রাবীন্দ্রিক ডায়েট || স্ত্রী ছাড়া কারও হাতের জিলিপি খেতেন না রবীন্দ্রনাথ

"আমসত্ত্ব দুধে ফেলি,      তাহাতে কদলী দলি,
            সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে—
হাপুস হুপুস শব্দ            চারিদিক নিস্তব্ধ,
            পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।‘’


'জীবনস্মৃতি'-তে রবীন্দ্রনাথের এই কয়েকটা লাইন প্রমাণ করে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে খাবারের কী বহর ছিল! একেকটা পদের নাম শুনলে খাদ্যে চরম বেরসিকও জিভের জল সামলাতে বাধ্য হবেন। চলুন যাওয়া যাক ঠাকুরবাড়ির হেঁশেলে।

 

কেবল ধনী বলে নয়, ঠাকুরবাড়িকে লোকে চেনে সংস্কৃতিমনস্ক বলে। কিন্তু বাইরের পালাবদল ঘটতে থাকলেও এখানে অন্দরের ব্যবস্থা বদলাতে দেরি হয়। উনিশ শতকের নতুন আলোর দিনেও, আর পাঁচটা বনেদিবাড়ির মতো ‘রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধা’-র সাবেকি চাল পাল্টায়নি সেখানে। মহর্ষিকন্যা সৌদামিনী দেবী ‘পিতৃস্মৃতি’-তে লিখেছেন, "রোজ একটা করিয়া টাকা পাইতাম, সেই টাকায় মাছ তরকারি কিনিয়া আমাদিগকে রাঁধিতে হইত।" ব্যঞ্জনে মিষ্টি দেওয়ার প্রচলন শুরু ঠাকুরবাড়িতেই। এককালের বৈষ্ণব ধর্ম অনুসারী এই বাড়িতে বলা হত ‘তরকারি বানানো’ হচ্ছে, পাছে হিংস্র মনোভাব জাগে, তাই বলা হত না ‘কুটনো কোটা’। কিন্তু এর বদল ঘটেছিল এক জায়গায়। একান্নবর্তী পরিবারের রান্নার গতানুগতিকতার সঙ্গে এখানে মিশেছিল ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব কলাকৌশল। ছিল পরীক্ষানিরীক্ষার ছাপ। সেই ছাপ বেশি করে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন স্বয়ং কবিপত্নী। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, দুপুরবেলা জ্যোতিদাদার জন্য কাছারিতে খাবার পাঠানোর বর্ণনা:

 

আরও পড়ুন: বাউল গান না শুনলে তৈরিই হত না রবীন্দ্রনাথের এই গানগুলো

 

“বউঠাকরুন ফলের খোসা ছাড়িয়ে কেটে কেটে যত্ন করে রুপোর রেকাবিতে সাজিয়ে দিতেন। নিজের হাতের মিষ্টান্ন কিছু কিছু থাকত তার সঙ্গে, আর তার উপরে ছড়ানো হত গোলাপের পাপড়ি। গেলাসে থাকত ডাবের জল কিংবা ফলের রস কিংবা কচি তালশাঁস বরফে-ঠাণ্ডা-করা।”

 

পরবর্তীকালে কবির চা খাওয়ার গল্প শুনিয়েছেন রানী চন্দ, চিনে চা-ই পছন্দ করতেন তিনি। সে চা-ও শুকনো বেল, জুঁই-এর সঙ্গে মিশ্রিত। গরম জলে পড়লেই শুকনো পাপড়িগুলো খুলে ফুলের আকার নিত, দেখে চিনতেন এটা জুঁই, এটা বেলি। আর ছিল নানারকমের পরীক্ষানিরীক্ষা।

 

কবি-স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর রান্না ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে খুব জনপ্রিয় ছিল। তাঁর হাতের রান্না খেতে সবাই খুব পছন্দ করতেন, বিশেষত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি নাকি টকের সঙ্গে ঝাল মিশিয়ে বেশ নতুন পদ তৈরি করতেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও নাকি মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে বসে 'বৈজ্ঞানিক প্রণালীর আহার' রাঁধার উদ্যোগ নিতেন। রাঁধতেন কবিজায়া। নির্দেশ দিতেন কবি। মৃণালিনী দেবীর মানকচুর জিলিপি, দইয়ের মালপো, পাকা আমের মিঠাই কিংবা চিঁড়ের পুলির ভক্ত ছিলেন সবাই। ঠাকুরবাড়ি স্পেশাল তিন ইঞ্চি ব্যাসের লুচিরও আদতে উৎপত্তি নাকি তাঁরই হেঁশেল থেকে।

 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি মিষ্টির নামকরণ করেছিলেন ‘এলোঝেলো’, পরে বদলে রাখেন ‘পরিবন্ধ’। রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের মেয়ে প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী প্রায় গবেষণাই করেছেন এই বিষয়ে। তাঁর ভাঁড়ারে খেজুরের পোলাও, লঙ্কাপাতার চচ্চড়ি, বিটের হিঙ্গি, কাঁচা তেঁতুলের সরস্বতী অম্বল, পেঁয়াজের পরমান্ন ইত্যাদি ছাড়াও ছিল রামমোহন দোলমা পোলাও বা দ্বারকানাথ ফিরনি পোলাও। ১৯১১ সালের ৭ মে, রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল তাঁর তৈরি ‘কবিসংবর্ধনা বরফি’, ফুলকপি ছিল যার মূল উপাদান।

 

দেশে ও বিদেশে নানা ধরনের খাবার খেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শেষ পাতে মিষ্টি খেতে ভালবাসতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী খুব ভালো রান্না করতেন। তাঁর রান্না খেয়ে গুরুদেব অনেকবার প্রশংসা করেছেন।

 

প্রতিদিন সকালে উঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক গ্লাস নিমপাতার রস খেতেন। আশ্রমের শিক্ষক অনিল চন্দের স্ত্রী রানী চন্দ প্রায়ই রান্না করে আনতেন তাঁর জন্য। পায়েস বা বাদামজাতীয় মিষ্টি রবীন্দ্রনাথ ভালবাসতেন।

 

রবীন্দ্রনাথ সারাদিনে বেশ কয়েকবার খেতেন। তিনি ভোরবেলায় খুব তাড়াতাড়ি উঠে পড়তেন, তার দিনের শুরু হত এক কাপ চা অথবা কফি খেয়ে। একটু বেলা হয়ে প্রাতঃরাশে ভেজা বাদাম, মধু সহযোগে টোস্ট এবং এককাপ দুধ। আবার মাঝে মাঝে তার ছোটবেলার প্রিয় খাবার সন্দেশ, কলা দুধে ফেলে মেখে খেতেন। এর পর সকাল দশটা নাগাদ তিনি লেবুর রস খেতেন এবং মধ্যাহ্নভোজনে রবীন্দ্রনাথ ভাত খেতেন, তবে তিনি ভাত খুব অল্প পরিমাণে খেতেন। বিকেলে কবির জন্য বরাদ্দ ছিল মুড়ি ও চা। কবির রাতের খাবারে থাকত সবজির স্যুপ, কয়েকটি লুচি ও তরকারি।

 

ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা রান্না নিয়ে প্রচুর পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন, নিত্যনতুন খাবারের পদ তৈরিতে তাঁরা সবসময় ব্যস্ত থাকতেন। তাঁরা অতি সাধারণ উপাদান, যেমন পটল ও আলুর খোসা দিয়েও সুস্বাদু পদ তৈরি করতেন! রবীন্দ্রনাথের একটি স্বভাব ছিল, তিনি দেশে-বিদেশে যেখানেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতেন সেখানকার মেনুকার্ড তিনি সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলি তিনি সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরে তা চলে যেত ঠাকুরবাড়ির অন্দরে।

 

দেশীয় খাবারের মধ্যে কই মাছের তরকারি, চিতল মাছের পেটি ভাজা, এছাড়া ভাপা ইলিশ, ফুলকপি দিয়ে তৈরি নানা পদ ছিল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয়। এছাড়া মিষ্টি খাবারের মধ্যে পায়েস, চন্দ্রপুলি, ক্ষীর, নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি, দইয়ের মালপোয়া, চিড়ের পুলি, মানকচুর জিলিপি, আমসত্ত্ব- এগুলো খেতে খুবই ভালবাসতেন তিনি। তবে কবিপত্নীর হাতে তৈরি এই বিশেষ জিলিপি ছিল তাঁর খুব প্রিয়। আর কারও হাতে এরকম জিলিপি নাকি তিনি পছন্দ করতেন না।

 

রবীন্দ্রনাথের ফলের প্রতিও একটা আকর্ষণ ছিল। তিনি দুপুরের খাওয়ার আগে ফল খেতেন। যেমন পাকা পেঁপে, কলা, বাতাবি লেবু, আমের সময় আম। তবে আম ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় ফল। বৈশাখ-জ্যেষ্ঠ মাস এলে রবীন্দ্রনাথ ভীষণ খুশি হতেন। কবির জন্মদিনের সঙ্গে এর কি কোনও সংযোগ ছিল? কবি আম কেটে খেতে পছন্দ করতেন না তিনি আম চুষে খেতেন। বৈশাখী ফল বলেই কি তাঁর আমের প্রতি এই অনুরাগ ছিল? সেই নিয়ে আলোচনায় না গিয়েও বলা যায়, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল শিল্প, সাহিত্যের পাশাপাশি খাদ্যের গবেষণাতেও এক মাইলফলক।

 

More Articles

;