আপনারা যেখানে থাকেন, সেখানে প্রেম সম্ভব? প্ল্যানচেটে আত্মার কাছে জানতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ

নিজেদের অভিজ্ঞতার অকপট আত্মকথনে প্রেমকে বোঝার চেষ্টা না করে কতগুলি দার্শনিক ধারণার পেছনে ধাওয়া করা। কাকে বলে প্রেম? উত্তর মেলে না।

Biswajit Ray
৩ মিনিট
আপনারা যেখানে থাকেন, সেখানে প্রেম সম্ভব? প্ল্যানচেটে আত্মার কাছে জানতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ

প্রেম কি আর একরকম? প্রেম নানারকম। নানা জনের কাছে তার নানা রূপ, নানা বয়সে তার নানা চেহারা। প্রেম নিয়ে তাই নানা সময়ে নানা জনের মনে নানা প্রশ্ন ওঠে। দিলীপকুমার রায়ের মনেও উঠত। সেইসব প্রশ্ন উত্থাপন করার উপযুক্ত একজন মানুষ তিনি পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে নানা বিষয়ে চিঠি লিখতেন তিনি, রবীন্দ্রনাথও পুত্রপ্রতিম স্নেহভাজন দিলীপকুমারকে যথাসাধ্য উত্তর দিতেন।

দিলীপকুমার তখন পণ্ডিচেরিতে। অরবিন্দ আশ্রম থেকে চিঠি লিখছেন রবীন্দ্রনাথকে। ১৯২৯ সাল। রবীন্দ্রনাথ সেই সময় ‘যোগাযোগ’ আর ‘শেষের কবিতা’ এই দুই উপন্যাস লিখে উঠেছেন। ‘শেষের কবিতা’ প্রেমের উপন্যাস আর ‘যোগাযোগ’ ব্যর্থ দাম্পত্যর ইতিকথা। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে টাটকা আধুনিক নর-নারীর ছবি আছে– তাদের মনে প্রেম কী, সে-বিষয়ে কত কী জিজ্ঞাসা।

দিলীপকুমার পণ্ডিচেরিতে আধ্যাত্মিকতার পরিমণ্ডলে বুঝতে চাইছেন আধ্যাত্মিক ভালবাসা আর মানুষী ভালবাসার পার্থক্য। রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন,

একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। প্রেম কি উপলব্ধির পরে থাকে না একেবারে? অর্থাৎ এর মধ্যে personal উপাদানটা কি থাকতে পারে না ? কেন না personal উপাদান না থাকলে তাকে আর প্রেম বলা চলে না – অন্ততঃ এখন প্রেম বলতে আমরা যা বুঝি তা বলা যে চলে না এটা ত নিশ্চয়ই?

উপলব্ধি বলতে যে পরম ঐশ্বরিক বা আধ্যাত্মিক উপলব্ধির কথা বলছেন দিলীপকুমার, তা বুঝতে পারা যায় চিঠির পরের অংশ পড়লে। সেখানে দিলীপকুমারের জিজ্ঞাসা স্তিমিত, নিজেই যেন নিজের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।

আমার এক একবার মনে হয় পরম উপলব্ধির আনন্দ এমনই একটা আনন্দ যে সে আনন্দ পাওয়ার পর হয় ত নরনারীর সম্বন্ধ তেমন দরকারই হয় না। কিন্তু আবার এক একবার এ-ও মনে হয় যে মা ছেলের সম্বন্ধে যদি personal উপাদান থাকে তবে নরনারীর সম্বন্ধে যে থাকবে না এটা বলা কি arbitrary নয় অনেকটা?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একদিকে উদ্দাম প্রেমের খোলা ময়দান, অন্যদিকে বিরহের নিভৃত কোণ

সুনীল-শক্তি দুই বন্ধু। বন্ধুতা কেবল সাদৃশ্যে হয় না, বৈসাদৃশ্যেও হয়। গালিবের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন শক্তি। লিখেছিলেন, সব সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না, যদি আর কিছু না থাকে, তবে শত্রুতাই থাক।

দিলীপকুমারের জিজ্ঞাসার দু'টি অভিমুখ। পরম উপলব্ধির পর নর-নারীর সম্বন্ধ তেমন দরকার হয় না একথা অধ্যাত্মবাদীরা মেনে নেন – কিন্তু মা-ছেলের সম্পর্ক তো অস্বীকার করেন না! তাহলে!

এই প্রশ্ন রবি ঠাকুরকে করা চলে। কারণ এ-বিষয়টা সারাজীবন ধরে ভেবেছেন তিনি। ব্যক্তিগত প্রেমকে মুছে দিয়ে নির্বিশেষ ঈশ্বরের উপলব্ধির কথা তো তিনি বলেন না। বরং লেখেন প্রিয়কে দেবতা আর দেবতাকে প্রিয় করার কথা। কেন লেখেন?

মাঝে মাঝে মনে হয়, প্রেম জিনিসটা নিয়ে আমাদের বাঙালিদের অন্যান্য প্রদেশের ভারতীয়দের মতোই নানা দ্বিধা তৈরি হচ্ছিল। প্রেম বিষয়ে আমরা কতগুলি ভাবনার খাঁচা তৈরি করছিলাম। দেহ-দেহাতীত, ব্যক্তিগত-নৈর্ব্যক্তিক, স্বার্থ-পরার্থ- এমন সব ভাবনার খাঁচা। সেই ভাবনার খাঁচা বজায় রেখে আমাদের জীবনের নানা উপলব্ধিকে বিচার করছিলাম। যদি ভিন্ন অভিমুখে যেতাম! জীবনের অজস্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে হাত-পুড়িয়ে যদি বলতে পারতাম এটা হলো এই, ওটা হলো সেই। নিজেদের অভিজ্ঞতার অকপট আত্মকথনে প্রেমকে বোঝার চেষ্টা না করে কতগুলি দার্শনিক ধারণার পেছনে ধাওয়া করা। কাকে বলে প্রেম? উত্তর মেলে না।

যে রবীন্দ্রনাথকে এই প্রশ্নগুলি করছিলেন দিলীপকুমার, সেই রবীন্দ্রনাথের নিজের কাছেও সদুত্তর ছিল না, এই সময় প্ল্যানচেটে খুব আগ্রহী হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যাঁরা চলে গিয়েছেন, সেই বিদেহী আত্মাদের ডাকছেন মিডিয়ামের মাধ্যমে। বিদেহী আত্মারা সত্যি আসতে পারেন কি না, কিংবা মৃত্যুর পর জীবন হয় কি না এসবের বাইরে গিয়ে সেই প্ল্যানচেটে রবীন্দ্রনাথ যে প্রশ্নগুলি করেছিলেন, সেগুলো পড়লে বেশ মজা লাগে। রবীন্দ্রনাথ আত্মাদের জিজ্ঞাসা করেন, তাঁরা এখন যেখানে থাকেন সেখানে প্রেম সম্ভব কি না? সেই প্রেম কেবল মানসিক কি না?

জীবনের শেষ পর্বে এসে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘ল্যাবরেটরি’। সেই গল্পে তিনি আঁকলেন সোহিনীকে। সেই সোহিনী অবশ্য বাঙালি নয়, পাঞ্জাবী। বিশ বছরের অসংকোচ, ঘাগরা দোলানো মেয়ে। ঠোঁটে তার শান দেওয়া ছুরির মতো হাসি। এই মেয়ের শরীরের সংকোচ নেই– কিন্তু তার ভেতরে আছে ‘ক্যারেকটারের তেজ’। সেই ক্যারেকটার দিয়ে তার স্বামী নন্দকিশোরের বিজ্ঞান সাধনার ল্যাবরেটরিকে রক্ষা করেছিল সে। স্বামী চলে গিয়েছেন, কিন্তু তাঁর কর্মের সাধনা সেটা রয়ে গেল। সেই কর্মের ইমপার্সোনালের মধ্যে মিশে রইল সোহিনীর পার্সোনাল।

দিলীপকুমারের প্রশ্নের একরকম উত্তর যেন রবীন্দ্রনাথের এই গল্প।

সোহিনীর স্বামী নন্দকিশোরের বিজ্ঞানসাধনা বাইরের দিক থেকে সাধারণের কাছে জ্ঞানের সাধনা, তাই ইমপার্সোনাল। সোহিনীর কাছে তা নন্দকিশোরের সাধনা বলে পার্সোনাল। পরমের অনুভূতি কী, যিনি তা জানেন, তা জানেন। সেই উপলব্ধির অধিকারী যিনি, তিনি আর ব্যক্তি-ভালবাসায় ফিরতে পারবেন কি না, তা বলা মুশকিল। কিন্তু সেই মানুষটিকে, সেই মানুষের সাধনাকে ব্যক্তিগত ভালবাসায় ভরে দিতে পারেন কেউ প্রত্যাশাহীনভাবে, যেমনটি পেরেছিল সোহিনী।

ভালবাসা কি আর একরকম?

তার নানা রূপ।

চিন্তা আর দর্শনের খাঁচা ধরে, আবার সে খাঁচা ফেলে মানুষের যাত্রা।

উত্তর মেলে, উত্তর মেলেও না।

লিখেছেন
Biswajit Ray
Biswajit Ray
6 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?