চুলের তেলে থামল ঘূর্ণিঝড়! জগদীশচন্দ্র বসুর কল্পবিজ্ঞানের গল্প বিস্ময় জাগায় আজও

Acharyya Jagadishchandra Bose: চাঁদের বিপরীত পিঠে দক্ষিণ অর্ধে প্রায় ৯১ কিলোমিটার আকারের সেই গর্তের নাম 'বোস'।

Raktim Dey
৩ মিনিট
চুলের তেলে থামল ঘূর্ণিঝড়! জগদীশচন্দ্র বসুর কল্পবিজ্ঞানের গল্প বিস্ময় জাগায় আজও

হেমেন্দ্রমোহন বসু বাংলার একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৮৯৬ সালে নতুন পণ্য 'কুন্তলীন' নামে মাথার চুলের তেল বিক্রির প্রচারের জন্য তিনি এক নতুন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। তিনি এক ছোট গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। সেই প্রতিযোগিতায় সকলের অংশগ্রহণ করার অনুমতি ছিল এবং বিজেতার জন্য বিশেষ পুরস্কারের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। সেই ছোট গল্পের প্রতিযোগিতার একটিমাত্র শর্ত ছিল যে, গল্পের মধ্যে সেই চুলের তেলের কথা লিখতে হবে অথবা তেলটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতায় বহু গল্প জমা পড়েছিল। যেই গল্পটা সর্বশ্রেষ্ঠ গল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, তার পটভূমিকায় এক ব্যক্তি কলকাতাকে তছনছ করে দিতে পারা একটি ঝড়কে সেই চুলের তেলের ব্যবহার করে থামিয়ে দিয়েছিল। সেই গল্পের নাম ছিল 'নিরুদ্দেশের পথে'। এই গল্পটিকে আধুনিক ভারতে লেখা শুরুর দিকের কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গল্প হিসেবে গণ্য করা হয়। পটভূমি পড়ে গল্পটিকে সম্পূর্ণ আজগুবি বলে মনে হয়। যদিও কল্পনার সাহায্য নিলেও লেখক এই গল্প থেকে বিজ্ঞানকে ছুটি দিয়ে দেননি। বিজ্ঞানের বহু ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই গল্পের মধ্যে ছিল। এই গল্পের লেখক ছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। পরবর্তীকালে এই গল্পটিকেই ঘষামাজা করে সম্ভবত তিনি তার 'অব্যক্ত' গ্রন্থের 'পলাতক তুফান' গল্পটা লিখেছিলেন, কারণ এই দু'টি গল্পের বহু মিল রয়েছে।

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর নাম বললে সাধারণ মানুষের মনে তাঁর বিজ্ঞানী সত্তার কথাই সর্বাগ্রে উঠে আসে। 'গাছের প্রাণ আছে' প্রমাণ করেছিলেন জগদীশ বসু, একথা আজ সর্বজনবিদিত। যে বিজ্ঞানী এমন এক প্রাকৃতিক সত‍্য তুলে আনছেন, তাঁর যে প্রকৃতির প্রতি প্রেম থাকবে, তা স্বাভাবিক। ১৯১৫ সালে বিক্রমপুরে আয়োজিত এক সভায় জগদীশচন্দ্র বসু বলেছিলেন যে, তিনি ছোটবেলায় পাখি, জীবজন্তু, গাছ এবং পরিবেশের বহু গল্প শুনেছিলেন। সেই গল্পগুলি শোনার ফলেই প্রকৃতির কাজ করার ধরন সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ জন্মেছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তিনি না থাকলে জানাই হত না সমুদ্র তলদেশকে! প্রথম মহিলা ভূতত্ত্ববিদের লড়াই আজও অন্তরালে

Google Doodle Marie Tharp: হেনরিখ বেরানের সহযোগিতায়, থার্প এবং হিজেন পৃথিবীর সমগ্র মহাসাগরের তলদেশের মানচিত্র তৈরি করেন, যা ১৯৭৭ সালে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ থেকে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ওশান ফ্লোর’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

বেতার আবিষ্কার করে হয়তো নোবেল পেতে পারতেন জগদীশ বসু, কিন্তু কিছু ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি ব্রাত্য থেকে গিয়েছিলেন। বেতার আবিষ্কারের কৃতিত্ব অথবা বেতার আবিস্কারের পুরস্কার, কোনওটাই তিনি পাননি। যদিও বেতার আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দীর্ঘদিন কেউ অবহেলা করতে পারেনি। তাই চাঁদের একটি গর্তের নাম তাঁর নাম অনুসারে দেওয়া হয়েছে। চাঁদের বিপরীত পিঠে দক্ষিণ অর্ধে প্রায় ৯১ কিলোমিটার আকারের সেই গর্তের নাম 'বোস'। জগদীশচন্দ্র বসুর নোবেল না পাওয়া অথবা ভারতীয় হওয়ার কারণে বিদেশে তাঁকে গবেষণাগার ব্যবহার করতে না দেওয়া সম্পর্কে আপামর বাঙালির আক্ষেপ থাকলেও তাঁর কিছু কৃতিত্ব সম্পর্কে বাঙালি খুব একটা আলোচনা করে না। জগদীশচন্দ্র বসু প্রথম এশিয়ার মানুষ হিসেবে একটি আমেরিকান পেটেন্ট পেয়েছিলেন। তাঁকে নাইটহুড দিয়ে ভূষিত করা হয়েছিল। ভারতে গবেষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে গবেষণার জন্য তিনি ১৯১৭ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দির স্থাপন করেছিলেন। এই গবেষণাগারে বর্তমানে বহু গবেষক নিজেদের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞানের প্রতি অবদানের কথা আলোচনা হলেও সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান সম্পর্কে খুব একটা আলোচনা হয় না। তাঁর সাহিত্যের ক্ষেত্রে কোথাও বিজ্ঞান এবং সাহিত্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মাথার চুলের তেল দিয়ে ঘূর্ণিঝড় থামানোর পিছনে একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল। তাঁর লেখা 'নিরুদ্দেশের পথে' গল্পে বাটারফ্লাই এফেক্টের মতো বিষয় দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় নগণ্য একটা পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে যে পরবর্তী ক্ষেত্রে কত বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারে, সেই প্রমাণ এই গল্পে পাওয়া যায়। ১৯৩৭ সালে ২৩ নভেম্বর গিরিডিতে জগদীশচন্দ্র বসু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

তথ্য ঋণ: ফ্যাক্টর ডেইলি, এবিপি লাইভ

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?