রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়া যিশুর যন্ত্রণাকে এঁকেছিলেন নন্দলাল, যামিনীরা

Jesus in Paintings : সব থেকে মর্মান্তিক চিত্রটি করেছেন নন্দলাল বসু। সেখানে তিনি দেখাচ্ছেন যিশু তাঁর নিজের কাঁধে নিয়ে চলেছেন মৃত্যুদণ্ড ক্রস-কে।

inscript
৩ মিনিট
রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়া যিশুর যন্ত্রণাকে এঁকেছিলেন নন্দলাল, যামিনীরা

বাংলার মানুষের জীবনে যিশুর প্রভাব এবং মনে যিশুর আসন, প্রভাব হিসেবে দীর্ঘ আর আসন হিসেবে চিরস্থায়ী। শুধুমাত্র শহর নয় গ্রাম সমাজেও নানা ভাবে যিশু এবং মাতা মেরির আপন আসনটি সযত্নে রক্ষিত। সত্যি কথা বলতে কী, যিশুকে নিয়ে তার চলে নিজের সঙ্গে নিজের এক নিজস্ব সাত কাহন। রাজা প্রাণ নেবেন বলে ছোট্ট শিশুর কপাল লিখন। মা বাপের কী জীবনপণ চেষ্টা তাদের সন্তানকে রক্ষা করার! গাধার পিঠে চড়ে রওনা হলেন তারা মিশরের রাস্তায়। বঙ্গ দেশের গ্রাম সুবাদের মানুষ এই কাহিনির আড়ালে দেখতে পেল, ছোট্ট এক কালো শিশুর বাবাও রাজার দণ্ডাদেশের হাত থেকে নিজের বাচ্চাকে রক্ষা করতে কীভাবে পাড়ি দিচ্ছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। তাই হয়তো সেই কারণেই কালাচাঁদের জন্য যেমন বঙ্গদেশে কীর্তন রচিত হয়, একইভাবে বেথলেহেম সন্তানের জন্যও বঙ্গদেশে কীর্তন রচিত হয়। এইভাবেই যিশুর জীবন চর্চার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাংলার মানুষের মন। ঠাকুর গদাধরের একবার ভাব সমাধি হয়েছিল ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো মা মেরির কোলে ছোট্ট যিশুর ছবি দেখে। আবার সেই ঠাকুর গদাধরের অনুগামী হবেন সংকল্প করে বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরুভাইরা যখন আটপৌরে ধুনি জ্বেলে বসেছেন, তখনও তাদের চর্চিত কথনে উঠে এল বাইবেল। সেই দিনক্ষণ মিলে গেল যিশুর জন্মের দিনের সঙ্গে। এমনভাবেই বাংলায় যিশু চর্চার একটি নতুন দিক রচিত হলো।

এমন যিশু চর্চার অভিঘাত পড়েছে বাংলার কোনও কোনও শিল্পীর মধ্যে। এদের মধ্যে যামিনী রায়ের নাম নিতে হয় সবার আগে। বড়দিনের উৎসব শুরু হয়ে গেল কলকাতার গির্জায় গির্জায়। তাদের মধ্যে অন্যতম সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল গির্জা। সেখানে এখন দিনভর চলবে যিশুর স্মরণ। সেই যিশু প্রার্থনায় অংশ নেবেন কত শত সাধারণ মানুষ। তাদের চোখ যাবে গির্জার নানা শিল্প সৌকর্যের দিকে। এই সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল গির্জাতেই রয়েছে যামিনী রায়ের আঁকা একটি ছবি, ‘লাস্ট সাপার’। মনে করা হয় একটি বিশেষ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এমন একটি ছবি এঁকেছিলেন যামিনী রায়।

যামিনী রায়ের চোখে যিশু

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভেলানকান্নি মাতা ও বড়দিনের প্রসাদি

Our Lady of Vailankanni: মা মেরি স্বয়ং এসেছেন ভেলানকান্নিতে। তৈরি হল ‘আওয়ার লেডি অব ভেলানকান্নি’ চার্চ। তবে মা মেরির পরিচিত সাদা গাউনের বদলে এখানে তিনি পরে থাকেন সোনালি শাড়ি। কোলে বালক যিশু।

কলকাতার উপনিবেশে ইংল্যান্ড থেকে লোকজনের আসা যাওয়া লেগে রয়েছে সেকালে। তারা এদেশে নিয়ে আসছেন হরেক প্রকার জিনিসপত্র। লর্ড, ব্যারনদের মূর্তি নিয়ে আসা হচ্ছে কলকাতার চার রাস্তার মাঝে বসাবার জন্য, তারা নিয়ে আসছেন বিভিন্ন পাশ্চাত্য শিল্পীদের তৈলচিত্র, বাগানে বসানোর জন্য তারা জাহাজে করে নিয়ে আসছেন ফোয়ারা নির্মাণের পাথর ভেনাসের মূর্তি ও সঙ্গে আরও নানা কিছু। একদিন মনে করা হলো, কলকাতায় অনেক কিছুর সঙ্গে দরকার গির্জার। সেই মতোই ১৮৩৯ সালে একটি চোখ জুড়নো গির্জা পেল কলকাতা। আর এই চার্চের সঙ্গেই বাঙালির হৃদয় জুড়ে রইলেন শিল্পী যামিনী রায়। সেটা ষাট-সত্তরের দশক। বাংলা তখন নতুন রাজনৈতিক চেতনায় উত্তাল। অন্যদিকে চিনের লড়াইয়ের পর পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াইতে জড়িয়ে পড়তে চলেছে দেশ। এদেশের মানুষ ততদিনে প্রভু যিশুর মধ্যে মনের মানুষের সন্ধান পেয়েছেন। যিশু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছেন, দরিদ্র মানুষের মধ্যে রুটি বিলি করেন নিজের চেতনা থেকে, মানবিকতা বোধ থেকে। এরকম যখন দেশের সময় তখন বিশপ এইচ লাকদাসা জে ডেল মেল চাইলেন খ্রিস্টিয় উপাসনার ধারায় ভারতীয় ভাবনার যোগ ঘটাতে। আর ঠিক তখনই বাঙালি শিল্পীদের নিযুক্ত করার কথা ভাবা হলো গির্জার অলঙ্করণের ছবির জন্য। সেই ভাবনা থেকেই যামিনী রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলাপ আলোচনা করলেন বিশপ।

আর সেই সূত্রেই যামিনী রায় এই গির্জার জন্য আঁকলেন 'লাস্ট সাপার'। আপামর বাঙালির কাছে সেদিন রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নানা দিক উন্মোচিত হচ্ছে। হয়তো এই পরিস্থিতিগুলির সঙ্গে 'লাস্ট সাপার' ছবিটিকে মিলিয়ে দেখেছিল এদেশের মানুষ। আসলে বাইবেলের নৈশভোজের গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে যিশুর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা।

নন্দলাল বসুর আঁকা যিশু, ছবি সৌজন্যে লেখক

শোনা যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রেস থেকেও নাকি যিশুর ছবি ছাপা হয়েছে। সেই ছবির অবশ্য হদিশ মেলে না। শিল্পী ললিতমোহন সেন যিশুকে সঙ্গে নিয়ে মেরি ও জোসেফ মিশরের পথে চলেছেন- এই বিষয়ে ছবি এঁকেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যভাবে এই ছবিতে শিল্পী মাদাম মেরির অবয়বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন উত্তর ভারতের নারীর চরিত্রকে। এও এক অদ্ভুত খোঁজ। তবে সব থেকে মর্মান্তিক চিত্রটি করেছেন নন্দলাল বসু। সেখানে তিনি দেখাচ্ছেন যিশু তাঁর নিজের কাঁধে নিয়ে চলেছেন মৃত্যুদণ্ড ক্রস-কে। লাল কালিতে ভঙ্গুর রেখায় নন্দলাল বসু এঁকেছিলেন যিশুর এমন ছবি। এই হিসেবে দেখতে গেলে ঈশ্বর পুত্রের যন্ত্রণাই ছিল বাংলার শিল্পীদের পছন্দের বিষয়।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।