ভালবাসা মরে গেলেও থাকে স্মৃতিতে! ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা চেনায় অন্য প্রেম

Bhalobasar Karok Prokoron: বিশুদ্ধ ভালবাসা তবু, ভাস্কর জানেন, তা থেকে যায় ভালবাসা মরে গেলে স্মৃতিতেই।

Biswajit Ray
৩ মিনিট
ভালবাসা মরে গেলেও থাকে স্মৃতিতে! ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা চেনায় অন্য প্রেম

মানুষের মৃত্যু হলে মানব থেকে যায়, তবুও মানব থেকে যায়। কিন্তু ভালবাসার মৃত্যু হলেও কি থেকে যায় ভালবাসা? কোথায় থাকে? কোন কোঠায়?

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের 'শাশ্বতী' কবিতায় ছিল,

সে ভুলে ভুলুক, কোটি মন্বন্তরে

আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না

এই স্মৃতিতেই তো শাশ্বতীর অবস্থান। এই স্মৃতিতেই তো সর্বস্ব। তাহলে ভালবাসার মৃত্যু হলেও, কোনও একজন অপরজনকে ভুলে গেলেও, কেউ ধারণ করতে পারেন সেই চলে-যাওয়া মানুষটিকে স্মৃতিতে। স্মৃতিই তাহলে শাশ্বতীর প্রকৃত আধার! সেই স্মৃতির স্বরূপ কেমন?

সেই স্মৃতি নিহিত না কি প্রতি মুহূর্তে জেগে থাকে? নিহিত স্মৃতি শান্ত। আর প্রতি মুহূর্তে জেগে থাকা স্মৃতি, সে কি বিষণ্ণ করে, না কি অধীর বেদনাবাহী প্রসন্নতায় ডুবিয়ে রাখে মন। ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতায় ‘হঠাৎ দেখা’ সুপ্ত স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলল। ভাস্করের কবিতায় ভালবাসার মৃত্যুর পর দু'জনের অবয়বের রূপবদল, অবস্থান বদলের ছবি স্পষ্ট বাস্তবতায় ফুটে ওঠে। কিন্তু স্মৃতি? সেখানে যে রূপ ধরা আছে, তা তো এই বদলের স্পর্শহীন। যা দেখলাম আর যা দেখতাম- দুয়ের কথা উঠে আসে ইঙ্গিতে।

শহরের মাথার ওপর দিয়ে সাঁতরে চলেছি

আলো কম-দূরে

বাচ্চাদের হই-হল্লা শোনা যাচ্ছে

এক যুগ পরে আজ তোমাকে দেখলাম

ভাস্করের এই ‘আরেকটি প্রেমের কবিতা’-র শেষ পঙ্‌ক্তিতে কোনও পূর্ণচ্ছেদ নেই। আসলে এই যে একযুগ পরে দেখা, এই দেখার প্রতিক্রিয়া তো ‘ছেদ’ দিয়ে থামিয়ে দেওয়া যাবে না। স্মৃতি সেখানে খেলা করে যাবে। সেই প্রতিক্রিয়ার কথা, স্মৃতিকাতরতার কথা লেখেননি তিনি এই কবিতায়। কেবল যেখানে প্রচলিত অর্থে ছেদ পড়ার কথা, সেখানে যতিচিহ্ন ব্যবহার করলেন না। জাগর স্মৃতির প্রতিক্রিয়ার কথা লিখেছিলেন অবশ্য অন্য এক কবিতায়। নাম তার ‘আরো প্রেমের কবিতা’।

কলকাতা থেকে লিখি– পুরনো হাতের লেখা – চিনবে নিশ্চয়।

তোমাদের শহরে এখন বাতাস কি?– বৃষ্টি কি?

আমার খেলাধুলায় মন নেই আর।

কেন লিখে জানাও না কার সঙ্গে ফেঁসেছ বিকেলবেলা কাকে তুমি হরদম মিথ্যে বলছ-

মস্করার মধ্যে রেখো না গীতবিতান

ছাড়ো ওই খেলা, শুধু ছেড়ো না আমাকে মরে যাব।

এই একখানা চিঠি। পাঠানোর ইচ্ছে নিয়ে লেখা চিঠি শেষ অবধি না-পাঠানো চিঠি হয়েই থেকে যেতে পারে। দূরত্ব, দু'জনের মধ্যবর্তী দূরত্ব, অতিক্রমের চেষ্টায় পুরনো স্মৃতি উসকে দেওয়ার চেষ্টা। প্রেমের মধ্যে ধরা দেওয়ার ও পালিয়ে যাওয়ার টানাপড়েন থেকে কত মিথ্যে, মশকরা। শেষ পঙ্‌ক্তিতে তীব্র স্বীকারোক্তি ও প্রার্থনা ‘শুধু ছেড়ো না আমাকে মরে যাব।’ কবিতার শুরু তো জানিয়ে দিয়েছে দু'জনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। দু'জনের মধ্যে দু'-শহরের দূরত্ব। তাহলে কেন উঠল না ছাড়ার প্রসঙ্গ? প্রার্থনা স্মৃতির কাছে – নাছোড় স্মৃতির মধ্যে থেকে যাওয়ার ইচ্ছে। সেই জাগর স্মৃতি জানিয়ে দিচ্ছে এখন অন্য কারোর সঙ্গে ‘ফেঁসেছ বিকেলবেলা’ কিন্তু তবু স্মৃতি আমাকে ছেড়ো না।

ভাস্কর একদিকে যেমন স্মৃতিকে নিয়ে খেলেন তেমনি আরেক দিকে পরিবর্তিত অবয়বকে, পরিবর্তিত প্রেমহারা সময়কে বিবৃত করেন।

প্রেমিকারা? তারা বা কোথায় যায়?– তারা তো স্ত্রী হয়, আর

পেটে বাচ্চা ধরে।

কথাগুলো, কোথায় হারিয়ে যায়। রান্নাঘরে আলো জ্বলে ওঠে।

(‘প্রেমিকেরা প্রেমিকারা’)

এই যাপনের বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে জিজ্ঞাসা তাঁর,

শুধু তুমি, এখনো কেন যে ভাবো, ভালোবাসা

ভালোবাসা মৃতসঞ্জীবনী

(‘মৃতসঞ্জীবনী)

সুধীন্দ্রনাথের কবিতায় ঘোষণা ছিল, তীব্র ঘোষণা। স্মৃতিতে রেখে দেওয়ার ঘোষণা। ভাস্কর ঘোষণাবিহীন। নিজের সঙ্গে মশকরা করছেন। নিজের বদলে যাওয়া এখনকার যাপনকে মেনে নিচ্ছেন। তবু কোথাও অধিকরণ হিসেবে স্মৃতিকে নিয়ে খেলছেন। সুপ্ত স্মৃতি, জাগরস্মৃতি। সেই স্মৃতি-উচ্চারণের মধ্যে আছে উদাসীন নাগরিক অনাসক্তি খানিক– ঠাট্টা নিজের সঙ্গে, নিজেদের চারপাশের সঙ্গে।

বিশুদ্ধ ভালবাসা তবু, ভাস্কর জানেন, তা থেকে যায় ভালবাসা মরে গেলে স্মৃতিতেই– নিহিত, জাগর অথবা নিহিত-জাগর এই দুই বিপরীতের মাঝখানে আশ্চর্য ধূসরতায়– ভালবাসা থেকে যায়।

যেখানে পায়ের ছাপ পড়ে দেখি সেখানেই রক্ত ফুটে ওঠে

(২২, জিরাফের ভাষা)

এই ভালবাসা– রক্তাক্ত স্মৃতি কিংবা রক্তগোলাপ। অন্তত ভাস্করে– তখনও এমন করে আসেনি আমাদের কাছে স্মৃতিহারা বর্তমান। এখনও কি ভালবাসা স্মৃতিতেই থাকে, না কি মানুষ ভুলে যেতে শিখে ভালবাসা থেকে শিখেছে দূরে যেতে!

লিখেছেন
Biswajit Ray
Biswajit Ray
6 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।

যে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষেধ, সেখান থেকেই যেভাবে হলো সর্বজনীন পুজোর শুরু

history of Durga Puja in Kolkata: ব্রিটিশ কলকাতায় সেই পুজোর ধরন বদলাতে শুরু করল; বদলাল গেট-টুগেদারের ধরনও। আর কলকাতার দুর্গাপুজো আদতে হয়ে উঠল কোম্পানির পুজো। মানে কোম্পানির লোকেদের তোয়াজের জন্য করা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। সেই পুজোর থেকে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।

এনসিইআরটি-র নতুন ইতিহাসের বই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চাকে নতুন জায়গা করে দিচ্ছে?

NCERT Class 9 Book controversy: নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই 'আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি'-র 'রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' অধ্যায়ে সপ্তম শতক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আরব, তুর্কি, মুঘল ও ইউরোপীয় আক্রমণের ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও হিন্দু রাজাদের দেবী-প্রদত্ত তলোয়ারের উল্লেখ রয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাঠ-শিখ-রাজপুত-অহোম প্রতিরোধের বর্ণনা। হিন্দুত্ববাদী লেখক জে. সাই দীপকের 'মধ্যপ্রাচ্যের ঔপনিবেশিকতা'র ধারণা ও হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদ মীনাক্ষী জৈনের গবেষণার ছায়ায়, এভাবেই তৈরি হচ্ছে নতুন সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার পরিসর।

‘গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর সভায় ছুরি কোথা থেকে এল?

SRFTI Kolkata clash: সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে—এক ব্যক্তি হঠাৎ পিছন থেকে এসে এক শিক্ষার্থীকে সজোরে লাথি মারছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেও পিছনের দেওয়ালে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ব্যানারটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ঝুলছিল। অর্থাৎ, যে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগকে সামনে এনে এত প্রচার চালানো হচ্ছে, তখনো পর্যন্ত সেই ব্যানারে কোনো আঁচড়ও পড়েনি।

চার-পাঁচ বছর নিয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি মাত্র চারমাস

SRFTI incident: গোটা দেশে যখন মানুষের বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এল। অথচ একসময় গর্বের সঙ্গে বলা হতো—“হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।” আজ তা যেন উল্টে গিয়েছে।

মাতঙ্গিনী হাজরা ও তমলুকের বিদ্রোহ: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের গতিপথ

Matangini Hazra death: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২। তমলুক শহরের দিকে পাঁচ দিক থেকে ধেয়ে এল জনতার উত্তাল মিছিল। সরকারি দপ্তর ঘিরে ফেলতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের এক বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছিল শহরের উত্তর দিক থেকে—ফৌজদারি আদালতের পথ ধরে। আর সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন প্রায় বাহাত্তর বছর বয়সি মাতঙ্গিনী হাজরা।