মৃৎশিল্পীর ভুলে দেবী হয়ে গেলেন নীল, কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর ইতিহাস আজও বিস্ময় জাগায়

Durgapuja 2022: নদিয়া জেলার বহু বনেদিবাড়ি যুগ যুগ ধরে শামিল হচ্ছে এই উৎসবে। আজ মায়ের বিদায়-লগ্নে ছুঁয়ে দেখা সেইসব ঐতিহ্যকে।

Sanchari Bhowmik
৩ মিনিট
মৃৎশিল্পীর ভুলে দেবী হয়ে গেলেন নীল, কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর ইতিহাস আজও বিস্ময় জাগায়

ওরে নবমী নিশি, না হইও রে অবসান।

শুনেছি দারুণ তুমি, না রাখ সতের মান।।

আজ আকাশে-বাতাসে রয়েছে বিষাদ আর মনখারাপের সু্র। আদুরে বেলার মতো কেটে যায় মায়ের আগমনের চারটি দিন। আলোর গতিবেগের চেয়েও বেগে ছুটে চলে এই সময়! মফসসলে যারা বড় হয়েছে, তাদের কাছে এই দুর্গাপুজোর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে নানা ইতিহাস। যেমন, নদিয়া জেলার বহু বনেদিবাড়ি যুগ যুগ ধরে শামিল হচ্ছে এই উৎসবে। আজ মায়ের বিদায়-লগ্নে ছুঁয়ে দেখা সেইসব ঐতিহ্যকে।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি

চারদিকে এখন থিমপুজোর রমরমা। কিন্তু এর মধ্যেও অক্ষুন্ন রয়েছে রাজবাড়ির ঐতিহ্য ও সাবেকিয়ানা।রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত রাজবাড়ির রাজরাজেশ্বরীর হোম চলে নবমী পর্যন্ত। এটাই প্রাচীন রীতি কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির। প্রতিপদ থেকেই শুরু হয় রাজমাতার হোমকুণ্ড প্রজ্জ্বলন। রীতি অনুযায়ী মহালয়ার পর, প্রতিপদের দিন থেকেই কৃষ্ণনগরে রাজরাজেশ্বরীর হোমকুণ্ড জ্বলে ওঠে। প্রচুর পরিমাণে ঘি, বেলকাঠ-সহ নানা সরঞ্জাম দিয়ে যজ্ঞ শুরু হয়। নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রর প্রতিষ্ঠিত এই পুজোর হোমের আগুন জ্বলে নবমী তিথি পর্যন্ত। উলটো রথের পরের দিন পাট পুজোর মাধ্যমে শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণের কাজ। বর্তমান রানিমা অমৃতা রায় জানান, শুধু রাজপরিবারের মঙ্গল নয়, সমগ্র নদিয়াবাসীর মঙ্গলকামনায় এই হোমকুণ্ডলী জ্বালানো হয়। প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার থেকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রাজরাজেশ্বরীর মূর্তি একেবারেই আলাদা। রাজপরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, এই মূর্তি তৈরি করতেন বিখ্যাত শিল্পী সাধন পাল। একচালায় ঘোড়ায় চেপে আগমন হয় রাজরাজেশ্বরীর, রাজমাতার সামনের দু'টি হাতই বড়। পিছনের আটটি হাত অপেক্ষাকৃত ছোট হয়। দেবীর গায়ে থাকে বর্ম। দেবী থাকেন একেবারে যুদ্ধের বেশে, রণংদেহি সাজে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'মা' ডাকে বলি, ডুবন্তকে দেবীর উদ্ধার, রহস্য-কথকতায় ভরা শীতলগ্রামের চৌধুরীদের দুর্গাপুজো

Burdwan Shitalgram Durgapuja: পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক ক্ষীরগ্রাম। সেটি ৫১ সতীপীঠের একটি যেখানে দেবী পার্বতীর একটি আঙুল পড়ে বলে জানা যায়। সেই মন্দিরে দেবী যজ্ঞদা রূপে পূজিত হন দুর্গা।

রাজার বাড়ির পুজো বলে কথা, সেখানে ভোগের আয়োজনও হয় এলাহি। খিচুড়ি, ভাজা, ছেঁচড়া-সহ একাধিক তরকারি, চাটনি, সুজি, পায়েস থাকে পুজোর ভোগে। সপ্তমীতে সাতরকমের ভাজা হয়। অষ্টমীতে পোলাও, ছানার ডালনার সঙ্গে ভাত, আটরকম ভাজা, মিষ্টি, ক্ষীর-সহ একাধিক পদ থাকে। নবমীতে নয়রকম ভাজা, তিনরকম মাছ, ভাত, মিষ্টি থাকে। দশমীতে গলা ভাত, সিঙি মাছ, খই, ফল, দই, চিঁড়ে ভোগ দেওয়া হয়। দশমী মানেই বিষাদ। সিঁদুরখেলায় মেতে ওঠেন রাজপরিবারের গৃহকর্ত্রী অমৃতা রায়-সহ অন্যান্য মহিলা সদস্যরা। বর্তমান রানিমায়ের উদ্যোগেই শুরু হয় এই সিঁদুরখেলা।

কৃষ্ণনগর রায়বাড়ি

কৃষ্ণনগরের অন্যতম প্রধান বনেদিবাড়ি রায়বাড়ি। রায়বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্য। অনেকটা রাজবাড়ির আদলেই তৈরি রায়বাড়ির ঠাকুরদালান। এখানেও উলটো রথের দিন দেবীর পাটপুজোর মাধ‍্যমে বেজে ওঠে আগমনী সুর। দেবী এখানেও আসেন যোদ্ধার সাজে। বর্ম পরে, ঘোড়ায় চেপে রাজরাজেশ্বরী রণংদেহি হয়ে। কথিত আছে, রাজবাড়ি এবং রায়বাড়ির দুই মা-ই নাকি দুই বোন। যদিও এই সবই লোকমুখে প্রচলিত।

তিন ইঞ্চি দুর্গাবাড়ি

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে থিম পুজো, ঠাকুরের উচ্চতা নিয়ে কতই চিন্তাভাবনা করতে হয় উদ্যোক্তাদের। কিন্তু বংশ পরম্পরায় কৃষ্ণনগরের নগেন্দ্রনগর সংলগ্ন এলাকার তিন ইঞ্চি দুর্গা বাড়িতে আজও পুজো হয়ে চলেছে তিন ইঞ্চি সাইজের দুর্গা। আজও তাঁরা সাবেক রীতি মেনেই পুজো করে আসছেন মায়ের। বছরের এই সময় বাইরে থেকে বাড়ির সকল সদস্যরা উপস্থিত হন।

নীল দুর্গাবাড়ি

কৃষ্ণনগরের নাজিরাপাড়া চট্টোপাধ্যায় বাড়ির এই পুজো প্রায় ২৯০ বছরের পুরনো। আসলে স্বাধীনতার আগে, দেশভাগের আগেও ওপার বাংলাতে এই পুজো শুরু হয়। তবে দেশভাগের পর ১৯৪৭ থেকে কৃষ্ণনগরের নাজিরাপাড়াতেই শুরু হয় পুজো। এখানে দেবীর গায়ের রং নিয়ে প্রচলিত রয়েছে একাধিক কাহিনি। যদিও মার্কণ্ডেয় পুরাণেও নীল দুর্গার কথা পাওয়া যায়।

মায়ের গায়ের রং বদলে যাওয়ার পিছনে কারণ হিসেবে অনেকে বলেন, এটি মৃৎশিল্পীর একটি ভুল। রাত জেগে কাজ করতে গিয়ে নাকি বৃদ্ধ মৃৎশিল্পী ভুল করে দুর্গা প্রতিমাকে অপরাজিতা রঙে রাঙিয়ে ফেলেন। এদিকে রাত পোহালেই পুজো। হাতে সময়ও নেই নতুন করে রং করার। সকাল হতেই নাকি পরিবারের বয়ঃজ্যেষ্ঠরা প্রতিমা দেখতে এসে অবাক! কথিত রয়েছে, সবকিছু শুনে তাঁরা শিল্পীর পাশে দাঁড়ান। চট্টোপাধ্যায় বাড়ির এক বয়স্ক সদস্য জানান, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এমন একটা কিছু হবে। কারণ, রাতেই দেবী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়েছেন, চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারে তিনি অপরাজিতা রূপেই পূজিত হবেন। সেই শুরু। তারপর থেকে মৃৎশিল্পীর ভুলই হয়ে উঠল ঐতিহ্য। আজও কৃষ্ণনগর নাজিরাপাড়ায় পুজো করা হয় দেবী নীলা রূপেই।

এই প্রতিমারও বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। শাক্ত মতে এই পুজোয় প্রথমে মোষ বলি দেওয়া হতো। পরে শুরু হয় পাঁঠাবলির প্রথা। এখন অবশ্য আর বলি হয় না। সন্ধিপুজোর আগে ১০৮টি অপরাজিতা ফুল দিয়ে পুজো করা হয় দেবীকে। দুর্গার ভোগেও আছে নানা বৈচিত্র। মহাপ্রসাদের পাশাপাশি পোলাও, মাছ, পাঁচরকম ভাজা, তিনরকম সবজি থাকে মায়ের ভোগে।নবমী বিষাদের সুর বয়ে আনলেও এই বাড়িতে নবমী একটু অন্যরকম। এখানে নবমীর দিন হয় শত্রুনিধন পর্ব। আতপচালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হয় ‘নর’ অবয়ব। তাকে লাল শালুতে মুড়ে পরিবারের বয়োঃজ্যেষ্ঠ সদস্য খাঁড়া দিয়ে বলি দেন। একচালা প্রতিমার ধরনেও রয়েছে বৈচিত্র। উলটোদিকে অর্থাৎ বাম দিকে থাকেন সরস্বতী, গণেশ এবং ডান দিকে থাকেন লক্ষ্মী ও কার্তিক। এবং গণেশকে শুভ্র বর্ণে সাজানো হয়।

লিখেছেন
Sanchari Bhowmik
Sanchari Bhowmik
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অথর ইজ ডেড, যে লেখে সে আমি নয় এআই?

Caine Prize winning story AI allegations: ১১ অক্টোবর লেখক ও সাংবাদিক ভোহিনি ভারা ‘দ্য আটলান্টিক’-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন—যার শিরোনাম ছিল “Yet Another Literary Prizewinner Seems to Be AI”। সেখানে তিনি জানান, ‘পাংগ্রাম’ নামের একটি এআই-ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গল্পটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এটি প্রায় পুরোটাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত।

জমিদারগিন্নির অপমানের জবাব দিতেই শুরু পাঞ্জা বাড়ির দুর্গাপুজো

Panja family Durga Puja: এক বর্ষামুখর দুর্গাষ্টমীর দিনে জমিদারবাড়ির মহিলারা, জমিদারগিন্নির সঙ্গে, বাড় সিউড়ির দুর্গাপ্রতিমা দর্শনে যান। ফেরার পথে কর্দমাক্ত রাস্তা পেরোনোর সময় দামি শাড়ি কাদা থেকে বাঁচাতে তাঁরা শাড়ির পাড় কিছুটা তুলে হাঁটছিলেন। কথিত আছে, তা দেখে পাড়ার কয়েকজন কটূক্তি করে বলেন— “পাঞ্জা বাড়ির বউ কাপড় উঠিয়ে চলছে!”

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।