পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, বেঁচে থাকবে এই দুর্গশহর?


বেশিদিনের কথা নয়। জনযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কিঞ্চিৎ আগে, তাবৎ সরকারি বিধিনিষেধ তখনও বলবৎ হয়নি, এমন একটা সময় খানিক লাইট আর ক্যামেরা নিয়ে শেষবারের মতো বিদেশে গিয়েছিলাম।

 

প্রাথমিকভাবে প্যারিসে দু'পাঁচদিন থাকলেও মূল কাজ ছিল দক্ষিণ ফ্রান্সে। সেখানে নানা শহরে, শহরতলিতে ছিল শুটিংয়ের আয়োজন এবং তার ফাঁকে ফাঁকে আমার তৈরি ছবি দেখানোর ব্যবস্থা। তবে পুইভার্টে ছিল উৎসব। সেখানে অন্যান্য নানা অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমার তৈরি দু'টি ছবির প্রদর্শনী ও পবন দাস বাউলের কনসার্ট। সেই কনসার্টের ছবি তোলাটাও অন্যতম কাজ ছিল আমার। তো সেই মোতাবেক পৌঁছে যাই পুইভার্টে। এই অঞ্চলটি স্পেনের সীমান্ত বরাবর। নানা কারনেই এই দুর্গনগরীর একটা স্থানমাহাত্ম্য আছে। ক্রমে সে প্রসঙ্গে আসব।

 

এখানে প্রাচীন দুর্গ শাতো দ্য পুইভার্ট হলো ত্রুবাদুর সংগীতের আঁতুড়। এই পুইভার্ট শাতোর আদি মালিক ছিল ক্যাথাররা। এরা বিশেষ এক খ্রিস্টান গোষ্ঠী, যারা যিশু ও মেরি ম্যাগদালেনের বংশগতিতে বিশ্বাস করত। রোমান চার্চ এদের পাষণ্ড বিধর্মী মনে করে, এদের নিশ্চিহ্ন করতে উঠেপড়ে লাগে। অজস্র মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারে, তাও ক্যাথাররা নিজেদের বিশ্বাস ছাড়েনি। এই অঞ্চলে এখনও তাদের গল্প, গান ছড়িয়ে আছে।

 

আরও পড়ুন: জঙ্গলমহল আগলে রাখত মালতী-সরস্বতীরা

 

একটি ত্রুবাদুর মিউজিয়াম আছে, যা পুইভার্টকে পীঠস্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যার শুরু হয়েছিল এগারো শতকের আগে-পরের এক সময়। অকসিটান ভাষায় রচিত এই গানে প্রেম আছে, বিষাদ আছে, আনন্দ আছে, বীরত্ব আছে, রাজনীতি আছে, মস্করা আছে, বহুস্তর প্রসারিত কাহিনিও আছে। মধ্যযুগীয় এই গান এক সময় খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কালের বাঁকে বিস্মৃত গান হিসেবে কখনও ইতিহাসের পাতায় তো কখনও লোকচর্চার গভীর শিক্ষায় তা জেগেও থাকে।

 

চতুর্দশ শতাব্দীর ধ্বংসপ্রাপ্ত এই শাতো-টিকে ফরাসি সরকার হেরিটেজ বলে ঘোষণা করেছে ২০০৯ সালে। ফলে আবার একটা খনন, আরও গবেষণা, আরও চর্চার ধারাবাহিক ফলশ্রুতি হলো এই ত্রুবাদুর উৎসব। তা এই উৎসবে চাপ যেমন ছিল ছবি দেখানো ও ছবি তোলার জন্য, তেমনই ছিল এদিকসেদিক ছুটে বেড়ানোর, লোকেশন খোঁজার মজা আর বিস্ময়। পাহাড়ে ঘেরা সবুজের সমারোহে পুইভার্ট অসম্ভব এক দৃষ্টিনন্দন দুর্গশহর।

 

ক্যাসল থেকে শহর সামান্যই দূরে এই শাতো-টির উঁচু স্তম্ভের ছাদে ওঠার ব্যবস্থা আছে। অনেকটা সময় কাটিয়ে সেখানেও চলল আমাদের ছবির দৃশ্যগ্রহণ।

 

আগেই আলাপ হয়েছিল মেলানিয়ার সঙ্গে। সে ত্রুবাদুর মিউজিয়ামের পরিচালক (ডিরেক্টর), কিছুদিন হলো এখানে যোগ দিয়েছে। বুদ্ধিদীপ্ত এই মেয়েটির সঙ্গে কিছুটা মিশে জানতে পারলাম যে, সে মাঝেমধ্যেই তার 'স্থান' পরিবর্তন করে। অর্থাৎ কিনা সে সবে এসেছে স্পেনের একটি শহর থেকে। সেখানে মেলানিয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার দায়িত্বে ছিল। এক কাজ, এক পরিবেশ তার না-পসন্দ। সে কারণেই হয়তো কোনও বাড়িতে থাকে না মেলানিয়া। তার একটা ক্যারাভান আছে (ওদের দেশে বলে রুলোট)। তাতেই তার একার সংসার। সেই ক্যারাভান নিয়েই সে ঘুরে বেড়ায়। মেলানিয়ার সেই গাড়ি আমি অল্পদিনের মধ্যেই নানা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, চা কিংবা কফি খেতে গেছি। সে গাড়ি কখনও জঙ্গলে তো কখনও নদীর ধারে, কখনও গাছের তলায় তো কখনও বা পাহাড়ের কোলে। যখন যেখানে দাঁড়িয়ে, তখন সেটাই তার মহল্লা, সেটাই তার পাড়া।

 

ওর সুবাদেই দেখা গেল ত্রুবাদুর সংগীতের নানা অনুষ্ঠান আর শোনা হলো মিউজিয়ামের সংগ্রহে থাকা প্রাচীন গান। সে গানের মাদকতা লিখে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা আমার নেই। তবু বলি, অসাধারণ সেইসব গায়ক-গায়িকার কন্ঠস্বর। যেমন চড়া, তেমন খাদে খেলে যাচ্ছে অনিবার্য পছন্দের গতিতে। একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। গানের মানে বোঝা সম্ভব ছিল না। তবে কোথাও কোথাও ফরাসি ও ইংরেজিতে গানের তর্জমা করে গানের আগে বলে দেওয়া হয়েছিল। তা ছিল যথেষ্ট উত্তেজক ও আকর্ষণীয়।

 

সে যাই হোক, মেলানিয়া আমায় সঙ্গে করে নিয়ে গেল পুইভার্ট কমিউনে। সাউথ অফ ফ্রান্সের অকসিটানিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এই শহর, শহরতলি যেন অভিজ্ঞ শিল্পীর নিপুণ আঁকা ল্যান্ডস্কেপ। শোনা যায়, এক সময় মনে করা হয়েছিল পৃথিবী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন শুধু বেঁচে থাকবে পুইভার্ট। তার কোনও ক্ষতি হবে না। তখন দলে দলে মানুষ চলে আসে এখানে। বাড়ি বানায়, জমিকে চাষযোগ্য করে তোলে। যেন এক নতুন সভ্যতার পত্তন হয়েছিল সেসময়।

 

মেলানিয়ার ছোট ছোট গল্পে ত্রুবাদুর ইতিহাসের সাংগীতিক আলো-কালোর রঙ মাখা ছিল। তেমনই এক ছায়াঘন পুইভার্টে সন্ধে নামে পাহাড়ি ঢল বেয়ে। অপূর্ব সে চিত্রবিচিত্র ছবিকথা! এখানে মেঘমালারা হাত ধরাধরি করে ঘরে ঢুকে পড়ে। নীল-হলুদ-লাল-সাদা আর রৌদ্রোজ্জ্বল সবুজের খেলা দিনভর চলে, মাতামাতি করে। এখানে মেঘ সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে, অত্যন্ত গম্ভীর চালে, আই মিন ওড়ে। মেলানিয়া কফি দিতে দিতে প্যারিসের আধিপত্যবাদের আগ্রাসী নীতি নিয়ে বলতে থাকে। "আজ কেন সমস্ত লেখক-শিল্পীরা প্যারিস ছেড়ে সাউথ অফ ফ্রান্সে চলে আসছে, কেনই বা ফরাসি সংস্কৃতি বলতে প্যারিস বোঝায় না," ইত্যাদি-প্রভৃতি।

 

মেলানিয়ার কথা শুনতে শুনতেই ওর বিরাট ক্যারাভানের একটুকরো জানালার সামনে গিয়ে দেখি, অদূরেই ছোট্ট পুইভার্ট শহর তখন অন্ধকারে আলো জ্বেলে বসেছে। ভেবে চলেছি, এই যে নানা আলো নানা ছায়া, এই যে আলো-কালো ছাড়িয়ে বর্ণময় ত্রুবাদুর এটিমোলজিকাল মিউজিক, তাকে কি আর শুধু চোখের নাগালে, কানের পরতে সংরক্ষণ করা যাবে! প্রযুক্তির কি সে গরজ আছে? হঠাৎ মেলানিয়া কফি নিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলে , "তুমি কি জানো, স্টিভেন স্পিলবার্গ দিনসতেরো এই পুইভার্টে রেকি করে তারপর এগারো দিন লোকেশন শুটিং করেছিলেন?"

 

আমি তো হতবাক!

More Articles

;