলাকায় যে মারাঠারা এসেছিল, তার প্রমাণ হিসাবে আজও দাঁইহাটে মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের দুর্গামণ্ডপ দাঁড়িয়ে আছে। ইংরেজদের আশঙ্কা যদিও শুধু আশঙ্কা হিসাবেই থেকে গিয়েছিল। মারাঠারা কলকাতা আক্রমণ করেনি। তার ফলে ইংরেজদের আবার সেই বিশাল সুবিশাল পরিখার মতো গর্ত মাটি দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিল। যে এলাকা দিয়ে সেই পরিখা ছিল, তেমন একজায়গার রাস্তার নাম হয়ে গিয়েছিল মারহাট্টা ডিচ লেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দশটি গ্রাম নিয়ে জমিদারি! হুগলির এই জায়গায় ইতিহাস এখনও কথা বলে

সৌন্দর্যময় তোরণদ্বার, রোমান ক্যারিন্থিয়াম পিলার-যুক্ত সিংহদ্বার, নাচঘর প্রভৃতি জমিদারদের সুরুচির পরিচয় বহন করে।

বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। এক ভদ্রলোক মাছের দাম শুনেই প্রায় খেঁকিয়ে উঠে বললেন, "মগের মুলুক পেয়েছে।" এই প্রবাদটা আজ প্রায় চারশো বছর ধরে বাঙালিরা বলে চলেছি। যদিও উৎস অনেকই জানি না, কিন্তু মানে সবাই জানি। এই কথাটার সঙ্গেও বাংলার এক অন্ধকার অধ্যায় জড়িয়ে আছে। মারাঠারা এসেছিল বর্ধমানের দিকে আর সুন্দরবনের দিকে লুঠপাট চালিয়েছিল আরাকান বা মায়ানমারের বাসিন্দা মগেরা। তখনও ইংরেজরা তাদের শাসন শুরু করেনি। জাহাজে করে বাংলায় হাজির হয় মগের দল। সুন্দরবন এবং তার আশেপাশের এলাকায় অবাধ লুঠপাট, অপহরণ, পাচারের সঙ্গে যুক্ত মগেদের ঠেকানোর ক্ষমতা বাংলার সুবেদারদের ছিল না। তার ফলে এক চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়। ক্রমে মগেদের উৎপাত সুন্দরবন ছেড়ে অধুনা পূর্ববঙ্গের কিছু অংশে শুরু হয়। সেই অরাজকতা থেকে তৈরি হওয়া বিরক্তি আজও আমাদের মুখ থেকে প্রবাদ হয়ে বেরিয়ে আসে।

এক-দেড় দশক আগে বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে একটা কথা খুব জনপ্রিয় ছিল- হার্মাদ। এই শব্দের আমদানি পর্তুগিজদের হাত ধরে। যদিও তাদের ভাষাতেও সেই আসল শব্দ নেই, যা থেকে হার্মাদ শব্দের উৎপত্তি। স্পেনের নৌবাহিনীকে বলা হতো আর্মাডা। পর্তুগিজরা এই বাংলায় তাদের বিশাল নৌবহর নিয়ে ব্যবসা করতে এল। আমাদের প্রিয় সবজি আলু তারাই নিয়ে এসেছিল, কিন্তু ব্যবসায় পিছিয়ে পড়ে তাদের মাথায় চাপল দুর্বুদ্ধি। সেই বিশাল নৌবহর নিয়ে তারা শুরু করল জলদস্যুবৃত্তি। লুঠপাট, খুন, পাচার কিছুই তারা বাদ রাখেনি। জলপথে তো বটেই, স্থলপথেও তাদের আতঙ্ক কম ছিল না। ব্যবসায়ী থেকে জলদস্যুতে পরিবর্তনের মতো বাঙালিদের উচ্চারণে 'আর্মাডা' হয়ে গেল হার্মাদ। শব্দটি নৌবহর থেকে জলদস্যুদের অত্যাচার বোঝাতে ব্যবহার হতে লাগল‌।

খরচ করতেই হবে কিন্তু টাকার জোগান সেইরকম নেই। এই পরিস্থিতিতে আমরা বলেই থাকি যে, লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন। হঠাৎ গৌরী সেন টাকা কেন দেবেন? আর গৌরী সেন এত টাকা দেবেন কিভাবে? কলকাতার ব্যবসায়ী গৌরী সেন অংশীদারিতে ব্যবসা করার সময়ে একটা ডুবে যাওয়া জাহাজ নিলামে কিনেছিলেন। তারা শুনেছিলেন যে, ওই ডুবে যাওয়া জাহাজে প্রচুর দস্তা আছে। জাহাজ কেনার পর দস্তা খুঁজতে গিয়ে তারা দস্তার আড়ালে প্রচুর রুপো খুঁজে পান যেগুলো সম্ভবত চোরাচালান করা হচ্ছিল। সেই রুপো পেয়ে গৌরী সেনের ভাগ্য খুলে যায়। অর্থ পেয়ে তিনি হয়তো নিজের জীবনের সংগ্রাম মনে রেখেছিলেন, তাই অসহায় মানুষের অর্থকষ্টে তিনি সাহায্য করতেন। তার দান-ধ্যানের কারণেই শুরু হয় এই প্রবাদ। গৌরী সেন কিন্তু মোটেই কোনও কাল্পনিক চরিত্র না। তাঁর বংশধররা আজও কলকাতা এবং আশপাশের এলাকায় নানারকম ব্যবসা করছেন।

বাংলার ইতিহাস আর বাংলা ভাষার জাদু হয়তো এখানেই। আমরা কেবলই কথা বলি না, তার পিছনে অনেক অজানা গল্প বলি। হয়তো জোর করে বাংলা ভোলার চেষ্টা না করলে এই গল্পগুলো প্রবাদ হিসাবে আরও কয়েকশো বছর বেঁচে থাকবে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।