বিবেকানন্দর মন্ত্রোচ্চারণে বেলুড়ে সেদিন যেভাবে শুরু হয়েছিল উৎসব

Ras Festival: বেলুড় রাসবাড়ির ঐতিহ্যমণ্ডিত রাস উৎসবের কথা জানলে অবাক হতেই হয়‌।

Shrabanti Mitra
৪ মিনিট
বিবেকানন্দর মন্ত্রোচ্চারণে বেলুড়ে সেদিন যেভাবে শুরু হয়েছিল উৎসব

পৃথিবীর সব স্তরের মানুষের মধ্যে ভালবাসা বিতরণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড, একদিন ধীরে ধীরে ধর্মীয় ব্যঞ্জনার উৎসবে পরিণত হয়েছিল। যে ব্যঞ্জনায় কেবল মিলন ছিল না, ছিল শক্তি ও ভক্তির মিলিত আরাধনাও। তবে, এই সাজো সাজো রবের আরাধনার মত্ততা থেকে কিছু মানুষ আর কিছু তিথি প্রতিবারই নিজেদের বিযুক্ত করে, অন্তরাত্মার শুদ্ধিকরণের চেষ্টা করে গেছে নিজেদের মতো করে। তেমনই একটি বিশেষ তিথি হলো রাস, যার সূচনা হয় কার্তিক-পূর্ণিমা তিথিতে। সাধারণার্থে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গোপী-দের নৃত্যযোগের রসউল্লাসকেই রাস বলে অভিহিত করি আমরা।

মূলত বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় গড়ে উঠলেও, রাধাকৃষ্ণের এই মিলোনোৎসব বাংলার এক এক স্থানে, এক এক মতে পালন করা হয়। এই মতবিরোধ আমাদের মধ্যে যতটা না তাত্ত্বিক ভাবধারাকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে, তার চেয়ে বেশি তৈরি করে ধর্মীয় দ্যোতনা, যার ফলে উৎসবের ক্ষেত্রগুলো ছোট হয়ে আসে, প্রাধান্য পায় নিজস্বতা।

ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে নবদ্বীপে সূচনা হয় এই উৎসবের। এখানে রাধাকৃষ্ণের সঙ্গে নানা পৌরাণিক হিন্দু দেবদেবীর রূপকেও পূজিত হতে দেখা যায়। নবদ্বীপজুড়ে প্রায় প্রতিটি পুজোতেই শাক্ত রীতির পূর্ণ প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে, নদিয়ার শান্তিপুরের রাস মূলত শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্যর বৈষ্ণব রীতির মূল ভাবধারায় গড়ে উঠলেও, এখানে বৈষ্ণব ও শাক্ত এই দুইয়ের মিলনেই, রাসের প্রেমসাধনার ভক্তি আর লীলার ভাব, একসূত্রে মিলিত হতে দেখা যায়। যার ফলে তিনদিনব্যাপী এই উৎসবে এখানে বিগ্রহ বাড়ি এবং বারোয়ারি পুজোগুলির মধ্যে এই উভয় রীতিরই প্রকাশ দেখতে পাই আমরা। এর পাশাপাশি কোচবিহারের মদনমোহনতলার রাস এবং মণিপুরের রাস উৎসবও পরিচিত সকলের কাছেই।

আজ বলব বেলুড় রাসবাড়ির ঐতিহ্যমণ্ডিত রাস উৎসবের কথা। তবে মূল উৎসব নিয়ে লেখার আগে এই পরিবারে রাসের দিনে ঘটে যাওয়া এক ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কে বেশি প্রাচীন, শান্তিপুর না কি নবদ্বীপ? রাসযাত্রা ঘিরে একাধিক কাহিনি আজও অবাক করে

History of Rash Yatra: নবদ্বীপের না শান্তিপুরের রাস উৎসব, কে বেশি পুরনো এ নিয়ে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া গেলেও একথা বলা হয় রাসের আক্ষরিক পালন শুরু হয় এই শহর থেকেই।

১৮৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। বেলুড় মঠের অদূরে এক বিশাল বাগানঘেরা রাসবাড়ি ভরে গেছে শত শত মানুষের কলতানে। শোনা যাচ্ছে, ভেতরে নাকি স্বামীজি এসেছেন। একটু পরেই বক্তৃতা দেবেন। অসংখ্য মানুষ এক এক করে এগিয়ে আসছেন তাঁকে শুভেচ্ছাবার্তায় ভরিয়ে দিতে। ওদিকে বাগবাজার থেকে নৌকাযোগে এসে পড়েছেন স্নেহধন্যা ভগিনী নিবেদিতাও। উদ্দেশ্য, সকলে মিলে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা। সঙ্গে এই উদযাপনকে কেন্দ্র করে বহু সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনো এবং মাধ্যমেই স্বামীজির আগামী কর্মসূচির লক্ষ্য স্থির করা। এত কিছুর আয়োজন যে স্থানকে ঘিরে, সেই গঙ্গাতীরের রাসবাড়ির কথা বলব আজ।

বেলুড়ের রাস

উত্তর কলকাতার সুবিখ্যাত শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ির দুর্গাপুজোর কথা আমরা এতদিনে প্রায় প্রত্যেকেই জেনে গেছি। তবে দুর্গাপুজো ছাড়াও এই পরিবারের আরেকটি বিশেষ উৎসব হলো রাস, যে উৎসবকে কেন্দ্র করে বেলুড়ের রাসবাড়িতে প্রতি বছর কার্তিক-পূর্ণিমার দিন থেকে শুরু করে টানা ৩ দিনব্যাপী উৎসব পালন করা হয় মন্দির প্রাঙ্গণজুড়ে। বাংলার ১২৯৭ সালের ২১ জৈষ্ঠ‍্য, অর্থাৎ ইংরেজির ১৮৯০ সালের জুন মাসে এই রাসবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন শিবকৃষ্ণ দাঁ-র জ‍্যেষ্ঠপুত্র পূর্ণচন্দ্র দাঁ। মূলত রাধারমণ জিউ-র মন্দির নামে পরিচিত হলেও, বর্তমানে এই রাস বাড়ি দু'টি অংশে বিভক্ত, যার প্রথম অংশে মূল প্রবেশদ্বার থেকে একটু এগিয়েই রয়েছে রাধারমণ জিউর মূল নবরত্ন মন্দির, যা উচ্চতায় প্রায় ৪০ ফুট। এই মন্দিরের গর্ভগৃহে সারা বছর কাঠের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকেন কষ্টিপাথরের বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধিকা। ঠিক এর পাশেই রয়েছে সুসজ্জিত পুনর্নির্মিত রাসমঞ্চ, যেখানে সারা বছর ধরেই দেখতে পাওয়া যায় শ্রীকৃষ্ণের অষ্টসখীদের এবং এর পাশেই রয়েছে নাটমন্দির। রাসমঞ্চের দু'পাশে দণ্ডায়মান দুই নহবতখানা আজও সেজে ওঠে উৎসবের দিনগুলোয়। সারাদিনের পূজার্চনার সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার পাড়ে বসে সানাইয়ের সুর ভেসে এলে মনে হয়, ওই বুঝি অন্তরাত্মা শুদ্ধ হলো সুরের সাধনায়। এই গঙ্গার পাড়েই রয়েছে এই পরিবারের নিজস্ব বাঁধানো ঘাট এবং তার ঠিক দু'পাশেই গড়ে উঠেছে ২১ ফুট উঁচু ছ'টি আটচালা শিব মন্দির গঙ্গার মুখোমুখি। ঠিক মন্দির প্রাঙ্গনের মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে এক সুবৃহৎ ঘড়িস্তম্ভ। গঙ্গাবক্ষে সন্ধের আলো যখন ঝলমলিয়ে ওঠে রাসবাড়িজুড়ে, তখন ঘড়ির স্তম্ভের চতুর্দিক থেকে ঠিকরে আসা আলো দেখে হঠাৎ করে মনে পড়ে যায়, অতীতকালের রাজার বাড়ির ঠাকুরদালানের কথা।

প্রতি বছর কার্তিক-পূর্ণিমার তিথিতে নতুন করে সেজে ওঠে এই রাসবাড়ি প্রাঙ্গন। সেই উপলক্ষে প্রতি সন্ধ্যায় দোলার সিংহাসনে রাধারমন জিউ ও রাধিকাকে বসিয়ে ভক্তিগীত-সহযোগে মূল মন্দির থেকে প্রতিস্থাপন করা হয় রাসমঞ্চে। তারপরেই শুরু হয় সন্ধ্যারতি, বাজি পোড়ানো এবং রাসমঞ্চজুড়ে প্রদীপদানের উৎসব।

কোনও উৎসবই সম্পূর্ণ হয় না মেলা ছাড়া। তেমনই দাঁ-বাড়ির এই উৎসবকে কেন্দ্র করেও বেলুড়ের লালবাবা কলেজের নিকটবর্তী এই অঞ্চলও, হরেক পসরার নানান রঙে সেজে ওঠে প্রতিবার টানা সাতদিন ধরে। তবে, রাস উৎসবের পাশাপাশি এই মন্দিরে পালিত হয় ঝুলন ও জন্মাষ্টমীও।

দাঁ-বাড়ি

এই রাসবাড়ির (বর্তমান নাম রাসবাড়ি গার্ডেন হাউজ) আরেকটি অংশজুড়ে তৈরি হয়েছে সুসজ্জিত বিলাসবহুল হেরিটেজ হোমস্টে, সেখানে একদিকে যেমন রয়েছে থাকবার ও খাবার ব্যবস্থা, তেমনই অপর দিকে রয়েছে পিকনিক করার নানা আয়োজন। তাই ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও যে কোনও সময়ে গঙ্গার পাড়ে দু'দিন হওয়া বদলাবার পরিকল্পনা থাকলে, যে কেউ আরামে কাটিয়ে আসতে পারেন এই গার্ডেন হাউজ থেকে। এই গার্ডেন হাউজে হাওড়া থেকে বালি হয়ে আসা ছাড়াও আরও একটি উপায় হলো বরাহনগরের কুটিঘাট থেকে জলপথে বেলুড়ে আসা।

রাসবাড়ির ভেতর যে স্থানে দাঁড়িয়ে স্বামীজি একদিন মন্ত্রোচ্চারণ করেছিলেন, সেখানেই আজ স্থাপিত রয়েছে তাঁর স্মরণে একটি মূর্তি। এমন এক ইতিহাস-সম্বলিত তীর্থস্থান, যেখানে বৈষ্ণবীয় ভক্তিরসের আরাধনা হয়ে চলেছে বিগত ১৩২ বছর ধরে ইতিহাসের এক বিশেষ মুহূর্তকে সাক্ষী নিয়ে, তেমন যুগ্ম নিদর্শন দেখলে আবারও নতুন করে বিস্মিত হতে হয় আমাদের সময়ের কাছে।

লিখেছেন
Shrabanti Mitra
Shrabanti Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।