যাযাবর, অচ্ছুৎ, 'আধা-বেশ্যা'! যেভাবে বাঁচে রাজস্থানের কালবেলিয়ারা

একদিন হয়তো প্রকৃত সমাদর পাবে এই ভেবে নিজেদের প্রস্তুত রাখছে কালবেলিয়ারা।

Ladly Mukhopadhaya
৩ মিনিট
যাযাবর, অচ্ছুৎ, 'আধা-বেশ্যা'! যেভাবে বাঁচে রাজস্থানের কালবেলিয়ারা

একটা ছোট্ট দল আর ক্যামেরা-লাইটের লটবহর নিয়ে বছরখানেক আগে পৌঁছে গিয়েছিলাম রাজস্থানের চোপাসানি গ্রামে। যোধপুরের অন্তর্গত এই গ্রাম ও সংলগ্ন শহর-শহরতলি পাথুরে প্রান্তর আর মেঘ-পাহাড়ে সাজানো। ছবি তোলার আদর্শ স্থান। প্রাকৃতিক ছবি নয়, আমরা গিয়েছিলাম কালবেলিয়াদের নিয়ে কয়েকটা তথ্যচিত্র তুলতে। কিছুটা পাঠ্য অভিজ্ঞতা আর আমার গুরুতুল্য ফরাসি চলচ্চিত্রকার জর্জ লুনো-র একটি তথ্যচিত্র ছাড়া আমার তেমন কোনও ধারণাই ছিল না। আমার সহযোগী কিশোর আর অর্পণের এই অঞ্চলে আসার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। তাদের কাছেই যাত্রাপথে নানা গল্প শুনে তৈরি করছিলাম ছবি তৈরির পরিকল্পনা। কিন্তু সময় ছিল অত্যন্ত কম।

তো প্রথমেই জানানো দরকার, কারা এই 'কালবেলিয়া' জনগোষ্ঠী? কালবেলিয়ারা মূলত ছিল যাযাবর। জিপসিদের কোনও একটি ভাগ হিসেবেই বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছে। পেশাগত দিক থেকে এরা ছিল সাপুড়ে, অর্থাৎ, সাপ ধরে কেনা বেচা, সাপের খেলা দেখানো, সাপের বিষ থেকে নানা ধরনের ওষুধ তৈরি করা এবং সাপের চর্বি থেকে চোখে লাগানোর সুরমা প্রস্তুত করা। এদের কোনও ঘরবাড়ি ছিল না। যাযাবর জীবনের পথই ছিল এদের যাপনচরিত।

ক্রমে সময় ঘুরেছে। ১৯৭২ সালের আইন মোতাবেক সাপ ধরা নিষিদ্ধ হওয়াতে এই প্রান্তিক সম্প্রদায় আর্থিকভাবে মারাত্মক চাপে পড়ে যায়। সেসময় বেশিরভাগ কালবেলিয়া চলে যায় ক্ষেতের কাজে, নয় তো মেষপালনের কাজে। সেই সময় এই কৌম সমাজের গুরু (সর্দারও বলা যায়) কালুনাথ কালবেলিয়া তাঁর সমাজের মেয়েদের নৃত্যশিক্ষার ও পুরুষদের বাদ্যযন্ত্র শিক্ষার তালিম দেন, যে নৃত্য উঠে এসেছে সাপের চলন ও ভঙ্গিকে কেন্দ্র করে। এই সময় থেকে কালবেলিয়া নাচের উদ্ভব হয়। 'কাল' অর্থে সাপ আর 'বেলিয়া' অর্থে বন্ধু। কালবেলিয়াকে কোথাও কোথাও কারবেলিয়াও বলা হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, বেঁচে থাকবে এই দুর্গশহর?

হঠাৎ মেলানিয়া কফি নিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলে , "তুমি কি জানো, স্টিভেন স্পিলবার্গ দিনসতেরো এই পুইভার্টে রেকি করে তারপর এগারো দিন লোকেশন শুটিং করেছিলেন?"

একসময়কার যাযাবর কালবেলিয়ারা এখন অনেকটাই স্থিতধী। এদের অধিকাংশেরই এখন নিজের বাড়ি আছে। মূলধারার সমাজে যেহেতু এরা অস্পৃশ্য ও অচ্ছুৎ, তাই এদের ঠাঁই হয়েছে গ্রামের শুরুতে কিংবা শেষে। বেশ কিছু বিশেষজ্ঞ এদের আধা বেশ্যা (সেমি প্রস্টিটিউট) হিসেবে শনাক্ত করেছে। তার কারণ আমি জানি না, তবে কালবেলিয়া মেয়েদের চোখে-মুখে এক ধরনের ভিন্ন আবেদন (যৌন!) আছে, তা লক্ষ করেছি। হয়তো এই সমস্ত কারণেই ভারতে কালবেলিয়ারা তেমন প্রচার, প্রসার পায়নি। কিন্তু অন্যদিকে কালবেলিয়ারা প্রায় সকলেই বহুবার করে বিদেশে যাতায়াত করেছে অনুষ্ঠানের জন্য। এটাও ঠিক যে, ইতিমধ্যে কালবেলিয়া নাচ বিদেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

কালবেলিয়া নৃত্যশিল্পীরা অসাধারণ বর্ণময় পোশাক-পরিচ্ছদ পরে তাদের অনুষ্ঠান করে। মাথায় পড়া আঙ্গরাখি আর ঘাগড়ায় থাকে নানা কারুকার্য। তা তারা নিজেরাই তৈরি করে। অন্য সব নৃত্যশিল্পীদের মতোই চড়া মেকআপ করে নাচের আসরে আসে। আগেই লিখেছি, ছেলেরা বাদ্যযন্ত্র বাজায় আর মেয়েরা নাচে। এদের গান নানা বিষয় নিয়ে হয় এবং তা তারা নিজেরাই রচনা করে। কখনও কখনও হঠাৎই তাৎক্ষণিক রচনায় দর্শকদের মনোরঞ্জন করে। এরা যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সাপুড়েদের বিন বা পুঙ্গি। সঙ্গে থাকে ঢোল, খঞ্জিরা, মঞ্জিরা, সারেঙ্গি আর হারমোনিয়াম। এদের নাচ সত্যিই আকর্ষণীয়। সাপের মতো সর্পিল দেহভঙ্গিতে এরা জুড়ে দেয় অসাধারণ অ্যাক্রোব্যাটিকস। নাচতে নাচতে আর্চ করে তারা চোখের পাতা দিয়ে মাটিতে থাকা আংটি বা ছুঁচ অনায়াসে তুলে দর্শক মনে তাক লাগিয়ে দেয়।

কালবেলিয়ারা ইউনেসকো-র ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ লিস্টিতে ২০০৩-এ জায়গা করে নেয়। গুরু কালুনাথ কালবেলিয়ার কথায়, ইউনেসকোর স্বীকৃতি তাদের বিরাটভাবে সাহায্য করলেও এখনও তারা প্রান্তিক। মূলধারার সমাজের কাছে ব্রাত্য। যখন যে সরকারই এসেছে, দু'-চারবার অনুষ্ঠানের জন্য ডাকলেও তাদের কোনও সহযোগিতা করেনি। অথচ জীবনধারণের ক্ষেত্রে তাদের যে অপরিসীম সংগ্রাম করতে হচ্ছে, সেদিকে কোনও নজর দেয়নি রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীরা।

কালবেলিয়া নৃত্যশিল্পী সুয়াদেবীর বাড়ি গিয়ে দেখলাম বিকেলবেলায় সেখানে গ্রামের বাচ্চাদের নৃত্যশিক্ষার আয়োজন করেছেন তিনি। পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের ঐতিহ্যবাহী নাচের প্রতি উৎসাহিত করতে। আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র 'লাচোদ্রম'-এর অভিনেত্রী সুয়াদেবী অন্তত পঞ্চাশবার বিদেশে গেছেন তাঁর সহযোগী দলবল নিয়ে। তাঁরও বক্তব্য, "সামাজিকভাবে আমাদের কোনও স্বীকৃতি নেই এই দেশে। এমনকী, যেখানে থাকি, সেই রাজস্থানেই আমাদের নৃত্যশিল্পী হিসেবে কোনও স্বীকৃতি নেই। অচ্ছু্ৎ করে রাখা হয়েছে আমাদের। সামাজিক বদনামের ভাগীদার হতে হচ্ছে আজও।" নবীন শিল্পী আশা বলছিল, "হয়তো এখনও আমাদের কোনও সম্মান নেই, তবু আমরা এই নাচগানকেই পেশা হিসেবে নিয়েছি। নতুন প্রজন্মের মেয়েরাও আসছে নাচ শিখতে।"

একদিন হয়তো প্রকৃত সমাদর পাবে এই ভেবে নিজেদের প্রস্তুত রাখছে কালবেলিয়ারা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্বাস রাখা ভালো, তবে শেষ পর্যন্ত অবস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটবে কি? সরকারবাহাদুর কি এই লুপ্তপ্রায় প্রান্তিক সমাজের সৃষ্টি-সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করার জন্য কোনও উদ্যোগ নেবে?

তা ভগাই জানে!

ছবি সৌজন্য: লেখক, গ্রাফিক্স: দীপ হাওলাদার

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এই শহরের গোপন গুহা থেকেই লড়াই শুরু স্পার্টাকাসের

রোমান শাসকদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে বিদ্রোহী দাসেরা ও পরে খ্রিস্টানরা এইসব গুহায় লুকিয়ে থাকত।

'বড্ড গরম, হিমালয়ে যাই', বলেই চিরতরে নিরুদ্দেশ হলেন সেই বাউল

এমন বহু বাউল-ফকিরের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যাঁরা গান করেন না, ছবি আঁকেন কিংবা পদ লেখেন বা কিছুই করেন না সেভাবে, তাঁরা শুধুই তত্ত্বসাধনায় মশগুল।

উপাস্য দেবতা 'কালী', সাহেবদের চোখে চোর হয়েও যেভাবে বাঁচে জিপসিরা

জিপসিদের আদি খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে যে, কোনও এক সময় দক্ষিণ এশিয়া থেকে এই যাযাবর সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রাম্যমান হয়।

ধর্মে মুসলমান, কণ্ঠে শিবের গীত, রাজস্থানের আশ্চর্য জাতি মাঙ্গানিয়ার

পশ্চিম রাজস্থানের মরুপ্রান্তরে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বারমের ও জয়সলমিরের নানা স্থানে মাঙ্গানিয়ার লোকশিল্পীদের এক একটা গ্রাম। সেখানে তাদের গান ও জীবনযাপন ছিল আমাদের কাজের উপজীব্য বিষয়।

বইমেলা থেকে নিষিদ্ধপল্লি- সব একাকার ছিল কলেজস্ট্রিটের এই আড্ডায়

আমার দেখা অপরাজেয় আড্ডাধারী ছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু ওপরে যত লেখক-শিল্পীদের নাম লিখেছি, তার অধিকাংশই সন্দীপনদাকে অপছন্দ করতেন। তিনি ছিলেন স্বভাব-রসিক। একবার অরূপরতন সম্পর্কে আমায় বলেছিলেন যে, 'আচ্ছা বলো তো, অরূপ তারকোভস্কির মতো গল্প লেখে কিন্তু সুখেন দাশের মতো ছবি করে কি করে?'

পৃথিবীর প্রাচীনতম ফ্লাইওভার এই শহরে, ভবঘুরের ঠিকানা ফ্লোরেন্স

ভাসারির দু'পাশ সারারাত মাতিয়ে রাখে নাম না-জানা মিউজিসিয়ান, কোনও অন্ধ বাদ্যযন্ত্রী আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গানবাজনার দল। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার এই শহরে কিন্তু অসংখ্য ভবঘুরের যাতায়াত।

নেশা আর খিস্তির আড়ালে ঢাকা পড়ে গেলেন যে বাউল

ভাবের আড়ম্বর নেই। এ নেহাতই সাধারণ অর্থে সহজ-সাধারণ। গৌরকে জানতে হলেও ওই সহজিয়া পথ ধরতে হবে। ওর কথা শুনলেই বোঝা যায়, এই বিশ্বসংসারের তাবৎ কৌশল আর লেনাদেনার সে ঊর্ধ্বে, তথাপি দৈনন্দিন সমাজের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য আছে।

'সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরাম্যান' হয়ে রয়ে গেলেন, যে সুব্রত মিত্রকে চিনল না বাঙালি

আমাদের বিস্মিত হওয়া ও ওঁর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মূল কারণ ছিল যে, সুব্রতদা 'অপরাজিত' ছবিতে প্রথম বাউন্স লাইট করে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সাদা কাপড়ের বিপরীতে লাইট রেখে সিনেমায়ার অভ্যুত্থান ঘটালেন।