চিনুয়া দাসের জন্মান্তর: প্রবুদ্ধ মিত্র

Short Story: অন্ধর অনেক স্বপ্ন-ঘাটতি থাকে। চিনুয়ারও ছিল। কিন্তু, এখন কোনওটাই আর স্বপ্ন নয়।

এইমাত্র ঘটনাটা তাঁর চোখের সামনে ঘটে গেল। একটি সাইকেল এক পথকুকুরকে ধাক্কা মারাতে কুকুরটি তারস্বরে চিৎকার করে উঠল। কুকুরের চিৎকারে সকলে হতচকিত হয়ে ফিরে তাকিয়েছিল। চিনুয়াও তাকালেন। ঘটনাটি দেখলেন। তারপর আবার হাঁটতে থাকলেন, যেভাবে হেঁটে এ রাস্তা ধরে যাচ্ছিলেন উনি।

ফুটপাত ধরে একটু এগোতেই উনি কিছু একটা লক্ষ করে আবার থামলেন। একটু আগে কী ঘটনা ঘটেছিল বা, তিনি কেন চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন- কিছুতেই মনে করতে পারছেন না এখন। ঠিক কী ঘটেছিল তখন, কেন ঘটেছিল, বা উনি কেন চলার পথে থমকেছিলেন- কিছুই মনে করতে পারছেন না। বছর বাষট্টির চিন্ময় দাস ওরফে বন্ধুমহলে ডাকনামে খ্যাত চিনুয়া নিজের এই বিভিন্ন দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে পৌঁছে যাওয়ায় নিজেই অবাক হয়ে গেলেন। দীর্ঘ অনেক বছর পর একসঙ্গে অনেক কিছু দেখছেন। মানুষ ঘটনাবহুল যা কিছু দেখে এবং বলে, 'নিজের চোখে দেখেছি', সেরকম কিছু উনি বলতে পারছেন না। কার 'চোখে' তিনি দেখছেন, নিজেও জানেন না। তাই ঘটনাক্রম ও সময়কাল ঠিক মেলাতে পারছেন না তিনি।

পূর্বের ঘটনার সঙ্গে এখনকার ঘটনার কোনও সম্পর্ক আছে কি না, এটা ভেবেই হয়তো বা একটি ভাঙা সাইকেলকে রাস্তার পাশে দেখতে পেয়ে উনি থেমেছিলেন। আরোহীহীন ভাঙা সাইকেলটি রাস্তা ও ফুটপাথের সংযোগস্থলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চিনুয়া এই দৃশ্যে চমকে উঠলেন দু'টি কারণে।

আরও পড়ুন: একটা ফ্লাইওভার ও আলোর গল্প: অমৃতা ভট্টাচার্য

এক, সাইকেলটি ভাঙা হওয়া সত্বেও আশ্চর্য সক্ষমতায় ঠিক যেন অঙ্গবিচ্ছিন্ন মানুষের সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দুই, আগের ঘটনাটি সম্পূর্ণ আলাদা হলেও, তীব্রভাবে তা ওঁর আগের দেখা থেকে আলাদা হয়ে গেলেও শুধুমাত্র সাইকেলটি তাঁর মাথায় প্রবল ধাক্কা দিচ্ছে। মনে করার সবরকম চেষ্টা করছেন, কী ঘটেছিল বা এখন কী ঘটছে। ওটি এক নির্ভেজাল খেলনা সাইকেলও হতে পারে। বালক চিনুয়ার এক খেলনা সাইকেল ছিল। চিনুয়া আবার পথ চলতে শুরু করলেন।

দূর থেকে বাস আসছিল, তিনি দেখেছিলেন। আসছে তাঁর উঠে পড়ার অপেক্ষায়, এ-ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। আর ঠিক তখনই তাঁর মনে পড়ল আর এক মফসসল-শহরদিনের সফরের কথা। ব্যস্ত অফিসটাইমে ভিড়ের চাপ এত বেশি ছিল যে, লোকাল ট্রেনের কামরার ভেতর যাওয়া যায়নি। লোকটি রড ধরে কোনওরকমে শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন। স্টেশন প্ল্যাটফর্ম আসতেই উনি ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। রোজই এই জায়গায় প্রচুর লোক নেমে যায়। যারা দূরে যাবে, তারা এই স্টেশন আসার আগেই বুঝতে পারে, কোন সিট খালি হবে। কিন্তু ভিড়ের চাপ যদি দূরের লোককে বাইরে ফেলে দেয়, তাহলে অনেক দেরি হয়ে গিয়ে সিট ফসকে যাবে। লোকটিরও তাই ঘটেছিল। পুরো জার্নি দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। ভিড় বাস আসতে দেখে, তাঁকে পুরোটা দাঁড়িয়ে যেতে হবে কি না, এসব চিন্তায় একথা তাঁর মনে পড়ল।

নতুন চেহারায় শহরে প্রথম দিনের পা রাখার এই হলো ছোটখাটো অভিজ্ঞতা। নতুন এক মানুষ হয়ে আসা চিনুয়াকে এই শহর টাটকা মজা টের পাওয়াতে বেশি সময় নেয়নি। এই শহর, বরাবর, তাঁর নিজের ছিল। শুধু দেখে নেওয়ার ছিল, এখনও সেটা একইরকম আছে কি না।

পুরনো জামা যেমন সময় হলে বদলে ফেলতে হয়, তেমনই শরীরের নষ্ট হয়ে যাওয়া অঙ্গও যে প্রয়োজনে পাল্টে নতুন করে ফেলতে হয়, এ তাঁর সদ্য হওয়া অভিজ্ঞতা।

মফসসলের ভিটে-বাড়ি বেচে দেওয়া এবং এই শহরে মিশে যাওয়ার কারণ ছিল তাঁর চাকরিজীবন। বদলির সূত্রে সেই কবে এই শহরে আসা। এরপর ঋতু বদল হতে হতে তাঁর অনেক বছর কেটে গেছে। চাকরি শেষ করে একটা ছোট দোতলা বাড়ির মালিক হতে বিশেষ অসুবিধে হয়নি চিনুয়া দাসের। এই প্রায় ত্রিকাল পেরনো জীবনে বয়স একটু একটু করে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বদল তিনি দেখেছেন। চাকরি বদল, বাড়ি বদল, সম্পর্ক বদল, শহর বদল, শাসন বদল- সবকিছু। শুধু নিজের 'দেখা'-র বদলটা দেখা বাকি ছিল।

বাসে খুব ভিড়ের চাপ ছিল। ভিড়ের ফাঁক গলে জানলার বাইরে মাঝে মাঝে চোখ চলে যাচ্ছিল। বাসের জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখার পুরনো অভ্যাস ফিরে পেতেই তিনি কিছুটা রোমাঞ্চিত হলেন। বাসের গতির কমা-বাড়ায় বোঝা যায়, কত দ্রুত দৃশ্য সরে যাচ্ছে তার ওপর। বাসের সিট যদি জানলার ধারে হয়ে যায় সৌভাগ্যক্রমে, তাহলে বাসের গতি স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। এর সঙ্গে জীবনের গতির ওঠানামার সম্পর্ক খুঁজতেন তিনি। এ তাঁর পুরনো অভ্যেস, যা আবার ফিরে পেতে চাইলেন তিনি। মাঝে মাঝে বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা লোকজনের দিকে ফিরে ফিরে দেখছিলেন তিনি। যদি একটা জানলার ধার হয়ে যায়, এই ভেবে। বয়স্কদের আসন পূর্ণ হওয়ায় তাঁর সুযোগ ঘটেনি বাসে ওঠামাত্র বসতে পাওয়ার। বাকি রইল দু'-একটি প্রতিবন্ধী আসন। সেখানে কোনও দাবি নিয়ে তিনি হাজির হবেন না। নিজেকে 'প্রতিবন্ধী' ভাবার কোনও কারণ নেই। তিনি মাথার ওপর হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

হঠাৎ তাঁর নজরে এল, বাচ্চা কোলে বউটা বাসের সিটে বসে আড়চোখে চারপাশ দেখে নিচ্ছে একবার। কান্না থামাতে সে বুকের জামাটা একটু তুলে বাচ্চাটার মুখে লাগিয়ে দিতেই শান্ত হলো কোলের শিশুটি। সদ্য প্রৌঢ় চিনুয়া বা চিন্ময়বাবু দেখলেন, লোকসমাজ থেকে আড়াল করতে তরুণী বধূটি শাড়ির আঁচল দিয়ে জায়গাটা ঢেকে দিয়েছে। এই ক'দিন আগে হলেও এই দৃশ্য থেকে তিনি চোখ সরিয়ে নিতেন। কিন্তু, এখন তিনি কেন এতক্ষণ ধরে এই দৃশ্যে থিতু হতে চাইছেন, নিজে ভাবার চেষ্টা করলেন। মাথাটা আবার কেমন তালগোল...

দুই
তিনি জানেন না। জানতে চাইলেও তাঁকে জানানো হয়নি। জানানোর নিয়ম নেই, কার রেখে যাওয়া 'চোখ' তাঁর শরীরে আসছে। তিনি শুধু জানতেন, এই শহর বদল তাঁর চোখের দৃষ্টি ক্রমশ ক্ষীণ করেছে। একদিন সকালে হঠাৎ সব ঝাপসা হয়ে গেল। একটা কালো পর্দার ওপাশে আলো, এপাশে শুধু এক অন্ধকার কুঠুরিতে তিনি একা। তার আগে অবধি সব তাঁর নজরে থাকত। দিনের শুরুর কোমল আলো থেকে মাঝরাতের অন্ধকারে জোনাকির আঁকিবুঁকি পর্যন্ত সব।

তিনি নিজে বারবার ভেবেছেন, তাঁর দৃষ্টিশক্তি চলে যাওয়ার কারণ নিয়ে। অনেক ভেবে ডাক্তারের সঙ্গে একমত না হয়ে তিনি সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, দৃশ্যদূষণের অত্যধিক চাপই এর কারণ। যার ফলে তিনি ঘরে বসে টিভি দেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। রাস্তায় বেরিয়ে দিনে বা রাতে চোখে রোদচশমা পরতেন। আধুনিক জীবনের হরেক প্রদর্শনী থেকে নিজের চোখকে বাঁচাতে এই ছিল চিনুয়ার নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থা। তবু নিজের চোখ বাঁচাতে পারেননি।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বারবার ভেবেছেন, এই নতুন চোখ কোন মানুষ ছেড়ে রেখে গেল তাঁর জন্য। কী তার পরিচয়, তা জানার অধিকার নিয়ে তিনি তর্ক শুরু করেন। কিন্তু তা জানার কোনও উপায় নেই। তাঁকে জানানো হবে না। না জানলেও তিনি বোঝার চেষ্টা শুরু করেন, কেমন সেই চোখ দান করে দেওয়া মানুষ।

কাল সকালে অপারেশন। আজ রাতে তিনি পর্দার এপারে অন্ধকার কুঠুরিতে আর একা নন। চারপাশে তাঁকে ঘিরে রয়েছে অনেক অচেনা মৃতজন। যাঁরা সকলেই আজ মারা গেছেন, একটু আগে, বা কেউ হয়তো এইমাত্র। সকলেই তাদের 'চোখ'-এর গুণাগুণ নিয়ে হাজির তাঁর কাছে। এদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নেওয়া সহজ কাজ নয়। বেশ দুঃসাধ্য কাজ খুঁজে নেওয়া তাঁর জন্য 'নিবাচিত চোখ'।

Illustration

'আধুনিক জীবনের হরেক প্রদর্শনী থেকে নিজের চোখকে বাঁচাতে এই ছিল চিনুয়ার নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থা।' অলংকরণ: দীপ হাওলাদার

কে নেই সেই মৃত-সমাগমে! আস্তিক, নাস্তিক, বড়লোক, ছোটলোক, চাষি, মহাজন, শ্রমিক, মালিক, প্রগতিশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল। সঙ্গে রয়েছেন কবি, চিত্রকর, গায়ক এবং অভিনেতা। সায়েন্টিস্ট ও ব্রাহ্মণ পুরোহিত, আর রয়েছেন দু'-একজন মাঝবয়সি সুন্দরী। এক বাগানের মালি যে শুধু গাছ ও ফুলের চর্চা করেছে আজীবন তিনিও আছেন। আশ্চর্যজনকভাবে চোর, ডাকাত অথবা সুপারি কিলার- কেউ নেই। নেই কোনও গুছিয়ে নেওয়া নেতা। এই ধরনের মানুষরা যে দানে অভ্যস্ত নন, তা তো তাঁর জানাই ছিল। শুধু সঠিক জানা নেই বাকি সবার কথা। কে কোন দৃষ্টিতে এতদিন অভ্যস্ত ছিলেন, কী কী বিশেষ বিষয়ের প্রতি তাঁদের দেখার আগ্রহ ছিল, তা জানা এক রাতের মধ্যে সম্ভব নয়। তাঁর তো দরকার একটা পছন্দের 'চোখ'। যা তাঁকে অন্যরকম কিছু দেখাতে চাইবে। এত বছরের জীবনে তাঁর কাছে যা নতুন। তিনি একটা দূষণমুক্ত চারপাশ দেখতে চান। সেই বিশেষ দেখার শক্তি কে দিতে পারে তাঁকে? তিনি চাইলেও ডাক্তাররা তাঁর পছন্দের কথা মাথায় রাখবেন না। ভাবতে ভাবতে, আরও ভাবতে ভাবতে চিনুয়া পরের দিন সকালের অপেক্ষায় থেকে ভাবনাচিন্তা বন্ধ করেন।

তিন
প্রথমেই তাঁর মনে হয়েছিল, চোখে একটা তীব্র আলো হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছে। তারপর কয়েকটা ঝাপসা শরীর। ঠিক যেন কাঁচা হাতের পেনসিল ড্রইং।

তবে কি ওই মৃত চিত্রকর আবার ফিরে এলেন তাঁর শরীরে?

কিন্তু একটু পরেই তাঁর ভুল ভেঙে গেল। সাদা-কালো-ঝাপসার বদলে খানিকটা রঙিন সবকিছু। একটা দেওয়াল ঘড়িতে দেখা যাচ্ছে সময়। অনেকদিন পর তিনি আবার ঘড়ির সময় দেখতে পাচ্ছেন। তার মানে আবার বিজ্ঞাননির্ভর, মাপা জীবন।

তবে কি সায়েন্টিস্ট?

না, কোনওটাই মিলছে না। নতুন চোখ নিয়ে বাড়ি ফিরে তিনি কিছুদিন সাবধানে ছিলেন, ডাক্তারের কড়া নির্দেশে। তারপর শুরু করেন নতুন করে বাইরের জগতে পা রাখা। আজই তার পহেলা দিন।

দেখতে দেখতে, মিল-অমিল খুঁজতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছেন তিনি। অবাক হচ্ছেন। ঠিক যেন এক হাঁটতে শেখা, দেখতে জানা ও বড় হতে চাওয়া শিশুর প্রথম একা রাস্তায় নামা।

এবং, নানা কিছুর পর এই ভিড় বাসের মধ্যে ওই দৃশ্যে তাঁর চোখ আটকে গেল। যেখানে এই প্রথম তাঁর মনে পড়ল, একটি মৃত শিশুও ছিল সেই রাতের সমাগমে।

এই সেই শিশু কি, যে তাঁর মধ্যে আবার হাজির?

প্রশ্নের মধ্যে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছেন চিনুয়া দাস। এই বাস কোথায় যাবে, কোথায় তাঁকে নামতে হবে- কিছুই তিনি বুঝতে পারেন না। তাঁর মনে পড়ছে, মৃত মায়ের কথা। যিনি একসময় তাঁকে এভাবেই বুকে টেনে নিয়ে...

সবকিছু ওই শিশুটির মতো নতুন করে দেখা, চারপাশের সবকিছু আবার খেলনার মতো মনে হওয়া, হামাগুড়ি দিয়ে সিঁড়ি ভাঙার আর একটা সুযোগ পাওয়া- এসবই অবিশ্বাস্য ছিল এই ক'দিন আগে অবধি। অন্ধর অনেক স্বপ্ন-ঘাটতি থাকে। চিনুয়ারও ছিল। কিন্তু, এখন কোনওটাই আর স্বপ্ন নয়। তাঁর মনে হলো ওই মায়ের বুক থেকে কাপড়ের আড়ালটা এবার সরে যাক। আড়ালটা আর এক দূষণ। যা তিনি আর দেখতে চান না। একটা নতুন সর্বজনগ্রাহ্য, নিষ্পাপ দৃশ্য তাঁর হাতে উন্মোচিত হোক। এটাই হোক দূষণমুক্তির শুরু। শিশুটির খাদ্যগ্রহণ যে আসলে তাঁরই ফিরে পাওয়া জীবন শুরুর প্রক্রিয়া, এটা আর আড়ালে থাকবে কেন? তিনি বাসের ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলেন সেই দৃশ্যের দিকে।  

ক্রমশ নিজের জন্মান্তর স্পষ্ট হতে দেখে বিস্ময়ে চেয়ে রইলেন চিনুয়া দাস।

বাস দ্রুত গতিতে চলতে লাগল।              

More Articles