"যুদ্ধ ঘোষণা করে দিন, কাউকে রেয়াৎ করবেন না," জগদীশচন্দ্রকে কেন বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ?

Acharya Jagadish Chandra Bose: রবি ঠাকুর ও জগদীশ বসুর বন্ধুত্ব কেবল স্মরণীয় হয়ে ওঠেনি, বন্ধু হিসেবে আলাপের পর থেকেই দু'জন দু'জনকে অনুপ্রেরণা দিয়ে এসেছিলেন অবিরত।

Madhurima Pattanayak
৭ মিনিট
"যুদ্ধ ঘোষণা করে দিন, কাউকে রেয়াৎ করবেন না," জগদীশচন্দ্রকে কেন বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ?

১৮৯৭ সালে ইংল্যান্ডের রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে দাঁড়িয়ে বর্ণনা দিয়েছিলেন বেতার সংকেত কীভাবে প্রবাহিত হয়। তাঁর কিছুদিন বাদে কলকাতা ফিরলেন তিনি। দেশবাসী তখন তাঁর প্রসংশায় পঞ্চমুখ। বিজ্ঞানী যেদিন দেশে পদার্পণ করলেন, তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে মানুষের ভিড়ের মাঝে যেন তিলধারণের স্থান নেই। স্বভাবনম্র, জনঅরণ্যবিমুখ কবির বিজ্ঞানীর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে থাকলেও, সেই ভিড়ে তিনি উপস্থিত ছিলেন না সেদিন। দেশে ফেরার দিনকয়েক বাদে যখন জগদীশ বসুর বাড়িতে উপস্থিত হলেন তিনি, দেখলেন জগদীশ বসু তখন বাড়িতে নেই। জগদীশ বসুকে সেই কবি কেবল প্রশংসার চোখেই দেখতেন না, তাঁর প্রতি কবির ছিল অগাধ ভালবাসা। যদিও তাঁকে কখনও সচক্ষে দেখেননি, কিন্তু তাঁর বিজ্ঞান-সম্পর্কিত গবেষণা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন তিনি।

কিন্তু দেখা হল না সেদিন। কবি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা ব্যক্ত করতে, জগদীশ বসুর টেবিলে রেখে এলেন একটি ম্যাগনোলিয়া ফুল। শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সেই সূক্ষ্ম ও নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ, এবং যে বহিঃপ্রকাশ ছিল আড়ম্বরহীন অথচ নিখাদ- তা মনে ধরেছিল জগদীশচন্দ্র বসুর। জগদীশচন্দ্র বসু ও রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্বের আরম্ভ ১৮৯৭ সাল থেকে।

রবীন্দ্রনাথ তখনও বিশ্বকবির স্থান পাননি। তবে তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগ সম্পর্কে অবগত ছিলেন অনেকেই। অন্যদিকে বিজ্ঞানী হলেও, জগদীশচন্দ্র বসুর মধ্যে ছিল এক সুপ্ত কবিসত্তা। নান্দনিকতাবোধের নিরিখে দেখলে দু’জনে ছিলেন সমমনষ্ক। কোথাও গিয়ে সেই বোধই দু’জনের বন্ধুত্বের সূচনা ঘটিয়েছিল। আমরা বরাবরই সাহিত্য ও বিজ্ঞানকে দুই ভিন্ন মেরুর বিষয় বলে জ্ঞান করে এসেছি। অথচ বাংলা প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র লিখেছিলেন যে, "বৈজ্ঞানিক ও কবি, উভয়েরই অনুভূতি অনির্বচনীয় একের সন্ধানে বাহির হইয়াছে। প্রভেদ এই যে, কবি পথের কথা ভাবেন না, বৈজ্ঞানিক পথটাকে উপেক্ষা করেন না।" আদতে বিজ্ঞানী ও কবি, উভয়েই সত্যের অনুসন্ধানী। দার্শনিকও তাই-ই। শুধু প্রত্যেকের সত্যান্বেষণের পথ ভিন্ন।

অন্যদিকে তথাকথিত পদ্ধতিতে শিক্ষালাভের পথে না গেলেও, কবির বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগ জন্ম নিয়েছিল শৈশব থেকেই। তিনি নিজেই বলেছেন, "আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সেকথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বাল্যকাল থেকে বিজ্ঞানের রস অস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না।" দার্শনিক চিন্তাভাবনাকে বাদ দিয়ে বিজ্ঞানচিন্তা বা বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্ভব নয়। পাশাপাশি বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে সম্ভব হয় না দর্শনের পথ চলা। দর্শন ও বিজ্ঞান নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। আর দর্শন ব্যতিরেকে যে সাহিত্য সৃষ্টি হয় না, সে উল্লেখ করা বোধহয় নিষ্প্রয়োজন। কবির লেখনীতে দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞানের মূল ভাবনা যুগপৎ প্রকাশ পেয়েছে।

জগদীশচন্দ্র বসুর লেখনীর গুণমানও কোনও অংশে কম ছিল না। রবীন্দ্রনাথ জগদীশ বসুকে চিঠিতে লিখে জানিয়েছিলেন, তিনি (জগদীশ বসু) বিজ্ঞানকে তাঁর ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি যদি সাহিত্যকেও বেছে নিতেন নিজের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে, তাহলেও দেবী সরস্বতী তাঁর প্রতি সমানভাবে প্রসন্ন হতেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই সমুদ্রতীরে কাদম্বরীর সঙ্গে শেষ ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথের

'সব ঠাঁই মোর ঘর আছে'- বিশ্বভুবন ভ্রমণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু বারবার ফিরেছেন শিকড়ে।

জগদীশচন্দ্র বসু চাইতেন, বিজ্ঞান যেন ভারতবাসীর কল্যাণে লাগে। বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ থাকার সুবাদে রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, মানবজাতির কল্যাণের স্বার্থে বিজ্ঞানের উপযোগিতা কতখানি। চিরকালই তিনি মানবসমাজকে কেন্দ্রে রেখে তবেই বিজ্ঞান বিষয়ে ভেবেছিলেন। যদিও এ-বিষয়ে তাঁর আইনস্টাইনের সাথে বিস্তর মতপার্থক্য ছিল। কারণ আইনস্টাইন কেন্দ্রে রেখেছিলেন বিজ্ঞানকে, মানবজাতিকে নয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জগদীশচন্দ্র বসু পরস্পরকে নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়ে গিয়েছেন জীবনের পথ চলায় । শুধু তাই নয়, কখনও জগদীশচন্দ্র বসুর আবদারে কবি কবিতা লিখেছেন, প্রবন্ধ রচনা করেছেন, গান বেঁধেছেন। কখনও বা রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্রকে বিজ্ঞানসাধনায় প্রাণ সঁপে দিতে মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন।

১৯০০ সালের আগস্ট মাসে জগদীশচন্দ্র বসু সস্ত্রীক পাড়ি দিলেন প্যারিসে। ভারত সরকার ও বাংলার প্রতিনিধি হয়ে পদার্থবিজ্ঞান কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করলেন, উদ্দেশ্য, জড়বস্তুর সংবেদনশীলতা বিষয়ে তাঁর পরীক্ষালব্ধ ফলাফল বিজ্ঞানমহলে ব্যাখ্যা করা। তাঁর লেখা 'On the Similarity of Effect of Electrical Stimulus on Inorganic and Living Substance' প্রবন্ধে তিনি ব্যাখ্যা দেন, চৌম্বকীয় আয়রন অক্সাইডের ওপর বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ প্রয়োগ করলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চৌম্বকত্বের পরিবাহিতার পরিবর্তন কী হারে ঘটছে। এবং তা তিনি লেখচিত্রের মাধ্যমে হাতেনাতে দেখিয়ে দেন। তারই সমান্তরালে তিনি দেখিয়ে দেন, জীবদেহে মাংসপেশীর সাড়া দেওয়ার লেখচিত্রের সঙ্গে পূর্বোক্ত লেখচিত্রের যে সাদৃশ্য রয়েছে।

এই গবেষণা সম্পর্কে ফরাসি ও ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের কী বক্তব্য, কী প্রতিক্রিয়া, সেই বিষয়ে প্যারিসে থাকাকালীনই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিয়মিত পত্র আদানপ্রদান করতেন জগদীশচন্দ্র বসু। ১৯০০ সালের ৩১ আগস্ট রবি ঠাকুরকে একটি চিঠি পাঠান তিনি: “একদিন congress-এর president আমাকে বলিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। আমি কিছু কিছু বলিয়াছিলাম। তাহাতে অনেকে অতিশয় আশ্চর্য হইলেন। তারপর congressএর secretary আমার সহিত দেখা করিতে আইসেন, এবং আমার কাজ লইয়া discussion করেন। এক ঘন্টা পর হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন –but, monsieur, this is very beautiful, (but… -এর অর্থ আমি প্রথমে বিশ্বাস করি নাই)। তারপর আরও তিন দিন এ-সম্বন্ধে আলোচনা হয়, প্রত্যহই more and more excited- শেষ দিন আর নিজেকে সম্বরণ করিতে পারিলেন না। Congress-এর অন্যান্য secretary এবং president-এর নিকট অনর্গল ফরাসী ভাষায় আমার কার্য সম্বন্ধে বলিতে লাগিলেন।

এই গেল প্যারিসের পালা। তাহার পর লন্ডনে আসিয়াছি। এখানে একজন psychologist আমার কার্যের জনরব শুনিয়াই বলিলেন যে, সে কখনও হইতে পারে না, there is nothing common between the living and non-living। আর একজন বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে ৪ ঘন্টা কথা হইয়াছিল। প্রথম ঘন্টায় ভয়ানক বাদানুবাদ, তারপর কথা না বলিয়া কেবল শুনিতেছিলেন, এবং ক্রমাগত বলিতেছিলেন, this is magic! This is magic! তারপর বলিলেন, এখন তাঁহার নিকট সমস্তই নুতন, সমস্তই আলোক। আরও বলিলেন, এইসব সময়ে accepted হইবে; এখন অনেক বাধা আছে। আমার theory পূর্ব সংস্কারের সম্পূর্ণ বিরোধী, সুতরাং কোন-কোন physicist, কোন কোন chemists এবং অধিকাংশ physiologists আমার মতের বিরুদ্ধে দন্ডায়মান হইবেন। কোন-কোন মহামান্য বৈজ্ঞানিকের theory আমার মত গ্রাহ্য হইলে মিথ্যা হইবে; সুতরাং তাঁহারা বিশেষ প্রতিবাদ করিবেন। এবার সপ্তরথীর হস্তে অভিমন্যু বধ হইবে; আপনারা আমোদে দেখিবেন। কিন্তু আপনাদের প্রতিনিধি রণে পৃষ্ঠভঙ্গ দিবে না। সে মনশ্চক্ষুতে দেখিবে যে, তাহার উপর অনেক স্নেহদৃষ্টি আপতিত রহিয়াছে।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চুলের তেলে থামল ঘূর্ণিঝড়! জগদীশচন্দ্র বসুর কল্পবিজ্ঞানের গল্প বিস্ময় জাগায় আজও

Acharyya Jagadishchandra Bose: চাঁদের বিপরীত পিঠে দক্ষিণ অর্ধে প্রায় ৯১ কিলোমিটার আকারের সেই গর্তের নাম 'বোস'।

১৭ সেপ্টেম্বর রবি ঠাকুর প্রত্যুত্তরে জানালেন, “যুদ্ধ ঘোষণা করে দিন। কাউকে রেয়াৎ করবেন না– যে হতভাগ্য surrender না করবে, লর্ড রবার্টসের মত নির্মম চিত্তে তাদের পুরাতন ঘর-দুয়ার তর্কানলে জ্বালিয়ে দেবেন। তারপরে আপনি জয় করে এলে আপনার সেই বিজয় গৌরব আমরা বাঙ্গালীরা ভাগ করে নেব।”

তারপর যখন জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞানীদের আরও সুবৃহৎ মহলে তাঁর জীব ও জড়ের সংবেদনশীলতা বিষয়ক আবিষ্কারের কথা বললেন, যত সহজে পদার্থবিজ্ঞানীরা তাঁর আবিষ্কারকে মেনে নিলেন, জীববিজ্ঞানীরা তত সহজে মেনে নিলেন না। তখন জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণা অহরহ প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। বিজ্ঞানমহল বারে বারে দাবি জানাচ্ছে, তাঁর পূর্বে করা গবেষণাগুলি পুনরায় তাঁদের সামনে করে দেখাতে। শুধু তাই নয়, তাঁর গবেষণাকার্য সম্পর্কিত যে প্রতিবেদনগুলি রয়্যাল সোসাইটির তরফ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল, সেগুলোকেও প্রত্যাহার করে তারা।

জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণা-জীবনে এটি একটি অত্যন্ত কন্টকাকীর্ণ সময় ছিল। আর রবি ঠাকুর নিরন্তর তাঁকে ভরসা জুগিয়ে গেছেন সুদূর ভারতে বসেও।১৯০১ সালে জগদীশচন্দ্র বসু ইংল্যান্ডে গেলেন ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে। ইংল্যান্ডে থাকার মেয়াদ দুই বছর। কিন্তু তিনি নিজেও জানতেন, পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানমহলে স্বনামধন্য বিজ্ঞানীদের সামনে নিজের গবেষণা প্রদর্শন ও হাতে-নাতে প্রমাণ করার জন্য আরও কিছু বছর প্রয়োজন তাঁর। দু'বছর সেই গবেষণার জন্যে যথেষ্ঠ নয়। ইংল্যান্ডে গবেষণার যে পরিকাঠামো রয়েছে, ভারতে তা নেই। তাই দেশে ফিরে এলে আর সম্পূর্ণ হবে না সেই কাজ।

এদিকে তিনি দেশের মাটিতে থেকে দেশের জন্যও কাজ করতে চান। তখন রবি ঠাকুরকে তাঁর নিয়মিত লেখা চিঠিগুলিতে বারে বারে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কঠিন সময়ের কথা, তাঁর মনের দোলাচলের কথা‌। সেই সময়ে শাপে বর হল জগদীশচন্দ্রর জীবনে। একদল ক্ষমতাবান ব্রিটিশের আস্ফালনে তাঁর দেশে ফেরার আপিল বাতিল হল। রবীন্দ্রনাথ বললেন, কেনই বা তোমাকে একটি দেশের একদল শাসকের নির্দেশে দেশে ফিরতে হবে? তুমি থাকো ইংল্যান্ডে, গবেষণার কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করো। খুব সংবেদনশীল হয়ে রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্র বসুকে লিখেছিলেন, সরকারের ক্ষমতার আস্ফালন থেকে যদি না তোমাকে মুক্ত করতে পারি, তাহলে আমি ধরে নেব, আমরা জাতি হিসেবে ব্যর্থ হয়েছি।

কিন্তু জগদীশ বসুর ইংল্যান্ডে থেকে গবেষণা করার পথে আবারও বাধা হয়ে দাঁড়াল অর্থাভাব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সমস্যার সমাধান করতে ত্রিপুরার মহারাজার কাছে অর্থসাহায্য চাইলেন, যাতে ইংল্যান্ডে জীবনধারণ ও গবেষণা সুষ্ঠুভাবে তিনি সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু এত সবের পরেও সরকারি জটিলতা ক্রমাগত বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল জগদীশ বসুর বিজ্ঞানসাধনার পথে। জগদীশচন্দ্র বসুর স্ত্রী, অবলা বসু লিখেছিলেন, সরকারি জটিলতা থেকে জগদীশচন্দ্রকে মুক্ত করার যে অঙ্গীকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর করেছিলেন, সেই অঙ্গীকারই জগদীশচন্দ্র বসুকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল সরকারি ক্ষমতার বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িয়ে ভারতের মাটিতে বিজ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে।

অন্যদিকে ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করলেন, সেই বিষয়ে জগদীশচন্দ্র বসুর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার অন্ত ছিল না। দেশ বা বিদেশ, যেখানেই থাকতেন, রবি ঠাকুরকে লেখা তাঁর প্রতিটি চিঠিতেই শান্তিনিকেতনের উল্লেখ থাকত। তারপর জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নানান কারণে সম্পর্কের অবনমন ঘটে। জগদীশ বসু তাঁর মনঃক্ষুণ্ণতা প্রকাশ না করলেও, অবলা বসুর চিঠি রবীন্দ্রনাথকে আঘাত দিয়েছিল। কখনও বা রবীন্দ্রনাথের পাঠানো চিঠিতে ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন বসু দম্পতি। কিন্তু সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে দুই বছর বাদে এগিয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই। জগদীশচন্দ্র বসুও সাদরে গ্রহণ করেন বন্ধুত্ব পুনরিজ্জীবিত করার আহ্বান।

এদিকে বসু বিজ্ঞান মন্দির স্থাপনের কাজ তখন চলছে। জগদীশচন্দ্র বসু প্রাথমিকভাবে চেয়েছিলেন বসু বিজ্ঞান মন্দিরের শুভ উদ্বোধন হোক ১৯১৬ সালের ৩০ নভেম্বর। কিন্তু সেই সময় রবি ঠাকুর দেশে ছিলেন না। জগদীশ বসু চাননি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুপস্থিতিতে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের উদ্বোধন হোক।বিভিন্ন কারণে উদ্বোধন ঠিক এক বছর পিছিয়ে ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর করা হয়। রবি ঠাকুর গান বেঁধেছিলেন বসু বিজ্ঞান মন্দিরের জন্য- 'মাতৃ মন্দির পুণ্য অঙ্গণ'। যে গান বসু বিজ্ঞান মন্দিরের উদ্বোধনের দিন গাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই গানই হয়ে ওঠে বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানটির স্তবগীতি।

জীবনসায়াহ্নে এসে জগদীশচন্দ্র বসু গ্রীষ্মকাল দার্জিলিংয়ে কাটাচ্ছেন যখন, রবিঠাকুর প্রায়শই দেখা করতে যেতেন তাঁর সঙ্গে। দু'জনের মধ্যে আলোচনা হত বিস্তর। কিন্তু তখন সেই আলোচনা সাহিত্য, কাব্য, কিংবা সংগীত বিষয়ক ছিল না। জীবনের শেষভাগে দাঁড়িয়ে জগদীশচন্দ্র বসু বোঝার চেষ্টা করছেন, জীবন ও মৃত্যুর মাঝে ভেদ নির্ণয় করছে কোন রেখা। এবং জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সীমানাকে দার্শনিক, কবি এবং বিজ্ঞানী কোন নজরে দেখেন, কীভাবে তার ব্যাখ্যা করে। রবীন্দ্রনাথ যোগ দিতেন সেই আলোচনায়।

জীবন-মরণের সীমা ছাড়িয়ে রবি ঠাকুর ও জগদীশ বসুর বন্ধুত্ব কেবল স্মরণীয় হয়ে ওঠেনি, বন্ধু হিসেবে আলাপের পর থেকেই দু'জন দু'জনকে অনুপ্রেরণা দিয়ে এসেছিলেন অবিরত। প্রিয় বন্ধুর আবদারে রবীন্দ্রনাথ একাধিক কাব্য, নাটক, গান লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জগদীশচন্দ্র বসু যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, ঠিক তেমনই বাংলা এবং সর্বোপরি ভারতে বিজ্ঞানচর্চার অন্তরালে রবি ঠাকুরের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।