ইতিহাসের সত্য সামনে এলে তবেই ফিরবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র

Bangladesh Quota Protest: এবারের ছাত্র আন্দোলনে সবথেকে বড় প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের পুনর্মুল্যায়ন। এই বিনির্মাণের পরিসর তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লেগে গেল।

inscript
৪ মিনিট
ইতিহাসের সত্য সামনে এলে তবেই ফিরবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র

ইতিহাস এভাবেই কখনও ফিরে ফিরে আসে। শুধু পাত্রপাত্রী, কাল, সময়, প্রেক্ষাপট বদলে যায়। তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, ইতিহাসের সত্য চিরকাল চেপে রাখা যায় না। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন, সংগ্রাম করে শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল পুর্ব বাংলার জনগণ। জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বিনিময়ে দিতে হয়েছিল অজস্র প্রাণ। ভেসে গিয়েছিল হাজার হাজার পরিবার। ঊনসত্তর, একাত্তরের গণঅভ্যূত্থানের আখ্যান আজও অস্বীকার করে না বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। বংশপরম্পরায় তারা শোনে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কথা। বাংলাদেশের এমন কোনও পাড়া, মহল্লা, অলিগলি, গ্রাম, মফস্বল নেই, যেখানে বসবাসকারী পরিবারগুলি কোনও না কোনওভাবে ১৯৭১ এর গণসংগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হননি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। সর্বস্তরের লড়াই। বছরের পর বছর যুদ্ধ শুধু আওয়ামী লীগ করেছে এই সম্পূর্ণ মিথ্যা ইতিহাস নির্মিত হয়েছে মূলত এপার-ওপারের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের দৌলতে। তারা কখনও ভুলেও মওলানা ভাসানীর কথা বলেন না। যে বামপন্থী দলগুলো দেশের মধ্যে একাধিক গেরিলা ঘাঁটি গড়ে মুক্তিসংগ্রামে দুরন্ত ভূমিকা নিয়েছিল, তার কথা আওয়ামী লীগের এবং এদেশে তাদের সমর্থক গোষ্ঠী ভুলেও বলে না।

এবারের ছাত্র আন্দোলনে সবথেকে বড় প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের পুনর্মুল্যায়ন। এই বিনির্মাণের পরিসর তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লেগে গেল। ১৯৭১ থেকে ২০২৪ সাল বড় কম সময় নয়। নতুন ইতিহাসের পথ তো সহজ, গোলাপ বিছানো নয়। ফলে রক্ত, জীবন দিয়ে ছাত্রেরা পুরনো ইতিহাসের ভিতে নতুন আখ্যানকে সামনে এনেছে। যা কখনও, কোনওদিনই পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রিয় জনতা ভুলে যাবে না। নকশাল আন্দোলনের সময় এ দেশে যে মূর্তি ভাঙার রাজনীতি জন্ম নিয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। থাকবেও। কিন্তু যুক্তি হিসেবে যা বলা হয়েছিল তা গুরুত্বপূর্ণ। সরোজ দত্ত বলতেন, নতুন সমাজ গড়তে পুরনোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। আমাদের রেনেসাঁ কালের যুগপুরুষদের খড় মাটি রঙ সরিয়ে তাদের আসল চরিত্র বের করে আনতে হবে। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে হবে। কাউকে মহিমান্বিত করতে অপরের অবদান মুছে ফেলা ইতিহাস নয়, গালগল্প। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বছরের পর বছর যে চেনা ন্যারেটিভ আমরা শুনতে অভ্যস্ত, এবারের আন্দোলনে সেই অভ্যাসকে ধাক্কা দিয়েছে বলেই পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাবু ভদ্দরলোকদের মধ্যে 'গেল গেল' রব উঠেছে। বাংলাদেশের শাসকেরা জানে, 'রাজাকার' শব্দ সামনে নিয়ে এলে এপারের ইসলাম ফোবিয়া জেগে উঠবে। মনুবাদী রাজনীতি সর্বশক্তি দিয়ে ওপারের যাবতীয় ইল্লতপনাকে আড়াল করবে , তাই ফ্যাসিবাদী আচরণকে রাজাকারদের ষড়যন্ত্র বলে আসল সমস্যা কে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১১ মাস জেলও খেটেছেন! তবু কেন বাংলাদেশের জনগণের মন রাখতে ব্যর্থ শেখ হাসিনা?

Bangladesh PM Sheikh Hasina: হাসিনা মইনুলকে বলেছিলেন, "আপনারা কাজটা ভাল করেননি। আমি দ্রুত ফিরে আসব এবং তখন আপনাদের কাউকে ছেড়ে কথা বলব না।"

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছে, এরকম রাজনৈতিক হিংসা স্বাধীন দেশ সেভাবে দেখেনি। অবাক হয়ে মাঝেমধ্যে ভাবি, ১৯৭২- ৭৪ সালের বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা কেন সেভাবে হয় না! আর কেউ না জানুক, যে রাশেদ খান মেনন এখন শেখ হাসিনার অনুগামী হয়ে ছাত্র আন্দোলন দমন করতে রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হিতোপদেশ দেন, তিনি তো জানেন কিভাবে ৭২-৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় রক্ষী বাহিনী হাজার হাজার বাম কর্মী সমর্থকদের খুন করেছিল। কত কত পরিবারের উপরে চরম অত্যাচার করা হয়েছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অগণিত মৃত্যু, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস! শাসক-বিরোধী সংঘর্ষে কতটা ক্ষয়ক্ষতি বাংলাদেশে?

Bangladesh Quota Protest: অবশেষে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট মুক্তিযুদ্ধের আত্মীয়দের জন্য সংরক্ষিত কোটা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার রায় দিয়েছে।

একের পর এক ঘটনা লেখা যায়, যা শুনলে অনেকের ভাবমূর্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে। বিরোধিতা করলেই বাচ্চা বুড়ো সবাইকেই 'রাজাকার' যারা বলেন, তাদের মনে পড়বে না হয়তো, কিন্তু অনেকে এখনও জানেন কীভাবে রক্ষী বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল বিপুল সংখ্যক সাধারণ জনতাকে। একটা ঘটনা বলি, ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে রক্ষীবাহিনী নকশালপন্থী নেতা শান্তি সেনের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে তার ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী অরুণা সেন, ছেলের বৌ তরুণী রীণা ও পড়শী কিশোরী হনুফাকে ধরে নিয়ে যায়। অরুণা সেনকে ঠান্ডা জলে চুবিয়ে রাখা হয়। দুই তরুণীকে নানাভাবে অত্যাচার করা হয়। পরে এই ঘটনা সামনে আসার পর সমাজের নানা মহলে হইচই পড়ে যায়। আদালতে মামলা করলে পুরো বিষয়টি সামনে আসে। এরকম আরও অনেক নির্মম ঘটনা সাল, তারিখ, এলাকা বলে বলে প্রমাণ করে দেওয়া যায়। আওয়ামী লীগের আজকের চেহারা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ফ্যাসিস্ট সুলভ চেহারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে আড়ালে ছিল। মুক্তিযুদ্ধ কখনও কল্পনা করেনি, এই দেশ তাকে দেখতে হবে একদিন। ঋত্বিক ঘটক এক সাক্ষাৎকারে দুঃখ করে বলেছিলেন, "যে স্বপ্নের বাংলাদেশের কথা ভেবেছিলাম তার পরিনতি হতাশ করেছে আমাকে।" তিনি আরও বলেছিলেন, "মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই এখন ডাকাত হয়ে গেছে।"

সুতরাং মুক্তিযোদ্ধা ট্যাগ সরকার লাগিয়ে দিলেই সঙ্গে সঙ্গে তা মহান হয়ে যায়, এমনটা মোটেও না। ফলে মহান মুক্তিযুদ্ধের একমাত্রিক গল্প শুনতে শুনতে শব্দের গাম্ভীর্য নষ্ট হয়ে গেছে, এতে তো অবাক হবার কিছু নেই। ১৯৭৩ সাল থেকেই তো আওয়ামী লীগ ভোটে কারচুপি করে জিতছে। এ কে না জানে! বয়স্ক মানুষদের নিশ্চিত তা মনে আছে। রাশেদ খান মেনন, কীভাবে বরিশালে তাকে জয়ী ঘোষণা করেও হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অনেকেই ভোলেননি। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর বিরাট ভূমিকা ছিল তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি মদতে জেনারেল উবানের প্রত্যক্ষ দায়িত্বে যে মুজিব বাহিনী গড়ে উঠেছিল, তার ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তা বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কাছেও পরিস্কার ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাজউদ্দীন আহমদকে কারা খুনের চেষ্টা করেছিল, তার নতুন করে তদন্ত হোক। বাংলাদেশের গণতন্ত্র সেদিনই ফিরবে, যেদিন চেপে রাখা ইতিহাস জনগণের সামনে আসবে। ফ্যাসিবাদ একদিনে জন্মায় না। তার শিকড় খুঁজতে হবে অতীতের কার্যকলাপের মধ্যে দিয়েই।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।