ঋতুমতী কন্যারা ব্রাত্য, কীভাবে নির্বাচন করা হয় কুমারী পুজোর বালিকাদের?

Mahashtami Kumari Puja: যে সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে একটি মেয়ের সম্মান নির্ধারণ করা হয় ‘কুমারীত্ব’ আর ‘পুত্রসন্তান উৎপাদনের’ মাধ্যমে, সে সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন থাকেই।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
ঋতুমতী কন্যারা ব্রাত্য, কীভাবে নির্বাচন করা হয় কুমারী পুজোর বালিকাদের?

দুর্গাপুজোর অষ্টমী তিথিতে কুমারী পুজোর চল বহুদিনের। বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দের হাত ধরে কুমারী পুজো শুরু হওয়ারও অনেক আগে থেকে অখণ্ড বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কুমারী পুজোর প্রচলন ছিল। প্রধানত দুর্গাপুজোর সময়েই কুমারী পুজোর চল থাকলেও অন্যান্য মাতৃ আরাধনা যেমন কালীপুজো বা জগদ্ধাত্রী পুজোতেও কুমারী পুজোর চল ছিল। শাস্ত্র ও পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে কোলাসুর দমনের মধ্যে দিয়েই কুমারী পুজোর প্রচলন হয়। পুরাণ মতে, কোলাসুর স্বর্গ, মর্ত্য অধিকার করায় দেব দেবীরা খুবই বিচলিত হয়ে মহাকালীর শরণাপন্ন হন। দেবকুলের এহেন বিপদ দেখে দেবী পুনর্জন্ম গ্রহণ করেন এবং মর্ত্যে গিয়ে কোলাসুরকে বধ করেন। তারপর থেকেই কুমারী পুজো শুরু হয়।

কুমারী পুজো মূলত তান্ত্রিক সাধনার ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। প্রবীণ শাস্ত্রবিদদের মতে, দেবী দুর্গা স্বয়ং সম্পূর্ণা। বৃহদ্ধর্ম পুরাণ মতে, "কন্যা রূপেন দেবানামগ্রত দর্শনং দদৌ"- এর অর্থ হল দেবী চণ্ডী কুমারী রূপেই দেবতাকুলের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন। দেবী ভগবতে কুমারী পুজো সম্পর্কে বলা হয়েছে, এক বছরের কন্যা কুমারী পুজোর যোগ্য নয়। তারপরে দুই থেকে দশ বছর পর্যন্ত বালিকাদের কুমারী রূপে পুজো করা যাবে। কুমারী যদি পুজোয় সন্তুষ্ট হন তাহলে সাধকদের ইচ্ছে পূরণ করেন। বয়স অনুযায়ী কুমারীদের নামকরণও আলাদা হয়। দুই বছরের কুমারীর নাম হয় কুমারিকা, তিন বছরের কুমারীর নাম হয় ত্রিমূর্তি, চার বছরে কুমারী মেয়ের নাম হয় কল্যাণী, পাঁচ বছরের কুমারী মেয়ের নাম হয় রোহিণী, ছয় বছরের কুমারী মেয়ের নাম হয় কালিকা, সাত বছরের মেয়ের নাম হয় চণ্ডিকা, আট বছরের কুমারী মেয়ের ক্ষেত্রে নাম হয় সুভদ্রা। আলাদা আলাদা বয়সের কুমারীদের পুজো করলে শাস্ত্র অনুযায়ী ফলও পৃথক হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুসলিম কন্যাকে কুমারী রূপে পুজো করেছিলেন বিবেকানন্দ, কীভাবে বাংলায় শুরু হল কুমারী পুজো

Kumari Puja: নারীতে পরমার্থ দর্শন এবং পরমার্থ অর্জন—এই হল কুমরী পুজোর মূল মন্ত্র। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় হয়ে চলেছে সারাক্ষণ যে ত্রিশক্তির দ্বারা, সেই ত্রিশক্তিই কুমারীতে রয়েছে বীজাকারে।

দু’বছরের কুমারীর পুজো করলে দুঃখ কষ্ট ও শত্রুনাশ এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়। ধনসম্পদ, ধানের ফলন, ও বংশবৃদ্ধি হয়। কল্যাণীর পুজো বিদ্বান, সুখী এবং বিজয়ী করে। রোহিণীর পুজোয় ধনেশ্বর্য লাভ হয় সাধকের। অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য সুভদ্রার পূজা করতে বলা হয়। আবার অন্য একটি সূত্র বলছে, তন্ত্র শাস্ত্র মতে কুমারী পুজোর ক্ষেত্রে কন্যার বয়স এক থেকে ষোলোর মধ্যে হতে পারে। কিন্তু সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী দশ বছরের কন্যাই কুমারী হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার। তবে কুমারীর মধ্যে থাকতে হবে বিশেষ কয়েকটি গুণ। কুমারীকে হতে হবে সুন্দর, সুলক্ষণ ও শোভন।

আবার যামলতন্ত্র অনুযায়ী, এক বছরের কুমারী কন্যার নাম হবে সন্ধ্যা, দুই বছরের কুমারীর নাম হবে সরস্বতী, তিন বছরের কন্যার নাম হবে ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কুমারী কন্যার নাম হবে কালিকা, পাঁচ বছরের সুভাগা, ছয় বছরের ক্ষেত্রে উমা, সাত বছরের ক্ষেত্রে কুজিকা, নয় বছরের কন্যার ক্ষেত্রে কালসঙ্কটা এবং দশ বছরের ক্ষেত্রে কুমারী মেয়ের নামকরণ হবে অপরাজিতা। এগারো বছরের ক্ষেত্রে কন্যার নাম হবে রুদ্রাণী, বারো বছরের ক্ষেত্রে ভৈরবী এবং ত্রয়োদশ বছরের ক্ষেত্রে কন্যার নাম হবে মহালক্ষ্মী। তবে শাস্ত্রে এও বলা রয়েছে, এদের সকলের মধ্যে উমা, মালিনী ও কূজিকার পুজো করলেই ভালো ফল লাভ করা সম্ভব।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুম্বইয়ের রঙ কোম্পানি বদলে দিল বাংলার দুর্গাপুজো! কীভাবে শুরু হল থিমের পুজো?

Theme Durga Puja Kolkata: ১৯৮৫ সালে পুজোয় এশিয়ান পেইন্টসের ট্যাগলাইন ছিল, ‘শুদ্ধ শুচি, সুস্থ রুচি’। এর অর্থ হল, প্যান্ডেল-প্রতিমা-আলোকসজ্জা সবকিছুর মধ্যেই থাকতে হবে শুদ্ধতা এবং সুস্থ রুচির পরিচয়

তন্ত্রে বা শাস্ত্রে যে কোনও বর্ণ ও জাতির কুমারীকে দেবী জ্ঞানে পুজোর কথা বলা হলেও বাস্তবে চিত্রটা অন্য রকম। যে সব স্থানে কুমারী পুজো হয় তার প্রায় সর্বত্রই ব্রাক্ষণ কন্যাকে কুমারী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এখানেই কাজ করে আমাদের সমাজের ভিতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা ব্রাহ্মণ্যবাদ। আমরা আসলেই যে অবচেতনে বর্ণাশ্রমের ঘা মাথায় বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি এই বিশেষ অনুষ্ঠান এলেই তা আরও অনেক বেশি প্রকট হয়ে পড়ে।

যে সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে একটি মেয়ের সম্মান নির্ধারণ করা হয় ‘কুমারীত্ব’ আর ‘পুত্রসন্তান উৎপাদনের’ মাধ্যমে, সে সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন থাকেই। কুমারী পুজোর ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হল 'অ-রজঃস্বলা কন্যা'। পিরিয়ড হয়ে গেলে বা কন্যা ঋতুমতী হলে সে পুজো পাবে না। পিরিয়ড হওয়ার সঙ্গে কুমারীত্বকে সমান্তরালে রাখার যে ভয়াবহ প্রবণতা তা সামাজিক অসচেতনতাকেই বাড়িয়ে তোলে। পিরিয়ড হয়ে গেলেই কুমারীর পুজো বন্ধ, কারণ পুজো পবিত্র বিষয় আর ঋতুস্রাব হয়ে গেলেই মেয়ের শুচিতা নষ্ট— এই ধারণার উপরই দাঁড়িয়ে আছে সম্পূর্ণ বিষয়টি। খুব সহজেই অনুমেয় যে, একটি প্রথা যখন বহুকাল ধরে চলতে থাকে,তার ওপর প্রশ্ন তুলতে মানুষ ভুলেই যায়।

"কত শতবর্ষ ধরে যে প্রাচীন প্রথা দেবতা চরণতলে বৃদ্ধ হয়ে এল সে কি পাপ হতে পারে?"— এই প্রশ্নই বারংবার যুক্তির পথ রোধ করে দাঁড়ায় আবার ধীরে ধীরে সেই বাধা পেরিয়েই যুক্তির জয়গাথা রচিত হয়।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।