রাবীন্দ্রিক ডায়েট || স্ত্রী ছাড়া কারও হাতের জিলিপি খেতেন না রবীন্দ্রনাথ

ঠাকুরবাড়ি মানেই ছিল খাবারদাবার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা

tiasa gupta
৪ মিনিট
রাবীন্দ্রিক ডায়েট || স্ত্রী ছাড়া কারও হাতের জিলিপি খেতেন না রবীন্দ্রনাথ

"আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি,

সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে—

হাপুস হুপুস শব্দ চারিদিক নিস্তব্ধ,

পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।‘’

'জীবনস্মৃতি'-তে রবীন্দ্রনাথের এই কয়েকটা লাইন প্রমাণ করে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে খাবারের কী বহর ছিল! একেকটা পদের নাম শুনলে খাদ্যে চরম বেরসিকও জিভের জল সামলাতে বাধ্য হবেন। চলুন যাওয়া যাক ঠাকুরবাড়ির হেঁশেলে।

কেবল ধনী বলে নয়, ঠাকুরবাড়িকে লোকে চেনে সংস্কৃতিমনস্ক বলে। কিন্তু বাইরের পালাবদল ঘটতে থাকলেও এখানে অন্দরের ব্যবস্থা বদলাতে দেরি হয়। উনিশ শতকের নতুন আলোর দিনেও, আর পাঁচটা বনেদিবাড়ির মতো ‘রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধা’-র সাবেকি চাল পাল্টায়নি সেখানে। মহর্ষিকন্যা সৌদামিনী দেবী ‘পিতৃস্মৃতি’-তে লিখেছেন, "রোজ একটা করিয়া টাকা পাইতাম, সেই টাকায় মাছ তরকারি কিনিয়া আমাদিগকে রাঁধিতে হইত।" ব্যঞ্জনে মিষ্টি দেওয়ার প্রচলন শুরু ঠাকুরবাড়িতেই। এককালের বৈষ্ণব ধর্ম অনুসারী এই বাড়িতে বলা হত ‘তরকারি বানানো’ হচ্ছে, পাছে হিংস্র মনোভাব জাগে, তাই বলা হত না ‘কুটনো কোটা’। কিন্তু এর বদল ঘটেছিল এক জায়গায়। একান্নবর্তী পরিবারের রান্নার গতানুগতিকতার সঙ্গে এখানে মিশেছিল ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব কলাকৌশল। ছিল পরীক্ষানিরীক্ষার ছাপ। সেই ছাপ বেশি করে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন স্বয়ং কবিপত্নী। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, দুপুরবেলা জ্যোতিদাদার জন্য কাছারিতে খাবার পাঠানোর বর্ণনা:

“বউঠাকরুন ফলের খোসা ছাড়িয়ে কেটে কেটে যত্ন করে রুপোর রেকাবিতে সাজিয়ে দিতেন। নিজের হাতের মিষ্টান্ন কিছু কিছু থাকত তার সঙ্গে, আর তার উপরে ছড়ানো হত গোলাপের পাপড়ি। গেলাসে থাকত ডাবের জল কিংবা ফলের রস কিংবা কচি তালশাঁস বরফে-ঠাণ্ডা-করা।”

পরবর্তীকালে কবির চা খাওয়ার গল্প শুনিয়েছেন রানী চন্দ, চিনে চা-ই পছন্দ করতেন তিনি। সে চা-ও শুকনো বেল, জুঁই-এর সঙ্গে মিশ্রিত। গরম জলে পড়লেই শুকনো পাপড়িগুলো খুলে ফুলের আকার নিত, দেখে চিনতেন এটা জুঁই, এটা বেলি। আর ছিল নানারকমের পরীক্ষানিরীক্ষা।

কবি-স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর রান্না ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে খুব জনপ্রিয় ছিল। তাঁর হাতের রান্না খেতে সবাই খুব পছন্দ করতেন, বিশেষত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি নাকি টকের সঙ্গে ঝাল মিশিয়ে বেশ নতুন পদ তৈরি করতেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও নাকি মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে বসে 'বৈজ্ঞানিক প্রণালীর আহার' রাঁধার উদ্যোগ নিতেন। রাঁধতেন কবিজায়া। নির্দেশ দিতেন কবি। মৃণালিনী দেবীর মানকচুর জিলিপি, দইয়ের মালপো, পাকা আমের মিঠাই কিংবা চিঁড়ের পুলির ভক্ত ছিলেন সবাই। ঠাকুরবাড়ি স্পেশাল তিন ইঞ্চি ব্যাসের লুচিরও আদতে উৎপত্তি নাকি তাঁরই হেঁশেল থেকে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি মিষ্টির নামকরণ করেছিলেন ‘এলোঝেলো’, পরে বদলে রাখেন ‘পরিবন্ধ’। রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের মেয়ে প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী প্রায় গবেষণাই করেছেন এই বিষয়ে। তাঁর ভাঁড়ারে খেজুরের পোলাও, লঙ্কাপাতার চচ্চড়ি, বিটের হিঙ্গি, কাঁচা তেঁতুলের সরস্বতী অম্বল, পেঁয়াজের পরমান্ন ইত্যাদি ছাড়াও ছিল রামমোহন দোলমা পোলাও বা দ্বারকানাথ ফিরনি পোলাও। ১৯১১ সালের ৭ মে, রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল তাঁর তৈরি ‘কবিসংবর্ধনা বরফি’, ফুলকপি ছিল যার মূল উপাদান।

দেশে ও বিদেশে নানা ধরনের খাবার খেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শেষ পাতে মিষ্টি খেতে ভালবাসতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী খুব ভালো রান্না করতেন। তাঁর রান্না খেয়ে গুরুদেব অনেকবার প্রশংসা করেছেন।

প্রতিদিন সকালে উঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক গ্লাস নিমপাতার রস খেতেন। আশ্রমের শিক্ষক অনিল চন্দের স্ত্রী রানী চন্দ প্রায়ই রান্না করে আনতেন তাঁর জন্য। পায়েস বা বাদামজাতীয় মিষ্টি রবীন্দ্রনাথ ভালবাসতেন।

রবীন্দ্রনাথ সারাদিনে বেশ কয়েকবার খেতেন। তিনি ভোরবেলায় খুব তাড়াতাড়ি উঠে পড়তেন, তার দিনের শুরু হত এক কাপ চা অথবা কফি খেয়ে। একটু বেলা হয়ে প্রাতঃরাশে ভেজা বাদাম, মধু সহযোগে টোস্ট এবং এককাপ দুধ। আবার মাঝে মাঝে তার ছোটবেলার প্রিয় খাবার সন্দেশ, কলা দুধে ফেলে মেখে খেতেন। এর পর সকাল দশটা নাগাদ তিনি লেবুর রস খেতেন এবং মধ্যাহ্নভোজনে রবীন্দ্রনাথ ভাত খেতেন, তবে তিনি ভাত খুব অল্প পরিমাণে খেতেন। বিকেলে কবির জন্য বরাদ্দ ছিল মুড়ি ও চা। কবির রাতের খাবারে থাকত সবজির স্যুপ, কয়েকটি লুচি ও তরকারি।

ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা রান্না নিয়ে প্রচুর পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন, নিত্যনতুন খাবারের পদ তৈরিতে তাঁরা সবসময় ব্যস্ত থাকতেন।তাঁরা অতি সাধারণ উপাদান, যেমন পটল ও আলুর খোসা দিয়েও সুস্বাদু পদ তৈরি করতেন! রবীন্দ্রনাথের একটি স্বভাব ছিল, তিনি দেশে-বিদেশে যেখানেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতেন সেখানকার মেনুকার্ড তিনি সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলি তিনি সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরে তা চলে যেত ঠাকুরবাড়ির অন্দরে।

দেশীয় খাবারের মধ্যে কই মাছের তরকারি, চিতল মাছের পেটি ভাজা, এছাড়া ভাপা ইলিশ, ফুলকপি দিয়ে তৈরি নানা পদ ছিল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয়। এছাড়া মিষ্টি খাবারের মধ্যে পায়েস, চন্দ্রপুলি, ক্ষীর, নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি, দইয়ের মালপোয়া, চিড়ের পুলি, মানকচুর জিলিপি, আমসত্ত্ব- এগুলো খেতে খুবই ভালবাসতেন তিনি। তবে কবিপত্নীর হাতে তৈরি এই বিশেষ জিলিপি ছিল তাঁর খুব প্রিয়। আর কারও হাতে এরকম জিলিপি নাকি তিনি পছন্দ করতেন না।

রবীন্দ্রনাথের ফলের প্রতিও একটা আকর্ষণ ছিল। তিনি দুপুরের খাওয়ার আগে ফল খেতেন। যেমন পাকা পেঁপে, কলা, বাতাবি লেবু, আমের সময় আম। তবে আম ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় ফল। বৈশাখ-জ্যেষ্ঠ মাস এলে রবীন্দ্রনাথ ভীষণ খুশি হতেন। কবির জন্মদিনের সঙ্গে এর কি কোনও সংযোগ ছিল? কবি আম কেটে খেতে পছন্দ করতেন না তিনি আম চুষে খেতেন। বৈশাখী ফল বলেই কি তাঁর আমের প্রতি এই অনুরাগ ছিল? সেই নিয়ে আলোচনায় না গিয়েও বলা যায়, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল শিল্প, সাহিত্যের পাশাপাশি খাদ্যের গবেষণাতেও এক মাইলফলক।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।