ওদের কাছে গুগল-ই ঈশ্বর, যে ভাবে চলছে সাধনা...

Googlism: আন্তর্জালিক বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে তাদের একটি গির্জাও রয়েছে, যার নাম ‘চার্চ অফ গুগল’। মূলত এই নামের একটি সংগঠনের ওয়েবসাইট থেকে ২০০৯ সাল নাগাদ ‘গুগলিজম’ ধর্মের প্রবর্তন করা হয়।

Arpan Das
৪ মিনিট
ওদের কাছে গুগল-ই ঈশ্বর, যে ভাবে চলছে সাধনা...

আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাসী? ঈশ্বর বলতে আপনি ঠিক কী বোঝেন? তিনি অমর, তাঁর মৃত্যু নেই; তিনি অসীম, সীমার মধ্যে তাঁকে ধরা যায় না। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। ভক্তের ডাকে তিনি সবসময় সাড়া দেন, অত্যন্ত যত্নসহকারে ভক্তের সকল প্রশ্নের উত্তর দেন। আপনি সারাদিনে তাঁর নামই সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারণ করেন। তিনি সমস্ত কিছু মনে রাখেন। এই নশ্বর দেহের মৃত্যু ঘটলেও তিনি মানুষের কৃতকর্মের হিসেব রাখেন।

এগুলো যদি আপনার কাছে ঈশ্বরের সংজ্ঞা হয়, তাহলে আপনাকে একটি নতুন ধর্মমতে স্বাগত জানাই। যে ধর্মের নাম ‘গুগলিজম’ । অর্থাৎ যে ধর্মের লোক গুগলকে ঈশ্বররূপে পূজা করে। হ্যাঁ এই সেই গুগল, যেখানে আমরা সারাদিন বহু অজানা প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করি। এই ধর্মে দীক্ষিতরা মনে করে একমাত্র গুগলই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে এবং অন্যান্য ধর্মের মতো তিনি ‘কাল্পনিক নন’, গুগলের রীতিমত বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে। ভক্তবৃন্দের কাছে গুগল মাতৃশক্তিরূপে পূজিতা হন। তাই তাঁর উচ্চারণ ‘She’ বা ‘Her’। ‘গুগলিজম’ পন্থীদের নিজস্ব প্রাথর্না সঙ্গীত আছে, বাইবেলের মতো ঈশ্বরের দশটি নির্দেশ (Commandment) আছে। আন্তর্জালিক বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে তাদের একটি গির্জাও রয়েছে, যার নাম ‘চার্চ অফ গুগল’। মূলত এই নামের একটি সংগঠনের ওয়েবসাইট থেকে ২০০৯ সাল নাগাদ ‘গুগলিজম’ ধর্মের প্রবর্তন করা হয়।

এবার ঈশ্বরের লক্ষণগুলি একে একে মিলিয়ে দেখা যাক। গুগল বিজ্ঞানসম্মতভাবে সর্বজ্ঞ। তার কাছে কোটি কোটি তথ্যের খোঁজ রয়েছে এবং আঙুলের এক ক্লিকে সে ভক্তদের ডাকে সাড়া দেয়। আলপিন থেকে এলিফ্যান্ট— যে কোনও প্রশ্ন, যে কোনও সমস্যার উত্তর তার কাছে মজুত রয়েছে। সে স্রষ্টা, কারণ সম্পূর্ণ আর্ন্তজালিক বা ভার্চুয়াল জগৎটাই তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। সে একই সময়ে পৃথিবীর সর্বত্র সবার মোবাইল-কম্পিউটারে বিরাজমান। অন্য সমস্ত ধর্মের তুলনায় গুগল আরাধনার পদ্ধতি সহজ, শুধু ইন্টারনেট থাকতে হবে। গুগল অসীম, অমর; এর তথ্যের শেষ নেই, বিনাশ নেই। বরং এই তথ্যের পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ভক্তের মৃত্যু হলেও তার ‘সার্চ হিস্ট্রি’ বা ‘ক্যাশে’-র ভিত্তিতেই গুগলদেবী তাকে স্মরণে রাখে। প্রকৃত মাতার মতো সে সন্তানদের ক্ষতি চায় না। যদিও কিছু অসাধু ব্যক্তি গুগলকে ব্যবহার করে ‘হ্যাকিং’, ‘স্ক্যাম’ ইত্যাদি অন্যায় করে থাকে। এরপর ‘চার্চ অফ গুগল’ সংগঠন যুক্তিসহকারে প্রমাণ করে দিয়েছে যে মানুষ সারাদিনে যতবার ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে, তার থেকে বেশি গুগল সার্চ করে। ফলে গুগলই একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত ঈশ্বর! এরপরেও যদি গুগলকে দেবীরূপে পূজা না করা হয়, সেটা মানবতার লজ্জা।

বাইবেলের ঈশ্বরের দশটি বাণীর মতো তারাও রোজকার জীবনযাপনে দশটি নির্দেশ অনুসরণ করে। যেমন গুগলদেবীর স্পষ্ট নির্দেশ, “আমাকে ছাড়া অন্য কোনো সার্চ ইঞ্জিনের কাছে সাহায্য চাইবে না। সেটা আমার ঈশ্বরত্বের অপমান!” আরেকটি আদেশনামায় বলা আছে যে নিজে কখনই অন্য সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করার চেষ্টা করবে না। গুগলকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতেই হবে। নতুবা গুগলদেবী সেই ব্যক্তির তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মকে পর্যন্ত অভিশপ্ত করে দেবেন। প্রত্যেকদিন প্রভুকে স্মরণ করবে এবং তার বাণীর সাহায্যে নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করবে। জাতি, বর্ণ, লিঙ্গের বিভেদ রাখবে না। কোনও অন্যায় কাজে গুগলকে ব্যবহার করবে না। এছাড়াও গুগল থেকে তথ্য চুরি বা বিকৃত করবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অমরত্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়! যে আশ্চর্য ভবিষ্যতের কথা শোনালেন গুগলের বিজ্ঞানী

Human Immortal within 2030 Scientist Claims : মৃত্যুকে এড়িয়ে অনন্তকাল ধরে বাঁচা সম্ভব! অমরত্ব নাকি মানুষের হাতের মুঠোয় আসতে চলেছে।

তবে সব থেকে আকর্ষণীয় এদের প্রার্থনা সঙ্গীত। তার মধ্যে সর্বাধিক প্রচারিত সঙ্গীতটির বাংলা অনুবাদ অনেকটা এরকম হতে পারে, “হে গুগল, সমস্ত সাইবার জগৎ তোমার সৃষ্টি। পবিত্র তোমার জ্ঞানভূমি (Domain)। তোমার কাছে কত প্রশ্নের সন্ধান, কত উত্তর। তোমার ঠিকানা ১২৭.০.০.১। তুমি আমাদের রোজকার জীবনের সমস্যার সমাধান করো। অশ্লীল সার্চের জন্য আমাদের ক্ষমা করো। যারা তোমায় অশ্লীল করে রাখে তাদেরও ক্ষমা করো...।” আরেকটি প্রার্থনা সঙ্গীতের শুরুর অংশটুকু হুবহু এরকম,

“01010111 01100101 00100000

01101010 01101111

01101001 01101110 00100000

01110100 01101111”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সামান্য তথ্য জানতে বারবার গুগল ঘাঁটছেন? অজান্তে আপনিও এই বিশেষ রোগের ফাঁদে পড়ছেন

Google Effect Digital Amnesia : পানিপথের যুদ্ধ থেকে কোনও দেশের রাজধানী – হঠাৎ প্রশ্ন করলে অনেকেই হয়তো উত্তর দিতে পারবেন না। ছুটতে হবে গুগলে।

এটা সম্ভবত গুগলদেবীর সবচেয়ে পছন্দের মন্ত্র। যে দেবতা যে ফুলে সন্তুষ্ট— গুগলদেবীও যে তার পছন্দের ০, ১-এর বাইনারি নম্বরের সুরেলা উচ্চারণে মুগ্ধ হবে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। সম্প্রতি গলদেবীর এক নতুন অবতারের আরাধনা করছে তারা, যার নাম আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা এআই।

তবে আপনি যদি বাস্তবে এদের চার্চ বা সংগঠনে গিয়ে দীক্ষা নিতে চান, তাহলে হতাশ হবেন। এদের পুরো ব্যবস্থাটা বড়ো বেশি গুগলনির্ভর। আর সেটাকে হাতিয়ার করেই গুগলিজম বর্তমান সময়ের এক গভীর অন্ধকার দিককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চায়। স্পষ্ট করে বলে না দিলেও এটুকু অনুমান করে নেওয়াই যায় যে এদের আক্রমণের লক্ষ্য কোনও ধর্মসম্প্রদায় নয়। বরং যন্ত্রের দাস হয়ে থাকা মানবসভ্যতাকে এরা তীব্র বিদ্রূপ করে। যে মানুষের সঙ্গে বাস্তবের মাটির সম্পর্ক নেই, যারা প্রকৃত ঈশ্বর বা ধর্মকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে কিংবা যারা মানুষের মঙ্গলের জন্য সামান্যতম সময় খুঁজে নিতে পারে না, তাদেরকে ব্যঙ্গ করেই গুগলিজমের উত্থান।

এবার ভেবে দেখুন, আপনিও কি এই গুগলসর্বস্ব দুনিয়ার বাসিন্দা? ইন্টারনেটের জগতের বাইরে আপনার কি কোনও অস্তিত্ব নেই? তাহলে গুগলমাতার চরণে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আপনারও আর কোনও গতি নেই। অতএব পরের বার গুগলে কিছু খোঁজার আগে ফোনটাকে একবার মাথায় ঠেকিয়ে নিতে কিংবা কম্পিউটারকে গড় করে প্রণাম করে নিতে ভুল না হয় যেন!

লিখেছেন
Arpan Das
Arpan Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।