কিংবদন্তি ননী খেপির হারিয়ে যাওয়া, ফিরে আসা...

Ladly Mukhopadhaya
৫ মিনিট
কিংবদন্তি ননী খেপির হারিয়ে যাওয়া, ফিরে আসা...

আউল বাউল সঙ্গচক্রে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হলো মহিলা বাউলদের গান শোনা। আবার গানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই সে ভাবে, কিন্তু তারা দুরন্ত সব সাধনসঙ্গিনী, এমন বাউলানিদের সঙ্গেও দেখা হয়েছে, তারাও স্মরণযোগ্য। বাউল সমাজে মহিলাদের ওপর নিয়মনীতির দড়ি কাঁচি কম। ফলে একজন বাউলানি তার পছন্দ মতো খেপা জোটাতে পারে, মিল না হলে অন্য খেপার সঙ্গে আছলা ঝোলা চাপিয়ে হাঁটা দিতে পারে (এমনকী বারবার পারে)। এখানে গেল গেল রব নেই। ঘরোয়া নিন্দামন্দ যে হয় না তা নয়। তবে তা ওই দু-এক দিনের খোরাক। ক্রমে সবই সরল হয়ে যায় সহজিয়া চলায়। সে কথায় পরে আসা যাবে।

গত শতাব্দীর আশির দশকের প্রথম ভাগে শুরু হয়েছিল আমার মেলাখেলা, উৎসবদিবসী আর মোচ্ছবে মোচ্ছবে পরিব্রাজন। কখনো কখনো দু'তিন মাস ধরে ঘুরে বেড়ানো এ আখড়া থেকে সে আশ্রম, এ মেলা থেকে সে উৎসব। দিন মাসের খবর রাখিনি। সেই সব খোঁজ, অন্বেষণে কত যে হারিয়েছি আর কতো যে পেয়েছি তার হিসেবনিকেশ করা আজ আর সম্ভব নয়। তবে স্মৃতি মাঝে মাঝে মুখভার করে। সে করুক। আমি বরং স্মৃতিবাহী হয়ে ফিরে যাই চার দশক পেছনে। অগ্রদ্বীপের মেলায় তখনো বিদ্যুত সেভাবে ঢোকেনি, মাইকসন্ত্রাস নেই, কিছুটা তফাতে তফাতে আখড়া। সেখানে গান হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বেচাকেনা অনেকটাই কমে যেত আলোর অভাবে। শুধুমাত্র হ্যাজাক হ্যারিকেন জ্বালিয়ে কী ভাবে যেন আখড়াগুলোকে আলোকিত করে তুলতো আখড়াধারিরা। আজ ভাবতেও অবাক লাগে।

সেই আধোআলোতে গান দেখা যেত। গুরুরা বলতেন, 'বাউলা গান বলে আর দেখায়'। তাই বাউল গান চোখ বুজে শুনলে হবে না। তা সে হলো লোকচর্চার বর্ণপরিচয়। এক্ষেত্রে আমার ভূমিকা অতি নগণ্য। ফলে আমার ব্যক্তিগত দেখা আর বোঝাপড়ার মধ্যেই থাকব। অগ্রদ্বীপে সমবচ্ছর চৈত্র মাসের একাদশ তিথিতে গোপীনাথের মেলা বসে। তো গিয়েছিলাম গান শুনতে। কোন আখড়াতে গান হবে এটা একটা বিরাট পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও তদুপরি জানকারির বিষয়। আমি ছিলাম সেক্ষেত্রে ভাগ্যবান। এ বিষয়ে আমার গুরু আই মিন মেলা চেনার পথপ্রদর্শক ছিলেন স্বনামধন্য বাউলগুরু সুবল দাস। তিনিই নিয়ে গেছিলেন

সেবারের অগ্রদ্বীপের মেলায়। আজও তাই আশ্চর্যজনক লাগে সেই মেলাখেলার দিনগুলি রাতগুলি নিয়ে ভাবতে। যে আখড়াতেই যাচ্ছি সেখানে হয় গান হচ্ছে অথবা সুবলদা শুরু করছেন। এক একটি আখড়াতে ঘন্টা দুয়েক থেকে গান শুনে আবার অন্যত্র। সেভাবেই দিনটা কাটলো গান শুনে আর স্বল্পভাষী সুবল গোঁসাইয়ের গল্পকথায়। এরপর সামান্য কিছু খেয়ে নির্দিষ্ট আখড়ায় গিয়ে আসন খুঁজতে হবে যেখানে রাতভর গান।

সুবলদার একটি আখড়ার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, 'এইখানেই প্রশ্ন উত্তরের গান হবে। অখন খেপিরে দেখতে হইবো তিনি তো ভাবের মানুষ।' জিজ্ঞেস করলাম, 'কার কথা বলছেন?' খানিক মুচকি হেসে বললেন, 'আইলেই দেখতে পাইবা।' সেদিন আটটা সাড়ে আটটা থেকেই গান হচ্ছিল মারকাটারি। বেশ কিছু ফকির ছিল সেই আসরে। রহমান ফকির, গোপাল শাহ্ ফকির, জালাল ফকির, ইসমাইল ফকির আর এদিকে নদিয়ার গাহককুল সুবল দাস, কৃষ্ণদাস, অনন্ত গোঁসাই, নন্দরানী, মীরা মোহন্ত। এরা সবাই পাল্টাপাল্টির গানে সিদ্ধকন্ঠ। অগুনতি গান আর তার রকমারি সুরছন্দের মাঝে মুহুর্মুহু ভেসে উঠছিল বৈষ্ণব ভাবধারার প্রশস্তিসূচক ধ্বনি। আসরে বসেছিলাম গাহককুল গা ঘেঁষে।

তখন কি রাত বারোটা কিংবা একটা? মনে নেই ঠিক। বসেছিলাম মূল গানাগান যেখানে হচ্ছে তার কাছাকাছি। গোঁসাই হলেন লাইসেন্স ফলে তার লগে লগে। তেমনি নির্দেশ ছিল ওনার। একজন তখন গান সবে শেষ করেছে। হঠাৎ শুনি আহাহাহাহা বলে এক মহিলা কন্ঠে উল্লাস-সাধিত ব্যারিটোনের মূর্ছনা। তার সঙ্গে অসম্ভব জোরে ডুগিতে চাপড়। আসর যেন একটু থমকিয়ে গেল। সুবলদা বললেন, "ওই আইয়া পড়সে। ঝড় তুইল্যা দিবো।" দেখলাম এক বয়স্ক মহিলা সাদা সারি আর এলোমেলো সাদা চুল উড়িয়ে আসরের দিকে এগিয়ে এলেন। কাঁধে ঝোলানো ডুগি আর হাতে একতারা। একটা পুরোনো শালিমার কোম্পানির নারকোল তেলের টিন কেটে সঙ্গে বাঁশের ব্যাখারি দিয়ে তৈরি সেই একতারা। চেহারায় তীব্র দারিদ্রের ছাপ। অথচ আসরে আসতেই সহশিল্পীদের মান্যতা দেখে বিস্মিত হয়েছি।

ইনি ননী খেপি। প্রায় গোলাপী গায়ের রঙ। সুন্দরী শুধু নয়, তার চেহারার মধ্যে ছিল বৈষ্ণবীয় আভিজাত্য। বাউলফকির সমাজে এই খেপি ছিলেন তৎকালীন জীবন্ত কিংবদন্তি। লিখতে পড়তে জানতেন না। কিন্তু তার গান ও তত্ত্বকথার সমাদর ছিল গ্রামে গ্রামান্তরে। অযুত প্রাচীন পদ ছিল তার নখদর্পণে। লোকে বলতো তিন-চার রাত খেপি গান বলবে কিন্তু একটা পদ দু'বার বলবে না। অগ্রদ্বীপের কাছেই সমুদ্রগড়ে ছিল ননী খেপির সামান্য-সাধারণ আস্তানা। তার খেপা রাধেশ্যাম তার সাথে থাকতেন। বিশাল চেহারার অধিকারী এই খেপা ছিলেন খেপির উল্টো চালের মানুষ, অত্যন্ত কম কথা বলতেন। সর্বত্র ঘুরে বেড়াতেন আর খেপির সঙ্গে আসরে আসরে জুরি বাজাতেন (করতাল)।

সে রাতে ননী খেপি, যাকে বলে জমিয়ে দিলেন। ভোর অবধি গান গাইলেন। যার সিংহভাগ গান কখনো শুনিনি। সমস্ত ভারি পদের তত্ত্বনির্ভর গান। খেপির কন্ঠস্বরটি যেমন চড়ায় বাজে তেমনি খাদেও অসাধারণ বলে। সেই গান শুনতে সেই রাতে একে একে হাজির হলেন তারকা শিল্পীরা। নরোত্তম দাস, বিশ্বনাথ দাস, লক্ষণ দাস (পূর্ণ দাসের ভাই) আর দেখলাম বিরাট সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে হাজির হল সে সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় তরুণ শিল্পী গোষ্ঠগোপাল। আসরের শেষেও, কথায় কথা বাড়ে। সবাই খেপির সঙ্গে ভালোমন্দ দুটো কথা বলতে চায়। ননী খেপি সকলকে তুষ্ট করেন নিজের কায়দায় যার সঙ্গে মূল ধারারত সামাজিক কথার কোনো মিল নেই। সমস্তটাই আউল বাউল তত্ত্বটির পরিবেশনে ভিন্ন জগতের কথা। তবে সুফিতত্ত্বে, মারফতি কিংবা মুর্শিদি গানের এক চূড়ান্ত অভিজ্ঞান টের পাওয়া যেত তার সুর ও তালে, নাচে ও গানে।

তার জীবনের শেষ আট বছর নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি কিন্তু ওই যে কোট আনকোট 'কম পেয়েছি'। কখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দাক্ষিণ্য পাননি এবং চানওনি। একমাত্র গুরুপ্রতিম চলচ্চিত্রকার জর্জ লুনো

ননী খেপির ছবি তুলেছেন। সেসব সংরক্ষণের দায়িত্ব কার সে প্রশ্ন তোলার জন্য এই লেখার আয়োজন নয়। তবে অগুনতি গল্প আছে ননী খেপিকে নিয়ে। তার একটি বলে আপাতত শেষ করব।

শোনা যায়, রাধেশ্যামের সঙ্গে মালাচন্দন হওয়ার পর ননী খেপি হারিয়ে গিয়েছিল। প্রায় বিশ বছর পরে ননী খেপি ফিরে এসে জানায় তাকে ডাকাতরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশে। তিনি যখন বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসছেন আবার এদেশে সেই সময় কোনো এক রাস্তার বাঁকে, কি স্টিমার ঘাটে, বা হাটেবাজারে দেখা হয়ে যায় তার কম বয়সের সাথি রাধেশ্যামের সাথে। সে যেন আবার করে মিলনপর্ব। আজীবন এরপর তারা একে অন্যের ছায়া হয়ে থাকবেন। এটা সত্যি যে, কৌমসমাজ ছাড়া এ ঘটনা দেখা যাবে না। ভদ্দরলোকের সমাজ হলে সেদিনই সমস্ত সম্পর্কের ইতি শুধু নয়। সমাজ তাকে সুস্থ ভাবে বাঁচতেই দিত না। কিন্তু এ যে এক ভিন্ন প্রেমের চলস্রোতা সমাজ, সেখানে আসলে আজও মহাজনী পদাবলী অন্তরে বাজতে থাকে। চন্ডীদাস কহেন,

এমন পিরিতি কভু নাহি দেখি শুনি। পরাণে পরাণে বান্ধা আপনা আপনি।।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

লেপচারা অনেক আগেই 'গীতবিতান' অনুবাদ করে ফেলেছে

ঠিক এই সময়টায় আরেকটি বড়সড় প্রতিরোধ  সংগঠিত হচ্ছিল তিস্তার ওপর সতেরোটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের প্রতিবাদে। নতুন প্রজন্ম সেই সময় লাগাতার অনশন করেছে। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বন্ধু তথ্যচিত্রকার দাওয়া লেপচা প্রায় একশো দিন অনশনে ছিল।

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, বেঁচে থাকবে এই দুর্গশহর?

হঠাৎ মেলানিয়া কফি নিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলে , "তুমি কি জানো, স্টিভেন স্পিলবার্গ দিনসতেরো এই পুইভার্টে রেকি করে তারপর এগারো দিন লোকেশন শুটিং করেছিলেন?"

যাযাবর, অচ্ছুৎ, 'আধা-বেশ্যা'! যেভাবে বাঁচে রাজস্থানের কালবেলিয়ারা

একদিন হয়তো প্রকৃত সমাদর পাবে এই ভেবে নিজেদের প্রস্তুত রাখছে কালবেলিয়ারা।

এই শহরের গোপন গুহা থেকেই লড়াই শুরু স্পার্টাকাসের

রোমান শাসকদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে বিদ্রোহী দাসেরা ও পরে খ্রিস্টানরা এইসব গুহায় লুকিয়ে থাকত।