ভাইরাস ছড়িয়ে ক্ষমতা দখল, বিশ্বের শাসকদের কেন দেখা উচিত এই সিনেমাটি?

Shuddha Brata
৪ মিনিট
ভাইরাস ছড়িয়ে ক্ষমতা দখল, বিশ্বের শাসকদের কেন দেখা উচিত এই সিনেমাটি?

এক অদূর ভবিষ্যতের পৃথিবী, যখন ইংল্যান্ড দুনিয়ার একচ্ছত্র পরাশক্তি। আর সেই ইংল্যান্ডের মসনদে বসে আছে একজন টোটালিটেরিয়ান ডিক্টেটর, অ্যাডাম সাটলার। নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে যে হরণ করে ব্যক্তি-স্বাধীনতা, আর এই সুযোগে কুক্ষিগত করে নেয় আরও অধিক ক্ষমতা। যার অধীনে নিরাপত্তা-বাহিনীগুলো পরিণত হয়েছে নীতিহীন দাবার ঘুটিতে আর মিডিয়াগুলো একেকটি হয়ে উঠেছে প্রোপাগান্ডা মেশিন। মিথ্যার ঝুরি, মানুষের মনে অনবরত ভীতির সঞ্চার আর জাতিগত ঘৃণার বয়ান শোনানোই যাদের কাজ।

কারফিউ, সার্ভেইলেন্স, আর নিপীড়নের এই পুলিশি ইংল্যান্ডের এক রাতের কথা। বিটিএন টিভি চ্যানেলের কর্মচারি ইভি, কারফিউ রুল ভেঙে গোপনে নিজের বস গর্ডন ডিট্রিচের বাসার উদ্দেশ‍্যে রওনা হয়। আর তখনই রাস্তায় তার যাত্রাপথ রুখে দেয় সাটলারের সিক্রেট পুলিশবাহিনি ফিঙ্গারমেনের সিভিল ড্রেস-পরিহিত তিন সদস্য। তারা ইভিকে ধর্ষনে উদ্যত হলে এক মুখোশধারী, কালো পোশাক পরিহিত ব্যক্তির সেখানে আবির্ভাব ঘটে। ইভিকে সেই তিন ফিঙ্গারমেনের থেকে উদ্ধার করে মুখোশধারী ব্যক্তি নিজেকে এক নাটকীয় সংলাপের মাধ্যমে পরিচয় দেয় ‘ভি’ নামে।

ভি ফর ভেন্ডেটা, ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া এক ডিসটোপিয়ান রাজনৈতিক থ্রিলার। অরওয়েলিয়ান স্টোরিটেলিং ধাচের এই সিনেমাটি পরিচালনা করেন জেইমস মেকটিগ। চিত্রনাট্য রচনা করেন লানা এবং লিলি ওয়াচওস্কি। ইভি চরিত্রে দেখা যায় নাতালি পোর্টম্যানকে এবং ভি চরিত্রে অভিনয় করেন হিউগো উইভিং। সিনেমার শুরুতেই ১৬০৫ সালের ইংল্যান্ডের এক ঘটনা দেখানো হয়। গাই ফক্স নামে এক বিপ্লবী তৎকালীন শাসকের শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সেখানের পার্লামেন্ট ভবনে বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং শাসকবাহিনীর হাতে তিনি ধরা পড়েন। এই অপরাধে গাই ফক্সকে একজন সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। সেই দিনটি ছিল ৫ নভেম্বর।

সেন্ট মেরির ভাইরাস এবং ভি-এর পুনর্জন্ম

কুড়ি বছর আগে লারখিল নামের এক ডিটেনশন ক্যাম্পে নিরীহ মানুষদের বন্দি করে অত্যাচার করা হতো। সেই ক্যাম্পকে ঘিরে সাটলার নিজের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে এক চক্রান্ত রচনা করে। সাটলার লারখিলে এক মারাত্মক ভাইরাস বানানোর গোপন ছক আঁটে। ভাইরাসটি সেন্ট মেরির ভাইরাস নামে পরিচিত এবং সেই ভাইরাসের প্রতিষেধকের ব্যবস্থাও তার সহচরদের দিয়ে সে তৈরি করিয়ে রাখে। ভাইরাস গবেষণার ট্রায়ালের জন্য ব্যবহার করা হতো নিরীহ বন্দিদের।

ভাইরাসটি ছড়িয়ে গেলে ১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। আর এই সুযোগে সাটলার ভ্যাকসিন প্রদান করে অর্জন করে নেয় সিভিলিয়ানদের আশ্বাস। এবং এই চক্রান্তই তার ক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করে। অ্যাডাম সাটলার পরিণত হয় এক টোটালিটেরিয়ান শাসকে। এক রাতে, লারখিল ডিটেনশন ক্যাম্পে বিস্ফোরণ হলে ক্যাম্পে থাকা অগ্নিদগ্ধ এক ব্যক্তিকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। এই ব্যক্তিই পরবর্তীতে ফিরে আসেন সিনেমার প্রতিশোধপরায়ণ মূল চরিত্র ভি হয়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারত মানে শুধুই দারিদ্র আর আবর্জনা? হলিউডে যেভাবে দেখা যায় আমাদের দেশ

ভারত মানেই নোংরা এবং যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি গরিব দেশ- পশ্চিম বিশ্বে চলা এই ধারণাটা খানিক পাল্টানো গেলে হয়তো বস্তাপচা স্টিরিওটাইপিক যোগা, শাড়ি এবং মিথ্যে কলোনিয়ালিজম থেকে বেরিয়ে এসে ভারতকে অন্যভাবে দেখিয়েও সিনেমা তৈরি করতে পারতেন হারগ্রেভ, ড্যানি বয়েল কিংবা অ্যাং লি-রা।

'ভি ফর ভেন্ডেটা' ছবির একটি দৃশ্যে নাতালি পোর্টম্যান ও হিউগো উইভিং

ভি এবং ইভি-র সম্পর্ক

ইভি-র ছোট ভাই সেন্ট মেরির ভাইরাসের আক্রমণে মারা গেলে, ইভি-র বাবা-মা সাটলারের শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দু’জন অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে ওঠে। সাটলারের বাহিনী ইভির বাবা-মা কে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে এবং মেরে ফেলে। সিনেমায় ইভি চরিত্রটি মুখ্য দুই প্রোটাগোনিস্টের একজন। নাতালি পোর্টম্যানের অনবদ্য অভিনয় চরিত্রটিকে করে তুলেছে আরও বাস্তবিক। ইভি চরিত্রটি 'ভি ফর ভেন্ডেটা' সিনেমায় সমাজের সেইসব চরিত্রের প্রতীক, যারা অত্যাচারিত হয়েও নিজেকে গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয় নানাবিধ ভয় এবং অভিনয়ের আড়ালে। যারা অপেক্ষা করে এক অবতারের আগমনের, অথচ নিজের ভেতরকার অবতারটির কথা বেমালুম ভুলে যায়। ভি এখানে ইভি-কে সাহায্য করে তার ভেতরে থাকা সেই ঘুমন্ত অবতারকে জাগিয়ে তুলতে এবং সাটলারের বিরুদ্ধের একজন নির্ভীক সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে।

অন্য কিছু কথা

অ্যালান মুরের রচনা এবং ডেভিড লয়েডের ইলাস্ট্রেশনে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত কাল্ট ক্লাসিক কমিকস সিরিজ 'ভি ফর ভেন্ডেটা' থেকে সিনেমার প্লটটি নেওয়া। যদিও অ্যালান মুর পরবর্তীতে সিনেমাটির সমালোচনা করেন এবং মূল কমিকস সিরিজের সঙ্গে আদর্শিক পার্থক্য থাকায় সিনেমাটির সঙ্গে নিজের সকল ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেন। অনেক সমালোচকের মতে, এই সিনেমায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম উসকে দেওয়ার মতো উপাদান আছে, যা তরুণদের ভেতর সহিংস মনোভাবের জন্ম দিতে পারে। এমনকী সাম্প্রতিক, ২০২০ সালে চিনের আভ্যন্তরীন সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্ট্রিমিং চ্যানেলগুলো থেকে সিনেমাটিকে সরিয়ে ফেলারও অভিযোগও উঠেছে।

২০১৯ সালে হংকং-এ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অনেককেই গাই ফক্স-এর মাস্ক পরে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক বিকেন্দ্রীকরণ হ্যাকারগ্রুপ ‘অ্যানোনিমাস’-এর সদস্যরাও গাই ফক্সের মাস্কটি ব্যবহার করে থাকে।

তবে, সমালোচনার বাইরে যে দু'টি বিষয়ে এসে দ্বিমতের ব্যবধান কমে আসে, তা হচ্ছে সিনেমার প্রতিটি চরিত্রের অভিনয়-দক্ষতা এবং অনবদ্য সংলাপ।

সিনেমার শেষের দিকের এক দৃশ্যে, সাটলারের সিক্রেট পুলিশবাহিনীর হেড পিটার ক্রিডি ও তার সহযোগীরা ভি-এর শরীরে অনবরত গুলিবর্ষণ করে। তাতে ভি মারা না গেলে ক্রিডি বিস্মিত হয় এবং ভি-কে তার মারা না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করে। প্রত্যুত্তরে ভি বলে, 'এই মুখোশের নিচে যা আছে তা হচ্ছে একটি আইডিয়া, আর আইডিয়া হচ্ছে বুলেটপ্রুফ।' এমন আরও অসাধারণ সংলাপে সাজানো এই সিনেমাকে কেউ বলে ডিসটোপিয়ান থ্রিলার, কেউ বলে অ্যাকশন, কেউ বলে রাজনৈতিক, কেউ আবার বলে সুপারহিরো মুভি। কারও মতে সিনেমাটি একটি মাস্টারপিস, আবার কারও মতে সিনেমায় আছে হিংসা উসকে দেওয়ার মতো উপাদান।

ভিন্ন জনের ভিন্ন মত। তবে এটা অবশ্যই বলা যেতে পারে, 'ভি ভর ভেন্ডেটা' নিঃসন্দেহে বিগত দুই দশকের ভেতর মুক্তি পাওয়া সবচেয়ে বেশি আলোচিত ব্লকবাস্টার সিনেমাগুলোর একটি।

লিখেছেন
Shuddha Brata
Shuddha Brata
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।