'কালীর বেটা' কমলাকান্ত একই সঙ্গে সন্ন্যাসী ও প্রেমিক

Kamalakanta Bhattacharya: এক অন্ধকার কালের কবি কমলাকান্ত। তাঁর গানও তাই ভারতচন্দ্রের মতো ‘অমাবস্যার গান’।

Shruti Goswami
৩ মিনিট
'কালীর বেটা' কমলাকান্ত একই সঙ্গে সন্ন্যাসী ও প্রেমিক

মাস্তানরাজের গ্র্যান্ড দিওয়ালি উদ্‌যাপন। তার পাশেই পাড়ার ছোট্ট কালীপুজো। জনারণ্যের মধ্যে বিরাট শব্দবাক্সের হাড়হিম করা দাদাগিরি। তার কোণ থেকেই ক্ষীণভাবে ভেসে আসে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর মায়াস্বর-

জানো না রে মন পরম কারণ, কালী কেবল মেয়ে নয়,

ও যে মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ কখন কখন পুরুষ হয়...

আর এক মুহূর্তে বুটিদার শাড়ি, রংমিলান্তি পাঞ্জাবির ভিড় পিছিয়ে যায় তিনশো বছর আগের দুপুরে। ছায়াসুনিবিড় বটের নিচে জড়ো হওয়া প্রবীণের দল, নবীনার জোট। ভক্তির পড়া পাঠ নেই তাঁদের, অকুণ্ঠ বিস্ময় আছে, প্রেম আছে, প্রণতি আছে। সেই সমূহেরই একজন, অল্প বয়সে ঘরছাড়া, কিঞ্চিৎ খ্যাপাটে, সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। মন্ত্র, নিয়ম, আচার, অনুষ্ঠান জানা নেই, আছে অনাবিল আদর আর অকপট নিবেদন।

তবে কমলাকান্তের কালীগান কি শাস্ত্র-মন্ত্র-পুরাণ-তন্ত্র বাদ দিয়েই তৈরি? একেবারেই নয়। কবিত্বের দ্যুতি আর তন্ত্রপাণ্ডিত্যের অলংকার তাতে যথেষ্টই আছে।

অচিন্ত্য অব্যয় রূপা, গুণাতীতা নারায়ণী।

ত্রিগুণা ত্রিপুরা তারা, ভয়ঙ্করা কাল কামিনী।।

সাধকের বাঞ্ছাপূর্ণ, কর নানা রূপধারিণী।

কভু কমলের কমলে নাচ, পূর্ণব্রহ্ম সনাতনী।।

আছে সাধনতত্ত্বের গূঢ় কাব্যিক সংকেতও। এই সাধনা ত্যাগের। সাধককে বিষয়মধু ত্যাগ করতে হবে। এই আরাধ্যা ত্যাগ, বৈরাগ্য, প্রশমনের অধিষ্ঠাত্রী। শুধু বিষয়-সংসার নয়, নিজের দেহও তো বাধা হয়ে দাঁড়ায় সাধনায়। রিপুকে তো আর মুছে ফেলা যায় না। অথচ তন্ত্রের সাধনায় দেহই তো সার! এই আক্ষেপ কীভাবে পেরনো যায়? পথ কী? কমলাকান্ত বলেন-

বড় আশা ছিল মনে, ফল পাব মা এই তরুতে

তরু মুঞ্জরে না, শুকায় শাখা, ছটা আগুন বিগুণ আছে।

কমলাকান্তের কাছে ইহার একটি উপায় আছে।

জন্ম-জরা-মৃত্যুহরা তারা নামে ছেঁচলে বাঁচে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডালে দোল খাওয়া বালিকাই আসলে কালী! কিংবদন্তি কথা বলে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের মন্দিরে

Sabarna Roychowdhury: বাংলায় প্রায় ১২টি কালীমন্দির রয়েছে সাবর্ণদের। এই মন্দিরগুলির প্রায় সবক'টির সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রয়েছে পরিবারের।

তত্ত্বের শূন্য খোলস নয়, ভাবের জিজ্ঞাসা প্রবল বলেই কখনও নিবেদিত ভক্তির মধ্যেই উচ্চারিত হয়ে যায় অমীমাংসিত ধাঁধা- “যখন ব্রহ্মাণ্ড না ছিল হে মা, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি!”

নিতান্তই কম বয়সে বাড়ি ছেড়েছিলেন কমলাকান্ত। বিবাহিত হলেও দাম্পত্যধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল না তাঁর। শাক্তসাধনায় আরাধ্যার ভজনা তাই করলেন কন্যারূপে, জননীরূপে। আর রামপ্রসাদের মতোই সরল অভিমানে মায়ের কাছে, মেয়ের কাছে দাবি ও অভিযোগের স্রোত বইয়ে দিলেন-

কুপুত্র অনেক হয়

কুমাতা কখন নয়,

বঞ্চনা উচিত হয় কি অধীন জনে মা!

কিংবা,

জগত জুড়ে নাম দিয়াছ কমলাকান্ত কালীর বেটা

এখন মায়ে পোয়ে কেমন ব্যাভার, ইহার মর্ম্ম জানবে কেটা!

সন্ন্যাস তাঁর ধর্ম; নারীর প্রতি আসক্তি নেই, কিন্তু দেখার চোখ আছে। একই সঙ্গে তিনি তাপস ও প্রেমিক। যে নারীকে তিনি উপাসনার লক্ষ্য করে তুললেন, তার অপার্থিব নিত্য অন্ধকার সৃষ্টির আদিরূপ- অতল, অমূর্ত, দুর্জ্ঞেয়। সে রূপের প্রশস্তি না করেন, সাধ্য কী!

ও রমণী কালো এমন রূপসী কেমনে

বিধি নিরমিল নব নীরদ বরণে।

বামা অট্ট অট্ট হাসে, দশনে দামিনী খসে, কত সুধা ক্ষরে বামার ও বিধুবদনে।

যে দুনিয়া নারীর দাম খোঁজে, যোগ্যতা মাপে গায়ের রঙে, একুশ শতকে যে দুনিয়ায় ত্বক-প্রসাধনীর সঙ্গে রং মাপতে শেড-কার্ড দেওয়া হয়, সেই ভূখণ্ডেরই এক প্রাচীন সদস্য এমন এক রূপের উত্তুঙ্গ উদ্‌যাপন দেখালেন। এই মেয়ে শুধু কালোই না, এ উলঙ্গী, উন্মাদিনী, ‘দিগম্বরী ভয়ঙ্করী’; অলজ্জিতা হয়ে সে এক মরণলড়াইয়ে নেমেছে, সর্বনাশেই তার সিদ্ধি। অসীম ভয়ের এক আশ্চর্য মোহিনী মূর্তি! সে সম্পূর্ণা, আপনাতে আপনি পূর্ণ, নিজে গেয়ে, নিজেই করতালি দিয়ে নেচে বেড়ায়।

এলো থেলো চাচর চুল, তায় দিয়েছে জবাফুল

নাশিছে দানবকুল, সুধায় দুকুল ভাসে রে।...

কমল কহে, কাজলবরণ, অভয়পদে যে লয় শরণ,

কালীনামে কাঁপে শমন, ত্রাসে না যায় পাশে রে...

সাধকের চোখ যাঁকে দেখছে, তিনি একই সঙ্গে গুণময়ী ও মনোময়ী, জ্ঞানময়ী ও প্রেমময়ী, সুখময়ী ও দয়াময়ী, ভয়াল ও অভয়া, কালী ও গৌরী। কমলাকান্তের আগমনী-বিজয়ার পদ বাংলার সংস্কৃতিঘরের মায়াময় অফুরান আলো। আদরের কিশোরী কন্যাকে দেখা আর না-দেখার যুগল কান্না, মা-বাপের স্নেহক্ষরা সুখদুখ তিনি যেমন প্রেমে, শব্দে বুনেছেন, তারই আরেক পিঠ তাঁর শ্যামাগীতি। উমা আর শ্যামায় ভেদ কোথায়? গিরিরাজ যখন মেনকাকে বলেন “ও রাঙা চরণ দুটি, হৃদে রাখেন ধূর্জটি, তিলার্ধ বিচ্ছেদ নাহি করে”, তখন শায়িত মহেশের বুকে দাঁড়ানো সেই দেমাকি মুণ্ডমালিনীকেই তো দেখতে পাই।

অভেদ আরও এক জায়গায়। রামপ্রসাদ লিখেছিলেন, “প্রসাদ বলে, গণ্ডগোলে এ যে কপট উপাসনা/ তুমি শ্যাম-শ্যামাকে প্রভেদ করো, চক্ষু থাকতে হলে কানা।” কমলাকান্তও ভাবলেন সেই শ্যামাঙ্গীর কথা, যে একদিকে এলোকেশীরূপে অসুরনিধন করে, আরেকদিকে ব্রজপুরে বাঁশি বাজিয়ে মনহরণ করে ব্রজাঙ্গনার। পুরুষবেশে? না কি নারীই?

এক অন্ধকার কালের কবি কমলাকান্ত। তাঁর গানও তাই ভারতচন্দ্রের মতো ‘অমাবস্যার গান’। তাই যেসব টোড়ি, পরজ, ঝিঁঝিট, সিন্ধু, জলদের সুরে গান বাঁধলেন কমলাকান্ত, তার গায়ে লেগে আছে সেই অন্ধকারের রং। কিন্তু অন্ধকারের রং কি কেবল কালোই? অন্ধকারের ভেতর আলোর বাস, সাদার বুকে কালোর বসতি। তাঁর সুরে বিভাস আর পূরবী, যোগিয়া আর ইমন হাত ধরে থাকে। কালো-ধলো মিলে যায়। আমাদের নির্ঘুম আহত রাজপথ জেগে থাকে সেই রং ছোঁবে বলে। এই শূন্য দীপান্বিতায় সেই রঙের রেশ থেকে যায়, চিরকালের রামপ্রসাদী রাতের মতোই যা আনত।

লিখেছেন
Shruti Goswami
Shruti Goswami
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?