রবীন্দ্র-ভক্তরা তাড়াতে চেয়েছিল শান্তিনিকেতন থেকে, বলেছিলেন রামকিঙ্কর

গুরুদেব এলেন এই মূর্তি দেখতে। অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন। তারপর বললেন, রামকিঙ্করই আমাকে ঠিক বুঝেছে। আমি স্বর্গ-মর্ত একসঙ্গে দেখতে পাই তো!

গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের শেষের দিক। ইংরেজি সাহিত্য পড়াচ্ছি স্কটিশ চার্চ কলেজে। পাশাপাশি ইংরেজিতে নানা কাগজপত্রে ফিচার লিখি। শুধু যে কলেজে পড়াই, তা নয়। বাড়িতেও ছাত্র-ছাত্রীরা পড়তে আসে। আমার পড়ানোটা একটু প্রথাছুট। ঠিক পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য পড়াই না। আমি ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে শেয়ার করি আমার সাহিত্যবোধ, আমার ভালোলাগা-খারাপলাগা। কবিতা পড়াতে আমার সবথেকে ভালো লাগে। রোম্যান্টিক কবিতা। যারা বাড়িতে পড়তে আসে আমার কাছে, তাদের অধিকাংশই ছাত্রী। ছাত্রীদের মধ্যে আমার প্রিয়তা একটু বেশি।

 

রাত্রিবেলা আমার ব্যস্ততা পড়া বা পড়ানো থেকে সরে যায় লেখালেখিতে। ইংরেজিতেই লিখি তখন। একটা পুরনো টাইপরাইটার আছে। সরাসরি তাতেই লিখি। যেসব কাগজে লিখি, তার অধিকাংশই মরেছে। সিনেমা নিয়ে প্রায় নিয়মিত ফিচার লিখি বম্বের ‘স্টার অ্যান্ড স্টাইল’ -এ। ‘ডেবোনেয়ার’-এ লিখি এমন সব লেখা, যার মধ্যে আদিরসের টান থাকে। মাঝেমধ্যে লিখি ‘অমৃতবাজার’ এবং ‘হিন্দুস্থান টাইমস’-এ। ‘স্টেটসম্যান’-এ বুক রিভিউ করি। নিরঞ্জন মজুমদার, যিনি রঞ্জন নামে খ্যাত, তাঁর বাংলা বই ‘শীতে উপেক্ষিতা’–র জন্য, তিনিই দেখেন বুক রিভিউ বিভাগ। এছাড়া নিয়মিত আর্ট রিভিউ করি, সিনেমা রিভিউ করি, এবং অন্যান্য পছন্দের বিষয় নিয়ে লিখি কবি সমর সেনের ‘ফ্রন্টিয়ার’ ম্যাগাজিনে। এম. জে. আকবরের সম্পাদনায় ‘টেলিগ্রাফ’-এর ‘সানডে’ -তেও লিখেছি কয়েকবার। খুশবন্ত সিংয়ের সঙ্গে আলাপ হল তাঁর ‘নিউ দিল্লি’ পত্রিকায় জেমস বন্ড-এর নারীদের নিয়ে একটি লেখার পর। ‘ইউথ টাইমস’-এর এডিটর তখন ইনিস জাং। ইনিসের কাগজেও অনেক লিখেছি। বম্বে থেকে ‘ফিল্মওয়ার্ল্ড’ বলে একটা দারুণ কাগজ বেরত। সেই কাগজেও অনেক লিখেছি। তখন ভাবতেও পারিনি, কোনওদিন আমি বাংলায় লিখব, কলেজে অধ্যাপনা ছেড়ে বাংলা সংবাদপত্রে সাংবাদিক হব। সাংবাদিকতার সবথেকে বড় টান হল, প্রতিদিন লেখার সুযোগ, এবং প্রায় প্রতিদিন নিজের নামে লেখা দেখার লোভ। এটা যে কত বড় ক্ষতি একজন উঠতি লেখকের পক্ষে, পরে বুঝেছি। এবং সে প্রসঙ্গে পরে আসব। আজকের বিষয় হল, ‘জুনিয়র স্টেটসম্যান’ কাগজে আমার লেখা।

 

‘দ্য স্টেটসম্যান’ হাউস থেকে বেরল ‘জুনিয়র স্টেটসম্যান’। ডাকনাম ‘জে. এস.’। সম্পাদক, খাস ইংরেজ, ডেসমন্ড ডয়েগ। আমার ডাক পড়ল সেই কাগজে ফিচার লেখার জন্য। জে. এস.–এ একজনের লেখা সেইসময় আমাকে খুব মুগ্ধ করেছিল। তাঁর নাম শশী থারুর। জে.এস. জন্মে গিয়েছিল তার সময়ের আগে। এবং আমরা যারা জে.এস.–এ লিখতে শুরু করলাম, তাদের কিন্তু প্রথম থেকেই তালিম নিতে হল ডেসমন্ড ডয়েগের কাছে। বোঝালেন জার্নালিজমের ভাষাকে নতুনভাবে শানাতে হবে। ছোট ছোট তৎপর বাক্য। ভাষা যেন ব্যাকরণের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত না হয়। ভাষা যেন মুখের ভাষার কাছাকাছি হয়ে টপকে যেতে পারে ব্যাকরণের শৃঙ্খল। আর শেখালেন ফিচার লেখার কায়দা এবং ইন্টারভিউ করার কায়দা। বললেন, এমন সব প্রশ্ন করবে, যাতে বিতর্ক হয়। যাতে যাকে ইন্টারভিউ করছ সে যেন মেজাজ হারায়। এবং যে যত বড় সেলিব্রিটি হোক না কেন, শেখালেন পায়ের তলা থেকে কার্পেট সরিয়ে নিতে। শেখালেন সাংবাদিক চাতুর্য, প্যাঁচপয়জার, এবং কপট ভালোমানুষি। তারপর একদিন আমাকে পাঠালেন শান্তিনিকেতনে বিখ্যাত শিল্পী, রবীন্দ্রনাথের আমলের রামকিঙ্কর বেইজকে ইন্টারভিউ করতে। আর হালকা করে বলে দিলেন, মৃদু হেসে, রামকিঙ্করকে খুশি করতে না পারলে উনি ইন্টারভিউ দেন না।

 

আরও পড়ুন: কল্পতরু রামকৃষ্ণের সামনে সেদিন কেঁদে ফেলেছিলেন গিরিশ

 

আমি ভোরের ট্রেন ধরে পৌঁছলাম বোলপুরে। তারপর রিকশায় রামকিঙ্করের বাড়িতে। উনি জানতেন না, আমি যাব। মাটির দাওয়ায় বসেছিলেন। শীতকাল। সম্ভবত সকালের রোদের আরামটুকু ভালো লাগছিল। সারা মুখে খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। বলিষ্ঠ চেহারা। উনি যে ভাস্কর, পাথর কেটে কাজ করেন, বলে দিতে হয় না। তবে এইটুকু বোঝা যায়, রামকিঙ্করের শরীরে ভাঙন ধরেছে। আমি সামনে গিয়ে বললাম, কলকাতা থেকে আসছি, আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি।

 

- কোন কাগজ? জিজ্ঞেস করলেন।

- জুনিয়র স্টেটসম্যান।

 

রামকিঙ্কর কোনও কথা বললেন না। হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে দাওয়া থেকে আমার সামনে ছড়ছড় করে পেচ্ছাপ করলেন। তারপর আবার বসে পড়লেন, ঠিক যেমনটি বসেছিলেন। আমি বললাম, আমার এডিটর আমাকে বলেছে, আপনাকে খুশি না করতে পারলে আপনি ইন্টারভিউ দেন না।

 

- ঠিকই তো বলেছেন।

- কিন্তু উনি বলে দেননি আপনাকে কী করে খুশি করতে হয়।

 

রামকিঙ্কর বেশ কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। তারপর বললেন, তুই না জানিস বাংলা, না জানিস ইংরেজি। কী আর লিখবি তুই?

 

প্রথম পরিচয়ের কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাকে ‘তুই’ বলে কথা? তারপর এইভাবে অপবাদ– না জানিস ইংরেজি, না জানিস বাংলা? আমার হঠাৎ মনে হয়, রামকিঙ্করের ওই হঠাৎ মূত্রত্যাগ আমার প্রতি ঘৃণারই প্রতীকী প্রকাশ!

 

রামকিঙ্কর শিশুর মতো হেসে বললেন, তুই কিন্তু ভারি বোকা। আমার নামের মধ্যেই তো বলা আছে রে আমাকে খুশি করার উপায়। যা, একটা রামের বোতল কিনে নিয়ে আয়। আমি রামের চাকর, বুঝলি! যে রাম দেয়, তাকেই ভালবেসে ইন্টারভিউ দিই।

 

আমি হেসে বললাম, যাক বাঁচা গেল। আমি এক্ষুনি রাম কিনে আনছি।


তখন শান্তিনিকেতনে একটি মাত্র মদের দোকান। এবং খুব কাছে নয়। রিকশা করে যেতে-আসতে যতটুকু সময় গেল। রাম খেয়ে রামকিঙ্কর খুব খুশি। যেন শিশু পেয়েছে তার পছন্দের খেলনা। বললেন, বিকেলে আসবি। তোকে নিয়ে আমার কাজগুলো দেখাব। তারপর কথা বলব।

 

বিকেলে ফিরে যেতেই এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। সাঁওতাল মহিলা। দেখেই বুঝলাম, পরিস্থিতি বেশ খারাপ। মহিলা আমাকে দেখে বিরক্ত। মহিলা বললেন, ওঁর শরীর ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তার মদ খেতে বারণ করেছে তবু আপনারা বোতল এনে দিচ্ছেন। মানুষটাকে তো আপনারাই মেরে ফেলছেন।

 

আমি বললাম, রাম না খেয়ে উনি থাকতে পারেন! তাতে তো আরও শরীর খারাপ হবে।

 

মহিলা বললেন, সেটাই তো বিপদ বাবু। কী যে করি, বুঝতে পারছি না। আপনি একটু বসুন। উনি রাম যখন পেয়েছেন, আপনার সঙ্গে কথা বলবেনই।

 

রামকিঙ্কর সামান্য টলতে টলতে আমার সামনে একটা টুলের ওপর এসে বসলেন। রামের গন্ধে চারধার ম-ম করতে লাগল। রামকিঙ্কর বললেন, একটু পরেই গাড়ি আসছে। তোকে নিয়ে বেরব।

 

আমি তো অবাক! রামকিংকরের মুখে গাড়ি শব্দটা যেন বেমানান লাগল!

 

গাড়ি কিন্তু এল। গাড়ি মানে তাঁর চেনা সাইকেল রিকশা। সেই রিকশাওয়ালার পেটানো চেহারাটি আজও মনে আছে। আমিও তখন নিতান্ত ছোকরা। রিকশাচালক এবং আমি, দু'-জনে রামকিংকরকে নানা দিক থেকে নানাভাবে ধাক্কা দিতে দিতে একসময়ে রিকশার আসনে অধিষ্ঠিত করলাম। এবং তারপর আমি উঠে পাশে বসলাম। রামকিঙ্কর রিকশাচালককে রাজকীয় স্টাইলে বললেন, প্রথমেই নিয়ে চল সুজাতার কাছে।

 

এবার রামকিঙ্কর আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, সুজাতা খুব সুন্দরী ছিল, বুঝলে? আমার ছাত্রী। সুজাতা আমাকে ভালবেসেছিল। আমি সুজাতাকে। সুজাতাকে আমি অমর করে রেখে গেলাম আমার ভাস্কর্যে।

 

সুজাতার সামনে রিকশা গিয়ে দাঁড়াল। অসাধারণ ভাস্কর্য। সুজাতার সঙ্গে থাকলেন না কেন? জানতে চাইলাম।

 

রামকিঙ্কর বললেন, থাকলে কি আর সুজাতার এই মূর্তি তৈরি করতে পারতাম? ভালবাসার মানুষের সঙ্গে থাকলেই সব জুড়িয়ে যায় রে! এই মূর্তিটার মধ্যে যে প্যাশনটা দেখতে পাচ্ছিস, তা আর থাকত না আমার-সুজাতার মধ্যে।

 

এরপর রামকিঙ্কর আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর আর একটি ভাস্কর্য, ‘সাঁওতাল পরিবার’ দেখতে। সাঁওতাল পুরুষ, রমণী, শিশু এবং একটি পোষা কুকুর নিয়ে এই সাঁওতাল পরিবার। রামকিঙ্কর বললেন, দেখ তো কেমন হয়েছে। খুব গরিব সাঁওতাল পরিবার। কিন্তু দেখ কত ভালবাসা আর প্রাণ এদের মধ্যে। এদের একজন না হতে পারলে, ভাল না বাসলে, এই কাজ করা কি সম্ভব, তুই বল?

 

এখনও যখন শান্তিনিকেতনে যাই, একবার দাঁড়াই রামকিঙ্করের ‘সাঁওতাল পরিবার’-এর সামনে। শুনতে পাই সাঁওতাল শিল্পীর কণ্ঠ– আমি এদেরই একজন। তাই তো এইভাবে প্রাণ ঢেলে দিতে পেরেছি।

 

রামকিঙ্কর এবার নিয়ে যান তাঁর তৈরি বুদ্ধদেবের কাছে। আমার মনে হয়, এই বুদ্ধদেব যত না ধ্যানের, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রেমের। বললাম সেকথা। রামের নেশায় জড়ানো কণ্ঠে খুশি হয়ে বললেন রামকিঙ্কর, বুদ্ধদেব তো আমার সুজাতাকেই ভালবাসে।

 

সবশেষে এলাম রামকিঙ্করের রবীন্দ্রনাথের সামনে। তাঁর ঘাড় বেঁকা। তার এক চোখ ওপরের দিকে তাকিয়ে। অন্য চোখ নিচের দিকে। এককথায় আপাতভাবে বেশ কুৎসিত রবীন্দ্রনাথ।

 

রামকিঙ্কর হেসে বললেন, শোন তাহলে, রবীন্দ্রনাথের এই মূর্তি বানাবার পর রবীন্দ্রভক্তরা শান্তিনিকেতন থেকে আমাকে তাড়াতে চাইল। তারা গিয়ে লাগাল রবীন্দ্রনাথের কাছে। বলল, আমি রবীন্দ্রনাথের বিকৃত মূর্তি তৈরি করেছি।

 

-তারপর?

-তারপর আর কী? গুরুদেব এলেন এই মূর্তি দেখতে। অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন। তারপর বললেন, রামকিঙ্করই আমাকে ঠিক বুঝেছে। আমি স্বর্গ-মর্ত একসঙ্গে দেখতে পাই তো!


রামকিঙ্কর বেইজের সেই হাসিটি আজও মনে আছে আমার। বিশ্বজয়ী শিল্পীর হাসি। গভীর এক দার্শনিকের হাসি।

 

গ্রাফিক্স: দীপ হাওলাদার

More Articles