আত্মাদের সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর ডাকে কে কে সাড়া দিয়েছিলেন জানেন?

By: Sourish Das

November 25, 2021

Share

প্ল্যানচেট এই জিনিসটার ব্যাপারে সবাই নিশ্চই একবার না একবার শুনেছেন। আজকের দিনের বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরা প্রায় সকলেই একবার না একবার হলেও এই প্ল্যানচেট এর ব্যাপারে জানার চেষ্টা তো করেছেন। তবে অধিকাংশই হয়তো হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। আবার অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এমনও অনেক মানুষ রয়েছেন পৃথিবীতে, যারা বিশ্বাস করেন, মৃত্যুর পরেও কোন ব্যক্তির সাথে বা বলতে গেলে তাদের আত্মার সাথে কথোপকথন করা সম্ভব। আর সেই মাধ্যমটা হলো এই প্লানচেট। অশরীরী আত্মার সঙ্গে কথা বলার এই অদ্ভুত পদ্ধতির ব্যাপারে আপনারা নিজেরা কি বিশ্বাস করেন? আগেকার দিনের বহু রথী-মহারথীরা কিন্তু এই জিনিসটা বিশ্বাস করতেন, এবং এই তালিকায় ছিলেন খোদ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম থেকেই অশরীরী আত্মার সঙ্গে কথা বলা, বা বিভিন্ন প্ল্যানচেটের দারুন বিশ্বাসী ছিলেন। শোনা যায় নাকি তিনি বেশ কয়েকবার এই অশরীরী আত্মাদের সঙ্গে কথাও বলেছেন এই মাধ্যম ব্যবহার করে। আবার শোনা যায় নাকি, সত্যজিৎ রায়ের শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হবার পিছনে মূল বিষয়টি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই প্ল্যানচেটের অভ্যাসটি। বিষয়টা খুবই অদ্ভুত শোনাচ্ছে না? চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই প্রেতচক্রের কাহিনী। তবে তার আগে জেনে নেওয়া যাক এই প্ল্যানচেট করার জন্য কি কি লাগে এবং কিভাবে এই চক্র স্থাপন করা হয়।

এই আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সবার আগে যেটা লাগবে সেটা হল একটি প্ল্যানচেট বোর্ড। সেই গোল টেবিলের উপরে ওই বিশেষ বোর্ড রেখে চারদিকে চারজনকে বসতে হয়। বোর্ডের এক প্রান্তে একটি মোমবাতি জ্বলতে থাকে। তারপরে যে মানুষের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার ইচ্ছা তাকে ডাকতে হবে। কবিগুরুর মত অনুযায়ী, তার নাম নিয়ে মনে মনে ডাকতে থাকলে সেই আত্মা আসবে। তবে তার জন্য এই চারজনের মধ্যে একজনকে মিডিয়াম বা মাধ্যম হতে হবে। যদি আপনার প্লানচেট সঠিকভাবে কাজ করে তাহলে যাকে আপনি মিডিয়াম বানিয়েছেন তার শরীরে ওই আত্মা প্রবেশ করবে। তবে তার আগে জানিয়ে রাখা ভাল সকলকে কিন্তু সকলের হাত ধরে থাকতে হবে। আর, যদি আপনি আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চান তাহলে কিন্তু আপনাকে নিজেকে এই বিষয়টি করে একবার দেখতে হবে, না হলে প্লানচেট খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য হয়না।

তবে শুধুমাত্র একটি পদ্ধতিতেই যে প্লানচেট করা যায় সেরকম কিন্তু নয়। বিশ্বে আরো অনেক রকমের পদ্ধতি রয়েছে যেভাবে প্লানচেট করা যায় সেই নিয়ে। তার মধ্যে অন্যতম হলো একটি সাদা কাগজের মাধ্যমে প্লানচেট করা। এর জন্য একটি সাদা কাগজে সমস্ত বর্ণ এবং সংখ্যা একসাথে লিখে রাখতে হবে। সেই কাগজের মাঝখানে একটি তামার কয়েন রাখতে হবে, যার উপরে তিনজনকে নিজেদের তর্জনী দিয়ে আলতোভাবে স্পর্শ করতে হবে। চতুর্থ জনের আঙ্গুল স্পর্শ করা চলবে না। এবারে যাকে আপনি আবার ডাকতে চান তার নাম স্মরণ করুন। যদি আপনার প্ল্যানচেটের পদ্ধতি ঠিকঠাক হয় এবং অন্ধকার ঘরে মোমবাতির আলো ছাড়া অন্য কোন আলোক উৎস না থাকে, তাহলে যাকে মাধ্যম বানিয়েছেন তার শরীরে ওই আত্মা প্রবেশ করবে।

তবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করলেও, একে কখনো ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ কিছু লেখায় আমরা এই বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্ল্যানচেটের সময় বেশিরভাগ সময় মাধ্যম হিসেবে থাকতেন কাব্যগ্রন্থাবলির সম্পাদক মোহিত চন্দ্র সেনের কন্যা উমা। মোহিত চন্দ্র সেন বলতে গেলে রবি ঠাকুরের অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন। আর তার কন্যাকে এই প্ল্যানচেটে মিডিয়াম হিসেবে ব্যবহার করতেন রবি ঠাকুর। শয়নকক্ষের মেঝেতে গোল হয়ে বসে উমা এবং রবি ঠাকুর একসাথে প্লানচেট করতেন। অন্যদিকে, বাকি দু’জনের জায়গা পাল্টাতে থাকতো। কখনো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আবার কখনো নন্দলাল বসু, আবার কখনো মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা মীরা দেবী সকলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্ল্যানচেটের অংশ হয়েছেন।

তবে সবথেকে আকর্ষনীয় বিষয়টি হলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই প্ল্যানচেটের অভ্যাস এর কারণেই নাকি শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেই কাহিনীটা আরো বেশি আকর্ষণীয়। জানা যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আয়োজিত একটি প্লানচেট সভায় আত্মা হিসেবে এসেছিলেন সেকালের স্বনামধন্য কবি সুকুমার রায়, যিনি পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের পিতা। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে সুকুমার রায় মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেতচক্রে হঠাৎ একদিন ধরা দিয়ে তিনি সত্যজিৎ রায় কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি করার কথা বললেন। সেখান থেকেই সত্যজিৎ রায়ের জীবন একেবারে যেন পাল্টে গেল। প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতি বিভাগ থেকে সরাসরি চলে এলেন নন্দলাল বসু এবং রামকিঙ্কর বেজের প্রতিনিধিত্বে তৈরি করা কলাভবনে। তারপর বাকিটাতো ইতিহাস।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী জীবনস্মৃতি তে আমরা বারংবার তার এই বিশেষ প্লানচেট করার বিষয়টি উল্লেখ পাই। তিনি নিজেই লিখেছেন, শেষ জীবনে তার প্লানচেট করার ইচ্ছা আরো বেশি তীব্র হয়ে গিয়েছিল। একাধিকবার তিনি তার বাড়িতে প্ল্যানচেটের আয়োজন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে এই প্ল্যানচেটে নাকি অনেকেই দেখা করতে এসেছিলেন। মৃত প্রিয়জন থেকে শুরু করে অভিন্নহৃদয় বন্ধু, কিংবা সেকালের কোন প্রখ্যাত কবি এবং গল্পকার, সকলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের সচিব কবি অমিয় চক্রবর্তী এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেরাও এই বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন। এমনকি তারা আর তাদের সঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথোপকথন লিপিবদ্ধ করেছিলেন বলেও শোনা যায়।

তাদের লেখনীতে উঠে এসেছে, রবীন্দ্রনাথের প্রিয়জনেরা তার ডাকে সাড়া দিয়ে প্ল্যানচেটে আত্মা হিসেবে এসেছিলেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবী থেকে শুরু করে নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী, জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতা থেকে শুরু করে দুই দাদা সত্যেন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন বলে তারা উল্লেখ করেছেন। তবে, সেই প্ল্যানচেটে নাকি সব থেকে বেশি সাড়া দিতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবথেকে প্রিয় সন্তান শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি মাত্র ১১ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। এছাড়াও কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে শুরু করে সুকুমার রায়, সাহিত্যিক মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, মোহিত চন্দ্র সেন এবং আরো অনেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।

তবে সবথেকে আকস্মিক বিষয়টি হলো, তিনি নিজে যেমন প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করতেন, তেমনি কিন্তু তিনি নিজে তার মৃত্যুর পরেও প্ল্যানচেটে আত্মা হিসেবে ধরা দিয়েছিলেন। পরলোকের বিচিত্র কাহিনী নামক বইয়ে লেখক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ১৯৪৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর একটি প্লানচেট চক্রে আত্মা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন স্বয়ং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই সময় নাকি নিজের শেষ দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি বলেছিলেন, “আমি যখন কলকাতায় দেহ ত্যাগ করলাম, তখন দেখলাম দেহ থেকে কি একটা সাদা কুয়াশার মতো জিনিস বেরিয়ে এলো। আমি দেখলাম আমার দেহটা শয্যার উপর পড়ে আছে। সেই কুয়াশাটা ক্রমে আমার কাছে এলো। আমি তার ভিতরে প্রবেশ করলাম।” যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্লানচেট এর বিষয়টি নিয়ে এখনো কিছুই পরিষ্কার করে জানা যায়নি। তবে, রবীন্দ্রনাথ নিজের নতুন বৌঠানকে যে বেশ কয়েকবার প্ল্যানচেটের মাধ্যমে নিয়ে এসেছিলেন তার উল্লেখ বেশকিছু জায়গাতে তিনি করে গিয়েছেন। তবে তাদের দুজনের মধ্যে কি কথোপকথন হয়েছে, সেটা কিন্তু এখনো অজানা। 

তবে হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে প্রেতচক্রে কিছুটা বিশ্বাস রাখতেন সেটা বলাই বাহুল্য। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিস্তৃত প্রেতযোগের বেশ কিছু বর্ণনা একাধিক লেখায় পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের আটটি ভৌতিক খাতারও সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলে বেশ কিছু জায়গায় উল্লেখ। কিন্তু যাই হোক, রবীন্দ্রনাথের প্লানচেট এবং প্ল্যানচেটে মৃত্যু পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের ধরা দেওয়া, সবকিছুই বিতর্ক তৈরি করে। কিন্তু কিছুটা বিতর্কের উত্তর রবীন্দ্রনাথ নিজেই দিয়ে গিয়েছেন তার লেখায়। তার বেশ কয়েকটি লেখনীতে উল্লেখ, “যে বিষয়টি প্রমাণ করা যায় না, অথবা অপ্রমাণও করা যায় না, সেই সব নিয়ে মন খোলা রাখা উচিত। কখনোই যে কোন এক দিকে ঝুঁকে পড়া উচিত নয়।” সহজ কথায় বলতে গেলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্লানচেট বা প্রেত বিষয়টিকে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু এতটাও বিশ্বাস করতেন না যে আত্মা এবং প্রেতাত্মা নিয়ে অত্যধিক মাতামাতি করবেন। তিনি যেমন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন, ঠিক তেমনই আত্মাতেও বিশ্বাস করতেন, কোন কিছুকেই তিনি অতি বিশ্বাস করতেন না।

More Articles

error: Content is protected !!