কালী সাধক ও শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা রামপ্রসাদ সেন

Anasuya Sen
৪ মিনিট
কালী সাধক ও শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা রামপ্রসাদ সেন

সাধক ও কবি রামপ্রসাদ সেন চব্বিশ পরগনা জেলার কুমারহট্ট গ্রামে (বর্তমান হালিশহরে) ইং ১৮২২ খ্রীষ্টাব্দে (বাংলা সন ১২২৯ সালে) বৈদ্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন | তাঁর পিতার নাম ছিল রামরাম সেন এবং পিতামহের নাম ছিল রামেশ্বর সেন | রামপ্রসাদ ছিলেন তাঁর পিতার দ্বিতীয় পুত্র |

রামপ্রসাদের পিতামহ ও পিতা সুপন্ডিত ছিলেন | রামপ্রসাদ মেধাবী ছাত্র ছিলেন | পাঠশালার পড়া শেষ করার পর তিনি সংস্কৃত, হিন্দী ও পারসী ভাষা শিক্ষা করেন | মাত্র ২২ বছর বয়সেই তাঁর বিবাহ হয় | তারপর তাঁর তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেন | রামদুলাল নাম এক পুত্র এবং পরমেশ্বরী ও জগদীশ্বরী নাম দুই কন্যা |

পাঠ শেষ হতে-না-হতেই তাঁর পিতৃবিয়োগ হয় অর্থভাবের কারণে তিনি কলকাতার গরানহাটায় দুর্গাচরণ মিত্রের জমিদারীতে মুহুরীর চাকরী করতে শুরু করেন | কিন্তু তাঁর মনপ্রাণ সাংসারিক হিসেবে-নিকাশের অনেক উর্দ্ধের জগতে বিচরণ করত |

জগজ্জননী মা কালীর পাদপদ্মে মনপ্রাণ সমর্পন করে তাঁর চিন্তাতেই কবি সর্বদা নিমগ্ন থাকতেন | এর অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ কবির সমস্তপ্রকার সাংসারিক কাজকর্ম ও নিসাব-নিকাশ এলোমেলো হয়ে যেত | কিন্তু এর পাশাপাশি তাঁর কবিপ্রতিভা স্ফুরিত হতে শুরু করে | সহজ সরল প্রাণের ভাষায় অপূর্ব ছন্দে রচিত সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে তিনি শ্যামা মায়ের পায়ে তাঁর ভক্তির অর্ঘ্য সাজিয়ে দিতে শুরু করেন |

তাঁর ভক্তিভাবের তন্ময়তা এতটাই গভীর হতো যে তিনি স্থান-কাল-পাত্রের বোধ পর্য্যন্ত হারিয়ে ফেলতেন | একদিন তিনি তাঁর চাকরীস্থলে, জমিদারীর আয়-ব্যয়ের হিসাবের পাকা খাতার মধ্যে সম্পূর্ণ ভাবের ঘরে লিখে বসেন -------- "আমায় দে মা তবিলদারী,

আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী |

পদরত্ন-ভান্ডার সবাই লুটে, ইহা আমি সইতে নারি ||

ভাঁড়ার জিম্মা যার কাছে মা, সে যে ভোলা ত্রিপুরারি |

শিব আশুতোষ স্বভাব - দাতা, তবু জিম্মা রাখ তাঁরি ||

জমিদারীর হিসেবের খাতায় এইরকম গান লেখা দেখে প্রধান হিসাব-রক্ষক গানের কোনও অর্থ উদ্ধার করতে পারলেন না | উল্টে রেগে মেগে হিসাবের খাতা নিয়ে জমিদার মশাইয়ের কাছে রামপ্রসাদের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে গেলেন | কিন্তু ফল হলো উল্টো | জমিদার মশাই ছিলেন সুরসিক | তিনি খাতা খুলে গানটি মনোযোগ সহকারে পড়লেন | গানটির ভাববস্তু এবং সাহিত্যমূল্য উপলব্ধি করে অতিশয় মুগ্ধ হলেন |

জমিদার মশাই রামপ্রসাদকে প্রশংসিত করলেন এবং এইরকমের শ্যামা সঙ্গীত রচনায় উৎসাহিত করে বললেন যে তার আর জমিদারীর চাকরী করার প্রয়োজন নেই | জমিদারী থেকে তাকে নিয়মিত ভাবে প্রতিমাসে ৩০টাকা বৃত্তি বরাদ্দ করা হলো | অতয়েব তিনি যেন বাড়ী গিয়ে নিশ্চিন্ত মনে মায়ের আরাধনা ও নামগান করে জীবন কাটান |

এরপর রামপ্রসাদ হালিশহরে ফায়ার আসেন এবং জগজ্জননীর আরাধনায় নিজেকে সমর্পন করে দেন | এর পাশাপাশি চলতে থাকে অবিরত ভক্তি মূলক শ্যামাসঙ্গীত রচনা | তিনি সুগায়ক ছিলেন | স্বরচিত গানে সুরারোপ করে তিনি যখন মনের আনন্দে গাইতেন, তখন সে গান যিনিই শুনতেন তিনিই ভক্তিরসে আপ্লুত হতেন | ক্রমে তাঁর খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে |

কথিত আছে রামপ্রসাদ সেন একদিন তাঁর বাড়ীর বাগানে বেড়া বাঁধছিলেন | একা একা বেড়া বাঁধতে অসুবিধা হওয়ার কারণে রিনি তাঁর একটি মেয়েকে সাহায্য করার জন্য ডেকেছিলেন | সেই মেয়েটি কিন্তু বাড়ীর ভিতরে সংসারের কাজে বাস্থ ছিল, তাই বাবার ডাকে সঙ্গে সঙ্গে আসতে পারেনি | এদিকে, রামপ্রসাদ সেন দেখলেন যে বেড়ার অপর পারে যেন তাঁর মেয়ে এসেছে এবং বেড়ার ফাঁক দিয়ে দড়ি গলিয়ে দিয়ে তাঁকে বেড়া বাঁধতে সাহায্য করছে | রামপ্রসাদ তাই মনের আনন্দে শ্যামাসঙ্গীত গাইতে থাকলেন ও বেড়া বাঁধতে থাকলেন | আসলে রামপ্রসাদের স্বতঃস্পুর্ত্ত ভক্তিগীতি শোনার আগ্রহে তাঁর আরাধ্য দেবী কালী তাঁর কন্যার রূপ ধরে এসেছিলেন | এদিকে অনেক সময় পার হয়ে গেছে, বেড়া বাঁধাও প্রায় সম্পূর্ণ | এমন সময় যে কন্যাটিকে রামপ্রসাদ ডেকেছিলেন, সে এসে হাজির | কন্যাটি যখন দেখল যে বেড়া বাঁধা প্রায় সম্পূর্ণ, তখন সে তাঁর পিতাকে জিজ্ঞাসা করল যে কে এসে তাঁকে বেড়া বাধার কাজে সাহায্য করেছে | কারণ সে এতক্ষন বাড়ীর ভিতর সংসারের কাজে ব্যস্ত ছিল | তখন রামপ্রসাদ উপলব্ধি করলেন যে তাঁর সন্তানের কায়া ধারণ করে স্বয়ং জগজ্জননী এসেছিলেন সাহায্য করতে |

নবদ্বীপের তদানীনন্ত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদকে 'কবিরঞ্জন' উপাধিতে ভূষিত করেন এবং কয়েক বিঘা নিস্কর জমি দেন করেন |

৭২ বছর বয়সে এক কৃষ্ণা-চতুর্দশী তিথিতে পুজো সম্পূর্ণ করে কালীমূর্তি মস্তকে ধারণ করে রামপ্রসাদ গঙ্গাবক্ষে দন্ডায়মান অবস্থায় বিলীন হয়ে গেলেন | সেই সময় গঙ্গাতীরে উপস্থিত অনুগামীরা দেখলেন যে তাঁর দেহ থেকে এক জ্যোতির্ময় পদার্য নির্গত হে শুন্যে অদৃশ্য হয়ে গেল | জনশ্রুতি আজও সেইরকম কথা বলে |

তাঁর রচিত ভক্তিরসসঞ্চিত কবিতাগুলিই রামপ্রসাদী সঙ্গীত নামে আজও বিখ্যাত ও জনপ্রিয় |

বাংলার ভক্তিসাধনার ইতিহাসে তিনি এক উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক হিসাবে আজও সম্মানিত, পূজ্য এবং জনপ্রিয় হয়ে আছেন | ভক্তিপথে যে ঈশ্বরকে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায় এ প্রত্যয় তিনি আপামর বাঙালীর বুকে গেথে দিয়ে গেছেন | সে কারণে, যখন দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিনীর মন্দিরের পুরোহিত শ্রী গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের সাধনা-পর্ব চলছে অথচ মা কালীর প্রকট দর্শন পাচ্ছেন না, তখন তিনি দেবীর উদ্দেশ্যে আক্ষেপ করে বলতেন ------ "মা, তুই রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস, তবু আমাকে দেখা দিছিস না ! কী করলে তোর দেখা পাব বল?"

আগামী বছর (২০২২) সালে তাঁর জন্মের দ্বিশত বর্ষ পড়বে | বাঙালি তাঁকে কী ভাবে স্বরণ করে ও উদযাপন করে তাঁর পথ চাওয়া শুরু হলো |

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?