বলা হত 'হিউম্যান কম্পিউটার', লিখেছিলেন সমকামিতা নিয়ে বই || আজও বিস্ময় এই মহিলা গণিতজ্ঞ

কিছুদিন আগে মুক্তি পেয়েছিল শকুন্তলা দেবীর বায়োপিক। বিদ্যা বালান অভিনীত সেই ছবিকে কেন্দ্র করে বহু মানুষ আবার উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন ‘দ্য হিউম্যান কম্পিউটার’-এর বিষয়ে। অনু মেননের এই ছবিটি অনেকের মধ্যে নতুন করে আগ্রহও তৈরি করেছিল। এ প্রজন্মের অনেকে হয়তো জানতেনই না শকুন্তলার ব্যাপারে। তারাও নতুন করে জানার সুযোগ পেলেন। বিশ্বখ্যাত শকুন্তলা বহু গুণের পরিচয় দিয়েছেন। বছরতিনেক বয়েস থেকেই গণনায় মানুষকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল। এছাড়াও বক্তব্যের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দান, বা মোটিভেশনাল স্পিচ প্রদান বা বিভিন্ন বিষয়ে বই রচনা— সবেতেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন শকুন্তলা। একাধারে লেখিকা ও গণিতজ্ঞ এই নারীর জীবন সমগ্র বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে। যদিও তাঁকে ঘিরে নানা সময় গড়ে উঠেছে নানা বিতর্ক। বিশেষত সমকামীদের জীবন নিয়ে তাঁর কাজকর্ম সমাজের মূল স্রোত যেমন মেনে নিতে পারেনি, তেমনই নিজে বিষমকামী হয়ে, বহিরাগতর দৃষ্টিতে সমকামী জগৎকে দেখার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবু নিজের লড়াইয়ে, অর্জনে সেসব ছাপিয়ে গিয়েছেন তিনি। একের পর এক পুরুষের দুনিয়ায় নিজের প্রতিভা সম্বল করে স্থান করে নিয়েছেন। ব্যক্তিজীবন সব সময় খুব সুখের ছিল না। দীর্ঘ জীবনে নানাভাবে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন তিনি। ২০১৩ সালে ঠিক আজকের দিনটিতে মারা যান এই বিশ্ববরেণ্য নারী। আজ তাঁর মৃত্যুদিনে জেনে যাওয়া যাক তাঁর জীবন সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

প্রতিভার প্রথম পরিচয়

১৯২৯ সালের ৪ নভেম্বর, ব্যাঙ্গালোরের একটি পরিবারে তাঁর জন্ম। শকুন্তলার যখন বছরতিনেক বয়েস, ওঁর বাবা এক অভাবনীয় ঘটনা লক্ষ করলেন। যে সংখ্যাই দেখেন, অবিকল মুখস্থ করে ফেলেন শকুন্তলা। শকুন্তলার বাবা সেসময় কাজ করতেন একটি সার্কাস কোম্পানিতে। সেসব ছেড়েছুড়ে রাস্তায় রাস্তায় প্রদর্শনী করা শুরু করলেন তিনি মেয়েকে নিয়ে। মেয়ের ক্ষমতায় অভিভূত দর্শকেরা। ছ'বছর বয়সেই  মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পাটিগণিতের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার প্রমাণ দেন। এরপরে ১৯৪৪ নাগাদ বাবার সঙ্গে লন্ডনে চলে যান শকুন্তলা।

 

গণিতে প্রতিভার স্বীকৃতি

মাত্র বছরপাঁচেকের শকুন্তলার দিকে তাকিয়ে জগৎ বুঝে গিয়েছিল এই প্রতিভা ক্ষণজন্মা। পরবর্তীতে প্রচণ্ড জটিল মানসিক পাটিগণিতে নিজের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। মানবমনের ক্ষমতা বৃদ্ধি শকুন্তলার ছিল অত্যন্ত পছন্দের বিষয়। এই নিয়েই গবেষণা করতে করতে উদ্ভাবন করেন ‘মাইন্ড ডায়নামিক্স’-এর ধারণা।

 

গিনেস বুকে নাম

১৯৮২ নাগাদ গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে অসামান্য প্রতিভার জন্য নাম ওঠে শকুন্তলার। সেসময় মানুষ শকুন্তলাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভক্তি করতেন। বাস্তবজীবনের নায়িকা হয়ে উঠেছিলেন তিনি। খবরের কাগজ থেকে পত্র-পত্রিকা, বারংবার তিনি উঠে এসেছেন শিরোনামে। বলা হত, সমসাময়িক যে কোনও কম্পিউটারকে হার মানায় তাঁর অঙ্ক সমাধানের গতি।

 

সমকামিতা ও শকুন্তলা

সমকামীদের প্রতি দরদী মনের পরিচয় রেখেছেন শকুন্তলা। সমকামকে তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবেই দেখতেন, প্রাপ্য মর্যাদা দিতেন। লিখেছিলেন অনন্য একটি বই, 'দ্য ওয়ার্ল্ড অব হোমোসেক্সুয়ালস'। সমকাম-বিষয়ক বই ভারতের মাটিতে এইটিই প্রথম। সময়ভেদে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের যৌন আগ্রহ বা ঝোঁক পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। আদতে সমকাম বা বিষমকাম বলে কিছু হয় না– এই ছিল শকুন্তলার মূল বক্তব্য। অনেকে মনে করেন, শকুন্তলার স্বামী ছিলেন সমকামী। সেজন্যই এই বই লিখেছিলেন তিনি। যদিও এর সমর্থনে কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। এছাড়াও জ্যোতিষ ও রন্ধন বিষয়ক বই লিখেছিলেন শকুন্তলা।

 

‘হিউম্যান কম্পিউটার’ নামটি ছিল অপছন্দের

তাঁর প্রতিভার জন্য তাঁকে ‘হিউম্যান কম্পিউটার’ বলে সম্বোধন করা হত। মূলত ১৯৫০-এর ৫ অক্টোবর লেসলি মিচেল পরিচালিত বিবিসির একটি অনুষ্ঠানে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেওয়ার পরেই খেতাব জোটে তাঁর। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে খেতাবটি পছন্দ করতেন না। মনে করতেন, মানবমনের ক্ষমতা যে কোনও কম্পিউটারের থেকে বহুগুণ বেশি। কাজেই এই দুইয়ের মধ্যে কোনওভাবেই তুলনা টানা উচিত নয় বলেই মনে করেছেন আজীবন।

 

সংখ্যা গণনার শ্রেষ্ঠ ঘটনাটি

তাঁর প্রতিভা প্রদর্শনের সবথেকে স্মরণীয় ঘটনাটি বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল তাঁকে। যেমন তেমনভাবে বেছে নেওয়া ১৩ অঙ্কের দু'টি সংখ্যা তিনি গুণ করে দেখিয়েছিলেন মনে মনে। ১৮ জুন, ১৯৮০। ৭৬৮৬৩৬৯৭৭৪৮৭০ × ২৪৬৫০৯৯৭৪৫৭৯৯ = ১৮৯৪৭৬৬৮১৭৭৯৯৫৪২৬৪৬২৭৭৩৭৩০- এই সম্পূর্ণ অঙ্কটি খাতা-পেন ছাড়া পুরোপুরি মাথার মধ্যে হিসেব করে জবাব দেন, একদম সঠিক ছিল সেই উত্তর। এবং এই পুরো ব্যাপারটিতে তাঁর সময় লেগেছিল মাত্র ২৮ মিনিট।

স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলা গণিতজ্ঞ শকুন্তলা দেবী ২০১৩ সালে আজকের দিনটিতে মারা গিয়েছিলেন ব্যাঙ্গালোরে। তখন তাঁর বয়স ৮৩। মূলত হার্ট ও ফুসফুসের সমস্যার কারণে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর।

স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলা গণিতজ্ঞ শকুন্তলা দেবী ২০১৩ সালে আজকের দিনটিতে মারা গিয়েছিলেন ব্যাঙ্গালোরে। তখন তাঁর বয়স ৮৩। মূলত হার্ট ও ফুসফুসের সমস্যার কারণে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর।

More Articles

;